পাঁচালির প্যাচাল-৫

অনুপা দেওয়ানজী: যাই হোক নারদ এসেই গড় হয়ে লক্ষ্মী আর নারায়ণকে প্রণাম করে লক্ষ্মীকে বললেন, মা আমি কয়েক দিন আগে মর্ত্য থেকে ঘুরে এসেছি। সেখানে মর্ত্যবাসীদের কষ্ট দেখে মনে বড় কষ্ট নিয়ে তোমার কাছে জানতে এসেছি, তুমি কেন এত অস্থির আর চঞ্চল হয়ে তাদের সকলের দ্বারে দ্বারে ঘোরো?

Anupa Dewanji
অনুপা দেওয়ানজী

তোমাকে পাবার জন্যে যে মর্ত্যের মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। তোমাকে না পেয়ে তারা নানা কুক্রিয়া করছে, দুর্ভিক্ষে ভুগছে, অন্নের অভাবে আত্মহত্যা করছে এমনকি, ছেলেমেয়েদের বিক্রি করছে, আমি যে তা দেখে সইতে না পেরে তোমার কাছে এর কারণ জানতে এসেছি।

মেয়েটি ভাবলো, ঠিকই তো বলেছে নারদ! লক্ষ্মী মানে অর্থ আর অর্থ স্বভাবতই চঞ্চল।তাকে ঠিক মত ধরে রাখা এক দুঃসাধ্য ব্যাপারই বটে।

নারদের মুখ থেকে সব কথা শোনার পরে লক্ষ্মী বললেন, দেবর্ষি! কিন্তু এতে তো আমার কিছুই করার নেই। মর্ত্যের মানুষের এসব দুঃখ-কষ্ট তাদের নিজেদের দুষ্কৃতির ফল। এ তারা নিজেরাই সৃষ্টি করেছে।আমার আর এক নাম চঞ্চলা কেন হলো তাহলে তোমায় বলছি শোনো।

মর্ত্যে এখন দিবানিদ্রা, অনাচার, ক্রোধ, আলস্য, কলহ, মিথ্যে কথা বলা এসবের পরিমাণ অত্যন্ত বেড়ে গেছে। মেয়েদের হাসি, মেয়েদের মুখের ভাষা সবই এখন উচ্চগ্রামে চলছে। সন্ধ্যে না হতেই তারা ঘুমায়। তাদের মধ্যে কেবল ঝগড়াঝাঁটি। দয়া-মায়া সব বিসর্জন দিয়ে তারা যেখানে ইচ্ছে সেখান নিজেদের খুশিমতো আসা-যাওয়া করছে।

সন্ধ্যে বেলায় ঘরে প্রদীপ জ্বালায় না। মুখে, গালে রঙ মেখে বাবুগিরি করছে। সকাল বেলায় গোবরের ছড়া দেয় না। তাতে যদি তার পোষাকে দুর্গন্ধ হয় সেই ভয়ে। আমি তো পৃথিবীতে তাদের পা্ঠিয়েছি লক্ষ্মী স্বরূপিনী নারী হিসেবে। অথচ মিথ্যে সুখের আশায় তারা কিনা আমাকেই ভুলে অকার্য্য, কুকার্য্য করছে?

শ্বশুর,শাশুড়ির প্রতি তাদের বিন্দুমাত্র ভক্তি নেই। উল্টো,তাদের সঙ্গে কটু ব্যবহার করে, স্বামীর আত্মীয়দের আদর বা সম্মান করে না, স্বামীর আগে নিজেরা খেয়ে নেয়, বাড়িতে অতিথি এলে বিরক্ত বোধ করে, স্বামীর কথা শোনে না। স্বামীকে সম্মান করে না, ঘরের কাজ করতে চায় না, রান্না বান্নাও করতে চায় না।

এসব আমাকে অত্যন্ত মর্মাহত করেছে এজন্যে আমি এত চঞ্চলা হয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছি।পৃথিবীতে মানুষের মন এখন ঈর্ষা, দ্বেষ আর হিংসায় পরিপূর্ণ। মানুষগুলি অত্যন্ত কুটিল হয়ে উঠেছে। দেবতা আর ব্রাহ্মণের প্রতি ভক্তি নেই। তারা এখন শুধু নিজে কিভাবে সুখে থাকবে তা নিয়েই ব্যস্ত। রসনা তৃপ্তির জন্যে অভক্ষ্য ভক্ষণ করছে, যার জন্যে নানা রকম দুঃখ পাচ্ছে আর তার ফলস্বরূপ অকালে মরণ হচ্ছে। এত পাপের আধার যেখানে, সেখানে আমি চঞ্চলা না হয়ে নিশ্চলা কিভাবে থাকি?

