নষ্ট সাংবাদিকতার ছোবলে মননশীলতা

online-student2সালেহা ইযাসমীন লাইলী: দিন দিন আশংকাজনক হারে বাড়ছে অনলাইন নিউজ সাইটের সংখ্যা। কোন ধরনের দায়বোধ ব্যাতিরেকে যে যার মতো এই নিউজ সাইটগুলো খুলে বসেছে। এই অনলাইনগুলোর আপলোডাররা নিজেকে সাংবাদিক বলে দাবিও করেন। জেলা-উপজেলায় প্রতিনিধিদের আইডি কার্ড দেয়া হয়।

হায় সাংবাদিকতা!  তারা যা খুশি আপলোড করে। লিঙ্ক শেয়ার করে ফেসবুকে। উহ! অস্থির লাগে। এসব নিউজ সাইটে যৌনতা ছাড়া যেন আর কোন ইস্যু নাই। যদিও অন্য কোন নিউজ থাকে সেটিকেও রগরগে করে উপস্থাপন করা হয়। যেন একেকটি পর্ণ সাইট। এই সাইটগুলোর পাঠকও ইয়াবা-ভায়াগ্রার বদলে যৌনউত্তেজক নিউজ পড়ে নিচ্ছে নেশার মতো। পাঠকদের লাইক কমেন্টের বদৌলতে এই সাইটগুলো ফেসবুকের হোমপেজে বার বার আবির্ভুত হয়।

বাধ্য হয়ে ফেসবুকের ফ্রেন্ডলিস্ট প্রতিদিন ছোট করতে হয় এই সব লাইকারদের ব্লক করতে।

দেশ-বিদেশের বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে যৌনতা সম্পর্কিত নিউজগুলো বেছে নিয়ে নিজের মতো করে অনুবাদ করে তারা। আর তাদের পাঠকদের আগ্রহ বাড়াতে প্রায় সব নিউজের পাশে ‘ভিডিওসহ দেখুন’ কথাটি জুড়ে দেয়া হয়। সত্য-মিথ্যা যাচাই ছাড়া, বস্তুনিষ্ঠতার তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো শব্দ বাক্য ব্যবহার করা হয়। মানুষের রুচির বিবর্তন হতে হতে কোথায় গিয়ে ঠেকেছে এসব সাইট দেখে আন্দাজ করতে কষ্ট হয় না। এই মানুষগুলোর মনোবিকাশ কেমন জগতে?

কোন বাড়িতে বেড়াতে গেলে আমি সে বাসার মানুষকে বোঝার ও চেনার চেষ্টা করি সে বাড়ির বইয়ের আলমারী দেখে। আলমারীর তাকে তাকে খুঁজি বাড়ির মানুষের রুচি-চিন্তা-মনন। ছোটবেলা থেকে আমার এমন খোঁজাখুঁজি। আগে কারো বাসায় গিয়ে তার বইয়ের সংগ্রহ ও গানের ক্যাসেট-সিডি দেখে তার সম্পর্কে একটা ধারণা করে নিতাম। আমার সাথে যারা বেড়াতে যেত ফিরে এসে তাদের কেউ কেউ সে বাড়ির মানুষের রূপ সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলতো, কেউ তাদের সর্ম্পদ-প্রাচুর্য নিয়ে কথা বলতো, কেউ আবার পরিবারের কে কি করে, আগামীতে করবে এমন সব ফিরিস্তি দিতো। আমি দেখতাম তাদের মতো করে কিছুই আমার খেয়াল করা হয়নি।

আমি বলতাম, ‘সেই বাড়িতে আলমারীতে এই এই বইগুলো দেখেছি, চমৎকার কিছু গানের সংগ্রহ আছে তাদের। সে বাড়ির ছেলেটা বা মেয়েটা এই বইগুলো পড়ে, ভাল গান গায়।’

পথে চলতে গেলেও কারো হাতে একটা পত্রিকা দেখলেই তার সম্পর্কে একটা ধারণা করা যায়। তার দৃষ্টিভঙ্গী, চিন্তা, আদর্শ বা দর্শন বোঝা যায় তার হাতের পত্রিকাটি দেখে। জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকাগুলো ভিন্ন ভিন্ন আদর্শিক জায়গা থেকে নিউজ করে থাকে বলে তাদের গ্রাহকও ভিন্ন। মানুষের রুচি, মানসিকতা তাকে কি পড়বে না পড়বে ঠিক করে দেয়।

মানবজমিন পত্রিকা একটি মসালাদার পত্রিকা। বিশেষ ধরনের পাঠক এই পত্রিকার গ্রাহক। আমার রুচিতে বাঁধে এমন পত্রিকা হাতে নিতে। তবুও পত্রিকাটির বাড়াবাড়ির মাত্রা মাপতে মাঝে মাঝে পড়ি। কিন্তু খুব গোপনে। যেভাবে মানুষ গোপনে নীল ছবি দেখে। কারণ এই পত্রিকা হাতে যদি কেউ দেখে ফেলে, আমার রুচি নিয়ে তাদের একটা ধারণা হবে। এতো অরুচিশীল আমি হতে পারিনা। নিজের কাছেও যেমন, অন্যের কাছেও তেমনি। তাই মানবজমিনকে আমি এড়িয়ে চলি। কিন্তু এই নিউজ সাইটগুলো?

লোকাল পত্রিকাগুলোতে কারো বা কোন প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির খবর যে উদোমভাবে ছাপানো হয় তাতে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কোন বক্তব্য ও সাফাইয়ের কোন তোয়াক্কা করা হয় না। অধিকাংশ সময়ে সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি বলে তার বক্তব্য দেয়া গেল না বলে উল্লেখ করা হয। একইভাবে কোন ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের গুণকীর্তনও করা হয় নির্লজ্জভাবে, সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যতই আলোচিত-সমালোচিত হোক না কেন! ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি বা বখরা পেতে এই পত্রিকাগুলো বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। কোন নিয়মনীতি বা আদর্শিক বিষয়ের ধারে কাছেও এই পত্রিকা যাওয়ার চেষ্টা করে না। এই পত্রিকার গ্রাহকরা পত্রিকা পড়ে শুধুমাত্র কাকে কত উপরে তোলা হলো, আর কাকে জমিনে ফেলা হলো তা দেখে বিনোদন পাওয়ার চেষ্টা করে। শুধু সাংবাদিক হিসেবে নিজের মাথা হেট হয় এসব দেখে।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা বাক স্বাধীনতা অর্থ যা ইচ্ছে তা করা কি? কিন্তু এই নিউজসাইট গুলোর স্বাধীনতা দেখে আতংকিত হওয়া ছাড়া কোন উপায় দেখছি না। ইয়াবা-ভায়াগ্রার চেয়ে বেশী উত্তেজক এ নিউজ সাইটগুলো দেশীয় সংস্কৃতি যেভাবে ধ্বংস করছে, তেমনি অপরাধপ্রবণ হয়ে পড়ছে পাঠকরা। এই মাদকতা থেকে রক্ষা করতে সরকারের উচিত নীতিমালা করে এসব সাইট বন্ধ করা। সেইসাথে যারা এই সাইটগুলোর খবরে লাইক, কমেন্ট করে উৎসাহিত করে  তাদেরও শনাক্ত করে শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত।

সাংবাদিক ও লেখক

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.