একজন ভালো মানুষ হওয়াটা ভীষণ জরুরি

0

ফারহানা আফরোজ রেইনী:

একজন ভালো মানুষের সান্নিধ্যে আসা বা থাকা যে কত বড় আশীর্বাদ তা কেবল বোঝা যায় যখন ঠিক তার উল্টো বৈশিষ্টের মানুষের সান্নিধ্য পাওয়া যায়। ভালোর উল্টো বৈশিষ্ট্য বলতে খারাপই বোঝায়। কিন্তু আমি খারাপ কথাটা ব্যবহার করতে চাই না। কারণ ভালো বা খারাপ বিষয়টি আপেক্ষিক।

আমার কাছে যে ভালো, সে আরেক জনের কাছে ভালো নাও হতে পারে, আবার আমি যাকে খারাপ ভাবি, সে হয়তো আরেকজনের কাছে দেবতুল্য। তাই এই আলোচনার খুব গভীরে না গিয়ে বরং আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে আমরা কতটুকু ভালো হয়ে থাকতে পারি, তার একটা আলোচনা করা যেতে পারে।

আমরা অনেকেই আছি, যারা অকারণেই বা ছোট ছোট কারণে অহংবোধ লালন করি এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োগও করে থাকি। বিভিন্ন কারণে এই অহংবোধ হতে পারে। আমরা খুব বেশি জানি বলে হতে পারে, ভালো পজিশনে কাজ করি বলে হতে পারে, আমি ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়ি বা চাকরি করি বলে, আমার রেজাল্ট অন্যদের তুলনায় ভালো বলে, আমি সুন্দর বলে ইত্যাদি ইত্যাদি আরো নানাবিধ কারণ থাকতে পারে।

এই অহংকার বোধ থেকেই আমাদের আচরণের নেতিবাচক বৈশিষ্টগুলো প্রকাশ পেতে থাকে। যেমন, অন্যের সাথে অশোভন আচরণ করা, ভদ্রতাবোধের অভাব, নিজেকে অকারণে ব্যস্ত দেখানো, আঘাত করে কথা বলা, ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্যের ক্ষতি করা ইত্যাদি।

আমার এমন কিছু মানুষ দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছে যারা নিজের কাজটা হাছিল করার জন্য যত রকমভাবে ভালো ব্যবহার করা যায়, করবে, কিন্তু আপনি কোনো কাজ নিয়ে যান; হয় ব্যস্ততার ভাব দেখাবে, না হয় এমন ভাব করবে যেন তার কাছে সাহায্য চেয়ে আপনি বিরাট কোনো অন্যায় করে ফেলেছেন, এবং আপনার মধ্যে ওই অপরাধবোধটা ঢুকিয়ে দেবে। আপনি বেচারা ভাবতে থাকবেন, ইস কেন যে গেলাম! আরও একটা কাজ তাদের করতে দেখা যায়, তা হলো আপনাকে continuous ঘুরাতে থাকবে ‘এখন না তখন’ বলে। এক পর্যায়ে আপনি নিজেই লজ্জা পাবেন তার কাছে যেতে।

এইরকম আচরণ করা কতটা জরুরি? যেমন করে নিজের কাজটা আদায় করা হয়েছে, ঠিক অন্যকে সাহায্য করার ব্যাপারে যদি একই রকম ভালো ব্যবহার করা হতো, তাহলে তো লাভ বই ক্ষতি কিছু হতো না। অস্বস্তিকর সম্পর্ক তৈরি না হয়ে বরং সুন্দর সাবলীল একটা সম্পর্কের মধ্য দিয়ে চলা যেত। এই ধরনের আচরণ করার পর আমরা নিজেকে কি কখনো প্রশ্ন করে দেখি “এটা আমি কেন করলাম?” এটা করা কি আমার ঠিক ছিল?” আমরা বেশির ভাগ মানুষই তা করি না। আর করি না বলেই অন্যের সাথে অবলীলায় খারাপ ব্যবহার করতে আমাদের বাধে না। আবার কখনো যদি মনেও হয় যে কাজটা ঠিক হয়নি, তাহলে একটা SORRY বলে দায়িত্ব শেষ করে ফেলি। যার সাথে খারাপ ব্যবহার করা হলো বা যাকে অপমান করা হলো, বা যাকে আঘাত করা হলো, তার কি ওই SORRY বলাতে কিছু এসে যায়?