মর্ত্যের মানুষেরা যদি এসব দোষ বর্জন করতে পারে তাহলে আমি তোমাকে কথা দিলাম অষ্টপ্রহর সেখানে আবার আমি নিশ্চলা থাকবো ।

মেয়েটি এসব যতোই পড়তে লাগলো ততই তার ভক্তি ভাব উবে গিয়ে তা ম্লান হতে শুরু করলো, সে অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে শুনতে চাইলো, এর উত্তরে দেবর্ষি নারদ কী বললেন?

দেবর্ষি নারদের কথা শোনার আগে মেয়েটি বিস্ফারিত দৃষ্টিতে লক্ষ্মীর মূর্তির দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো এই তাহলে সধবা রমনীদের প্রতিনিধি মা লক্ষী! অভিমানে মেয়েটির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।

hindu-woman-monk-copyযেখানে এক তরফা শুধুমাত্র মেয়েদের কর্তব্য আর দোষ ছাড়া মা আর কিছুই দেখলেন না! তাঁর মেয়েদের প্রতি যে এতো অন্যায় আর অবিচার চলে আসছে তা কিছুই নয়! বিধবা মেয়েদের কথা না হয় বাদ। তারা তো সমাজ, সংসার সব থেকেই বাদ।কিন্তু মা নিজে তো সধবাদের দেবী অথচ সতীদাহের নামে যে সধবা মেয়েদের পুড়িয়ে মারা, ছয়/ সাত বছর বয়সের মেয়েদের পূণ্য সঞ্চয়ের নামে গৌরী দান, কুলীণ ব্রাহ্মণদের কৌলীন্য বজায়ের নামে অশীতিপর বৃদ্ধদের ছয় থেকে নয় বছর বয়সের মেয়েদের অগণিত সংখ্যায় বিয়ে করা এবং সে সব মেয়েদের তাদের পিত্রালয়ে রেখে তাদের নাম ঠিকানাসহ খেরো খাতা বানিয়ে সেই অনুযায়ী ঘুরে ঘুরে মেয়েদের পিত্রালয়ে গিয়ে স্বামীর কর্তব্যের নামে সেখানে কাম প্রবৃত্তি নিবারণ আর আসার সময়ে কন্যার পিতার কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং পরিশেষে আরও অক্ষম হয়ে গেলে তার পরিবর্তে অন্য কাউকে সেই মেয়েদের সঙ্গে কাম চরিতার্থ করতে পাঠানো আর অর্থ আদায় করা এ সব অন্যায় মার চোখে পড়েনি!

মেয়েটি ভাবতে লাগলো, আচ্ছা মা লক্ষ্মীর বিয়ে নারায়ণের সঙ্গে কত বছর বয়সে হয়েছিল? তিনি তো মেয়েদেরই প্রতিনিধি!

সধবা মেয়েরা! এ পূজো তাদের হলেও মায়ের কাছে কি তাদের কোন চাওয়া পাওয়া থাকতে নেই! তারা শুধুমাত্র স্বামীর মঙ্গল আর স্বামীর ধনের জন্যে সারাদিন উপোস থেকে তাঁর পূজো করবে, আর সে পূজোয় পুরোহিত নামের একজন যে কিনা পুরুষ, দক্ষিণার নামে অর্থ নিয়ে যাবে আর মেয়েটি তার অর্থের দরকারে স্বামীর কাছে হাত পাতবে!

তাহলে এ পূজো থেকে মেয়েটির প্রাপ্তি বলতে কী থাকলো? অথচ পূজোটি কিন্তু সম্পূর্ণ মেয়েদের।আচ্ছা মা কী এ জন্যেই পাঁচালি পড়েন না! মাকে একথা জিজ্ঞেস করা হয়নি কখনো। আর কয়েক দিন পরেই তো সে বাবার বাড়ি যাবে। এবার গেলে সে নিশ্চয় মাকে এইকথা জিজ্ঞেস করে আসবে। (চলবে)

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.