“বৈষ্ণব বাবা ও তাঁর মুক্তমনা মেয়ে “

MOnoroma Biswas 2
মনোরমা বিশ্বাস

মনোরমা বিশ্বাস: হিন্দু বৈষ্ণব পরিবারে জন্ম আমার , বাবা আচারনিষ্ঠ ধার্মিক মানুষ হলেও চিন্তার ক্ষেত্রে দেখেছি অপরিসীম উদার প্রকৃতি । হয়ত মানুষ গড়ার কারিগর বলে আজও  তাঁর ঔদার্য আমাদের কাছে বরাভয় হয়ে আছে। উদার পারিবারিক পরিমন্ডলে তিনি আমাকে  বড় করে তুলেছিলেন বলেই হয়ত আজ মনে হয়, এই যে মুক্তমনা হিসেবে আপন স্বতন্ত্র অবস্থান আমাকে গৌরব দেয় তার

পেছনে অনেকখানি অবদান বাবার । সেই ছোট্ট শিশুকাল থেকে সব বিষয়ে কৌতুহল আমাকে তাড়া করে ফিরত আর আদুরে মেয়ে ছিলাম বলে বাবা স্বস্নেহে আমার সব জিজ্ঞাসার জবাব দিতেন । বাবা-মেয়ের সম্পর্ক কখনো কখনো হয়ে যেত গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক। অদ্ভুৎ ভালোলাগা একটা সময় সেটা।

সেসময় বাড়িতে যে অনুষ্ঠানগুলোর আয়োজন হতো তার অনেক অনুষ্ঠান মনে এখনো বেশ দাগ কেটে আছে। কিছু অনুষ্ঠান তো আমার কাছে মনে হতো অঞ্চল ভেদে আলাদা। কারণ আমাদের বাড়িতে হতো  এমন অনেক অনুষ্ঠান পরে একটু বড় হয়ে দেখেছি  অনেক হিন্দু বাড়িতে নেই । এমনি এক পূজা যাকে  বলা হতো ‘ সুবচনীয় পূজা ‘ তা হতো আমাদের বাড়িতে । এ পূজার বৈশিষ্ট হলো এটা যেকোন শুভ কর্মের পর করা হত ।মাটি দিয়ে কুমীর ,কচ্ছপ বানিয়ে ,তারপর ব্রাহ্মণ ডেকে এনে  মন্ত্র পড়িয়ে হতো এই পূজা। এটা বিশেষ মাসে করা হয়,আমার ঠিক মনে নেই। এ ছাড়াও শীতের সময় আমরা ছোট ছোট মেয়েরা দলবেঁধে মাটি দিয়ে ‘ভিটে’ বানাতাম , আর সে পূজা হতো সন্ধ্যায়। এমনি আরো কিছু ছোট ছোট ধর্মীয় অনুষ্ঠান শৈশবে হতে দেখেছি যা এখন দেখি না, বিলুপ্ত হয়ে গেছে বা যাচ্ছে হয় । আরেকটি অনুষ্ঠান যা আমাকে মুগ্ধ করত ভীষণ তা হলো  কীর্তন। রামায়ন কীর্তন। এদের একটা দল ছিল, একজন নেচে গেয়ে রামায়নের কাহিনী বলতো, তার সঙ্গীরা তালে তালে গাইতো । রক্তে মনে হয় ছিল সুরের টান।মুগ্ধ বিস্ময়ভরা চোখে রাত জেগে  সেসব দেখতাম  ,শুনে এমনি বিহ্বল হতাম  যে কখনো ঘুমে চোখ জড়াতনা ।

একটু বড় হওয়ার পর দেখেছি, নামযজ্ঞ । একদিন এক রাত – অনবরত নাম কীর্তন হতো বাড়ীতে।আশে পাশের গ্রাম থেকে লোক আসতো । কত যে রান্না হত, সে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ যেন । সবাইকে খাবার দিতে হতো। সক্রিয় অংশ নিতাম। বাড়ীতে প্রচুর বৈষ্ণব সমাগম হতো ,অনেক ধর্ম কথা আলোচনা হতো।আমি খুব মনোযোগ সহকারে তা শুনতাম। যদিও অনেক পরে এসে এই শ্রেণীর লোকদের উপর আমার অটুট শ্রদ্ধার  আসনটি আর অটুট থাকেনি কিন্তু তখন পর্যন্ত শ্রদ্ধাবনত আমি ।

যা বলছিলাম , নিজের ভেতরে বেড়ে চলা অদম্য কৌতুহল , এই কৌতুহল তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে আমাকে । অ্যাকাডেমিক পড়ার ফাঁকে ফাঁকে যখনই সুযোগ পেয়েছি ধর্ম সংক্রান্ত যা কিছু হাতে এসেছে ,পড়তে দ্বিধা করিনি কোনদিন । যেমন নিজের আগ্রহে পড়েছি তেমনি পারিপার্শিক পরিবেশ থেকেও শিখেছি। আর এভাবেই একদিন বুঝেছি যে , সত্যের নাগাল পেতে ‘ ভক্তি ‘ নয়   ‘যুক্তি ‘র উপর শক্ত হয়ে দাঁড়াতে হবে । ব্যক্তিজীবন অথবা সামাজিক , সমস্ত ক্ষেত্রে সমস্যার উত্তোরন ঘটাতে যৌক্তিক উপলব্ধি ছাড়া গত্যন্তর নেই । এ