তাই আমার কাছে ভালোর সংজ্ঞা হলো নিজের কাছে সৎ থাকা, নিজেকে প্রশ্ন করার মতো সৎ সাহস থাকা, নিজের প্রত্যেকটা আচরণের যৌক্তিক ব্যাখ্যা নিজের কাছে থাকা। ব্যস, এতোটুকু করেই দেখেন না আপনার আচরণকে আপনি কী চমৎকার ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন!

আমার একজন খুব ভালো মানুষের সান্নিধ্যে থেকে তার সাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। তিনি সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন, আর তার মতো জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি। সেই স্যার সব সময় বলতেন, “জীবনে সফল মানুষ হওয়ার আগে ভালো মানুষ হওয়াটা দরকার। একজন ভালো মানুষ সব সময়ই সম্মানীয়, কিন্তু সফলতা ভালো-খারাপের মানদণ্ডে যাচাই করা হয়। সব সফল মানুষই সম্মানীয় হয় না”। তার মুখে আরেকটা কথা অনেকবার শুনেছি, “ফলবান গাছ সব সময় ফলের ভারে নুয়ে থাকে, আর আমরা মানুষেরা জ্ঞানবান হয়ে যদি আচরণে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করি তাহলে তো প্রকৃতির শিক্ষাটা আমাদের কোনো কাজে লাগলো না। আমরা যত জ্ঞানী হবো, আমাদের তত বিনয়ী হওয়া উচিত”। ব্যক্তি হিসেবে তিনি ঠিক তেমনটাই ছিলেন। আর তাই তার সম্পর্কে তার অনুপস্থিতিতেও যদি কোনো কথা কেউ বলতেন, তাদের কথাতেই কোথায় যেন শ্রদ্ধাবোধটা ঠিক টের পাওয়া যেত।

স্যারকে যতবার দেখেছি, ততবার মনে হয়েছে মানুষ হলে আসলে এরকমটাই হওয়া উচিত। আমি খুব ভালো কাজ জানতে পারি, আমার মূল্যায়ন শুধু কর্মক্ষেত্রেই হবে, আর সাথে যদি ভালো মানুষ হই, সেটা আমার কর্মক্ষেত্রটাকে আরো উজ্জ্বলই করবে।

জীবনের শেষে এমনকি মৃত্যুর পরও যে পরিচয়টা বেঁচে থাকবে, তা হলো আমি মানুষ হিসেবে কেমন ছিলাম। আবার কেউ যদি সুন্দর হয়, তাহলে তার সৌন্দর্যের মূল্যায়ন হবে ততদিন শুধুমাত্র যতদিন তার সৌন্দর্য আছে।
একবার ভাবুন তো সৌন্দর্য কি সব সময় থাকে? আর সৌন্দর্যের সাথে যদি সে একজন ভালো মানুষ হয়, তাহলে তার সৌন্দর্যের দ্যুতিটা কিন্তু বাড়বে, আর দিনশেষে সৌন্দর্য না থাকলেও তার ভালো ব্যবহার টাই তার প্রতি সকলকে আকৃষ্ট করবে।
আপনি মানুষের মনে দুই ভাবেই স্থান করে নিতে পারেন; নন্দিত হয়ে আবার নিন্দিত হয়েও। কোন পথটা বেছে নেবেন তা আপনার পছন্দ। তবে আমার মনে হয় দিনশেষে নন্দিতরা আরো নন্দিত হোন, আর নিন্দিতরা আক্ষেপ করতে থাকেন।

অন্যকে ভালো করার দায়িত্ব আমরা না নেই! বরং প্রত্যেককেই চেষ্টা করি নিজে ভালো হতে। বদলটা তো নিজের দিয়েই শুরু করতে হয়, তবেই না বদলাবে সংসার, সমাজ, আর দেশ।
সত্যিই আমাদের ভালো মানুষ হয়ে উঠাটা ভীষণ দরকার।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 956
  •  
  •  
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    959
    Shares

লেখাটি ১,৩৩১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.