প্রবাসের সম্পর্কগুলো সূতোয় টানা

0

শর্মিষ্ঠা সাহা:

দেশ ও রক্তের বন্ধন ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলাম বহু শংকা ও প্রত্যাশা বুকে নিয়ে। শংকা ছিল বাবা-মা, ভাই-বোন ছেড়ে থাকবো কী করে! ভাবনা ছিল নিশ্চিত সরকারি চাকরি ছেড়ে যাচ্ছি, ভাল কোনো চাকরি হবে তো? প্রত্যাশাও কিছু কম নয় – আমার সন্তান জন্ম নেবে উন্নত বিশ্বের নিরাপত্তায়, যেকোনো কাজে সরকারি অফিসে গেলে ঘুষ দিতে হবে না, আরও কত কী!

বিদেশের মাটিতে এসে প্রথম অনুভব করলাম বন্ধু বন্ধুর জন্য কতটা করতে পারে। বাংলাদেশে থাকলে এভাবে কখনোই বুঝতে পারতাম না। নিজের বাসায় রেখে বাসা ঠিক করে দেওয়া থেকে শুরু করে সব রকম সহযোগিতা পেয়েছি বন্ধুত্বের দাবিতে। “বিদেশে বাঙালি স্বজন” – এর সূত্রে বন্ধুত্ব হয়েছে অনেকের সাথে। স্বভাবতই এসব বন্ধুত্বের মাত্রা ও গভীরতা ভিন্ন ভিন্ন – কারও সংগে মনের মিল প্রচুর, অথচ কথা হয় মেপে মেপে, আবার কারও সংগে মানসিকতার বিস্তর পার্থক্য সত্ত্বেও সহজ মেলামেশা। যদিও আদর্শ সম্পর্কের বিচারে কোনটাই কালোত্তীর্ণ নয়, তবুও প্রবাস জীবনে আত্মীয় পরিজনের অনুপস্থিতিতে সব সম্পর্কই বিধাতার আশীর্বাদের মতো।

সন্ধ্যার মৃদুমন্দ বাতাসে মনটা যখন দেশের জন্য উতলা হয়ে ওঠে, ফেসবুক অসহ্য মনে হয় তখন সেই অলংঘ্য শূন্যতাকে ভরিয়ে দিতে হাত বাড়িয়ে দেয় প্রবাসের বাঙালি স্বজনেরা। এখানে উইকএন্ডগুলো তাই পার্টি আর গেট টুগেদারে ঠাসা – সামাজিক আড্ডাবাজির জন্য উপলক্ষ্যের অভাব হয় না। এসব আড্ডায় অনেক সময় প্রাণের স্পর্শের অভাব থাকলেও প্রণোচ্ছলতার কমতি থাকে না। হাস্যোজ্বল রমণীদের রঙ বেরঙের ছবিতে ভরে যায় ফেসবুকের নিউজফিড। প্রথম বিশ্বের চরম ব্যস্ত জীবনের জন্য এগুলো মৃতসঞ্জীবনী সুধার মতো।

প্রথম প্রথম দেশ ছেড়ে আসার পর মনটা খুব খারাপ হতো, যখন-তখন বাবা-মায়ের কাছে যাবার জন্য মন কেমন করতো। তখন একটু সময় পেলেই পরিচিত কাউকে ফোন করে তার বাসায় গিয়ে হাজির হতাম আড্ডা দেবার জন্য। এভাবে অযাচিত অতিথি হয়ে অনেককেই জ্বালিয়েছি। ছেলের জন্মের পরেও এমন যাতায়াত অব্যাহত রেখেছি দীর্ঘদিন। আমাদের বাসায় এভাবে কখনো কেউ এলে খুব ভাল লাগতো।

স্বভাবতই ধরে নিয়েছিলাম, যার বাসায় যাচ্ছি সেও খুশি হচ্ছে। কিন্তু ধীরে ধীরে অনুভব করলাম, হয়তো তাদের জন্য বিড়ম্বনাই ঘটাচ্ছি। ব্যস্ত সময়ের মাঝে আমাদের জন্য যে সময়টুকু ব্যয় করতে হচ্ছে, তাতে ওদের রুটিন বিলম্বিত হচ্ছে। একদিন-দুইদিন ব্যাপারটা মেনে নিলেও ঘন ঘন গেলে মন থেকে সেটা মেনে না নিতে পারাটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া ছেলেটা বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে নতুন সমস্যা হয়ে দেখা দিল ওর দুষ্টুমি – যেখানেই যাই এটা-ওটা ধরতে চায়, নিজের বাড়ি পরের বাড়ি বোঝে না। এদিকে মাঝে মাঝে ছেলের কান্নাকাটির জন্যই ওকে নিয়ে যেতে বাধ্য হতাম পরিচিতদের বাসায়। ধীরে ধীরে এমন হলো যে, আমার বন্ধুদের চেয়ে ছেলের বন্ধুদের বাসায় যাতায়াত বেড়ে গেল। একদিকে নতুন আঙ্গিকে বন্ধুত্বের পরিধি যেমন বাড়লো, অন্যদিকে পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে শুরু করলো।