বোধ চেতনার গভীরে  পোক্ত হয়ে ঘাঁটি গেড়ে ফেলেছে ততদিনে । বিনা প্রশ্নে কোন কিছু গ্রহণ করতে রাজী ছিলাম না। আরেকটি বিষয় যা মোহমুক্তি ঘটিয়ে দেয় তা বলছি এ প্রসঙ্গে ।মুসলিম অঞ্চলে বাস,  হিন্দু মুসলিমদের মধ্যে একটা বিভেদ ছিল এটা বুঝতাম কিন্তু তা যে কতটা অমানবিক আর হাস্যকর  ভেবে অবাক হতে হয় ।একদিনের ঘটনা । পাশের বাড়ীর একটা ছেলে, যার সাথে আমার খুব ভালো বন্ধুত্ব ছিল, নাম আতিয়ার।ও আমাদের টিউব ওয়েল থেকে জল নিতে  আসতো প্রায়ই, সব সময় আমাকে ডেকে নিয়ে জলের কলস মাথায় তুলে  দিয়ে সাহায্য করতে বলতো। ভীষণ ভদ্র সে। একদিন আমিও ঐ সময় কলস নিয়ে জল আনতে গেছি । হঠাৎ আতিয়ার  দুষ্টুমি করে বলল, ‘তোমার কলস আমি ছুঁয়ে দেব’। কিছু না ভেবে আমিও উত্তর করলাম, ‘ঠিক আছে , ছুঁয়ে দাও, আমিও  তোমার কলস ছুঁয়ে দেব’। তখন ও বলল –

আমার কলস ছুঁয়ে দিলে কিচ্ছু হবে না, তোমার কলস ছুঁয়ে দিলে ভেংগে ফেলতে হবে। তখনই জলভরা কলস বাড়ীর ভিতরে নিয়ে গিয়ে রান্না ঘরে রেখেই বাবার কাছে গেলাম। বাবা ঘরের বারান্দায় বসেছিলেন । জিজ্ঞেস করলাম বাবাকে –

“বাবা, মুসলমানেরা আমাদের কলস ছু’লে সেই কলস ভেংগে ফেলতে হয় কেন ? “ বাবার উত্তর- “ ভেংগে ফেলতে হয় না, এটা একটা কুসংস্কার “ । বাবা সেদিন আমাকে বুঝিয়ে বলেননি কিন্তু তাঁর এ কথার মাধ্যমে আমি শিখে

নিয়েছিলাম আমার যা শেখার । শিখলাম ধর্মাচরের নামে যা প্রচলিত আছে তার

অনেক কিছু জাস্ট কুসংস্কার বৈ কিছু নয় ।

দেখেছি , দেখে অবাক , ক্ষুব্ধ দুটোই হয়েছি । এক মুসলমান মেয়ে জল খাবার জন্য টিউবওয়েল ধরেছে, অদূরে এক হিন্দু মেয়ে মাটির কলস নিয়ে দাঁড়িয়ে, দেখি প্রচন্ড রাগে সবার সামনে মেয়েটি কলস ভেংগে ফেলল। কল্পনা করা যায় !  ধর্ম চিরচেনা একসাথে বেড়ে ওটা

দুটো মানুষের মধ্যে কিভাবে ঘৃণার বীজ বুনে দেয় । তাও স্বার্থহীন , যুক্তিহীন কারণে । অবিশ্বাস্য ! আমার যুক্তিবাদী মন তখনই বলে উঠেছে এটা ভুল, এটা মানুষের ভেতরে যে শ্রেয়বোধটা থাকে তা নস্যাৎ করে দেয় । তা না হলে অকৃত্রিম আন্তরিকতা মেশানো সম্পর্ক নিয়ে একসাথে পথ চলছি  হিন্দু-মুসলমান  অথচ অদৃশ্য এক বিভেদ আমাদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে অলংঘনীয় প্রাচীর তুলে । এখন তাই এটা ধর্ম ,ধর্মীয় শিক্ষা, এবং কুশিক্ষা আমার কাছে সমার্থক হয়ে গেছে।

আরেকটা অভিজ্ঞতার কথা  বলে শেষ করব এ আত্মকথন। খুব মেধাবী ছাত্রী ছিলাম । ক্লাশে প্রথম হওয়া চাই আমার। হতামও তাই। বরাবর  ফার্স্ট হতাম  সব সাবজেক্টে পূর্ণ  নম্বর পেয়ে ।তাই ধর্ম সাবজেক্টও বাদ যেতনা ।মন দিয়ে পড়তাম সেটাও ।এটা তো সাহিত্যই,তাই আনুষংগিক অন্য বইও পড়তে হতো।একদিন একটা ধর্মীয় বই পড়তে গিয়ে দেখি ওতে লেখা , “ নারী হল নরকের দ্বার”।। আবার বাবাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম।বাবা একটু হাসলেন, কোন উত্তর দিলেন না ।আমি বাবার সামনেই বইটা ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। কিসের পুজা, কিসের গীতা পাঠ ! বাবাকে বললাম, রবি ঠাকুরের ‘গোরা ‘ পড়লে অনেক বেশি পূণ্যি হবে। ঐ মূর্তিগুলি কিছুতেই দেবতা হতে পারেনা। সবাই গৌরাঙ্গকে ঈশ্বরের অবতার বলে মানলেও ঐ বয়সে আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছি, উনি একজন মানুষ। বিয়ের পরও সে একই বিড়ম্বনা । একই প্রশ্ন । কেন পুজা করিনে । তখন নিরুত্তর থেকে এড়িয়ে যেতাম। দিন বদলেছে। যে আমি সেই কিশোরী বয়সেই চিন্তার জানালা খুলে দিয়েছি, সেই আমি তো এখন অবারিত সে জানালা দিয়ে আরো জোরে মুক্তচিন্তার সুবাতাস বইতে দিচ্ছি বাধাহীনভাবে। তখন চলার পথে সমমনা মানুষ পাইনি, এখন ফেসবুকের কল্যাণে উদারচিত্ত , প্রকৃত মুক্তমনা বন্ধুদের দেখা পাচ্ছি । যেন সবকটা জানালা খুলে গেছে আমার। এখন যদি কেউ আমাকে পুজা করার কথা বলে, ছেলে যদি তা টের পায় , সে তাকে সরাসরি ঘুষি মেরে দেয় । আমিও ভাবি কোন ছাড় নেই আর। কেন পুজা করিনে, এই কথা জিজ্ঞেস করার অধিকার কারুর নেই। আর বিরুদ্ধবাদীদের সাথে কোন ছাড় নেই। যুক্তির সাথে এখন শক্তি প্রয়োগেরও সময় এসেছে । আলোর সাথে অন্ধকার হাত ধরাধরি করে চলতে পারেনা ।

আমেরিকায় আসার পর জগত আরো প্রসারিত হল। কত ধর্মের লোক এখানে ! কত লোক ! বিভিন্ন স্তরের লোকদের সাথে মেশার সুযোগ হল। এখানে একটা জিনিস আমাকে মুগ্ধ করলো তা হল ধর্মের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে বিভেদ নেই। হিন্দু ধর্মের মধ্যে দেখেছি, মানুষের মধ্যে কত বিভেদ ! আমার এক কায়েস্থ টিচার ছিলেন, তার বাড়ীতে বেড়াতে গেলে টিচারের মা খুব কুৎসিত ধমক দিয়ে বলেছিলেন, রান্নাঘর ছোঁবে না। অথচ সেই রান্নাঘরের বারান্দায় বিড়াল বসে আছে। আমি নিম্নবর্ণের মেয়ে, ঐ বিড়ালের চেয়েও অচ্ছুৎ !এই ঘটনার পর কায়েত আর ব্রাহ্মণদের সযত্নে এড়িয়ে চলি।  আমেরিকাতে কেউ আর আমার ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করে না ।জাত পাতের

বালাই নেই এখানে । অদ্ভুত শোনাবে আমাদের দেশের লোকের কাছে যে, এতদিন এক সাথে কাজ করার পরও আমার সাথের মেয়েরা জানে না আমার ধর্ম কি । আমি সবার মানসিকতার মধ্যে একটা সামঞ্জস্য খুঁজে পেয়েছি, তা হল, এরা মানুষের ধর্মাধর্ম নিয়ে উদাসীন। এটা এদের শিক্ষার ফল, সবাই স্কুল থেকে এমন শিক্ষাই পেয়েছে। এদের স্কুল কলেজে ধর্ম শিক্ষা দেওয়া হয় না। পেশাগত কারণে অতি উচ্চ পর্যায়ের লোকের সাথে মেশার সুযোগ হয়েছে। যেমন, বিচারপতি। এরা বেশ রসিক প্রকৃতির। মানুষের সাথে ব্যবহারে আন্তরিক। আমাদের দেশের লোক ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত, এখানকার লোক ধর্ম ছাড়াই শিক্ষিত- এই দুই ধরণের লোকদের সাথে মিশে এটাই আমার উপলব্ধি – ধর্ম শিক্ষা মানুষকে সঠিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। এই হলো আমার ধর্মমোহ কাটিয়ে ওঠার গল্প।

অবশ্য এটা গল্প নয় , বাস্তব ঘটনা । যা  আমার অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে এখনো আমাকে অবিনাশী প্রেরণা যুগিয়ে যাচ্ছে ।

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.