বহুবার মনে মনে প্রার্থনা করেছি, আমি যেতে পারছি না দেখে বন্ধুরা আমার বাসায় আসুক কোনো নিমন্ত্রণ ছাড়াই। কিন্তু বলাই বাহুল্য, এমন ব্যতিক্রমের সংখ্যা খুবই নগণ্য। তবে একটা ব্যাপার আমি সব সময় লক্ষ্য করেছি, নিমন্ত্রণ করলে কিন্তু সবাই সেটা রক্ষা করার চেষ্টা করে, হাজার ব্যস্ততা সত্ত্বেও। সকলের মুখেই একই অভিযোগ, প্রবাসে উইকএন্ডগুলো ভীষণ ব্যস্ত – বাজার করা, রান্না করা, বাড়ি পরিষ্কার করা, বাচ্চার সুইমিং বা কোচিং – আর সবার উপরে পার্টিতে যাওয়া।
কিন্তু কোনো সপ্তাহে একেবারে নিমন্ত্রণ না থাকলেও যেন ভালো লাগে না। ছোট হোক, বড় হোক, যেকোনো একটা পার্টিতে যেতে পারলে প্রবাস জীবনের একাকিত্বটা যেন কিছুটা হলেও কমে। উপরে যে যেমনই ব্যবহার করুক, বা মুখে যাই বলুক না কেন, সকলেই কম-বেশি একাকিত্বে ভোগে। এই একাকিত্ব থেকে মুক্তি পেতে বহু ছোট ছোট দল গড়ে ওঠে। তারা সবাই একসঙ্গে ক্যাম্পিংয়ে যায়, ঘুরতে বা মাছ ধরতে যায়। ওদের সময়টা নিশ্চয়ই ভালই কাটে।

যেকোনো কারণেই হোক, আমরা এমন কোনো দলে ভীড়তে পারিনি। তবে আমাদের পরিচিতির গণ্ডিটা অনেক বড়। আমি ছেলেবেলা থেকেই কারও অবহেলা সহ্য করতে পারি না, বিশেষ করে কাউকে যদি কাছের মানুষ বলে মনে করি। পরনিন্দা, পরচর্চা তো আমার ধাতেই সয় না। তাই সবসময় সতর্ক থাকি যেন সবার সঙ্গে একটা নূন্যতম দূরত্ব বজায় থাকে। এতে করে কারও সঙ্গে বড় ধরনের ঝামেলা হওয়ার সম্ভবনা কমে যায়।
এই প্রবাস জীবনে অনেককে দেখেছি খুব দহরম মহরম, আবার কিছুদিন বাদে তাদেরই মুখ দেখাদেখি বন্ধ। আবার আজ যার কঠোর সমালোচনায় মুখর, কাল নেই সবচেয়ে কাছের বন্ধু। এমনটা আমার মোটেই সহ্য হবে না। তাই ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের রস থেকেও বঞ্চিত। আমি নিজেকে ব্যস্ত করে তুলেছি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মহড়া, মঞ্চ নাটক, বাংলা স্কুলে শিক্ষকতা – এসবের মাঝে।

আমাদের একমাত্র সন্তান একটু বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে নি:সঙ্গতায় ভুগতে শুরু করে। সঙ্গীর অভাব মেটাতে ডিজিটাল ডিভাইসের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। একবার চোখ নষ্ট হবে বলে ওকে বকা দেই, আবার ভাবি ওই বা কী করবে! আমাকে ওর সঙ্গে খেলতে হবে, অথবা বই পড়তে দিতে হবে। কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণ ছেলেকে ধরে রাখা যায়! আমার এতো সময় কোথায় ওকে নিয়ে খেলা করার! সারাদিন অফিস করে যখন বাসায় ফিরি, তখন বাসার কাজগুলো হা করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে গৃহকর্মের পাশাপাশি সামাজিকতার চাপ। এতো কিছুর ভীড়ে নিজের জন্য সময় বের করা্ই দায়। আমার ভিতরের লেখক সত্ত্বাটা মাঝে মাঝেই চোখ রাঙায়। লেখাগুলো যখন তখন মাথায় হানা দেয়, আবার হারিয়ে যায়। কাগজের পাতায় কালো অক্ষরে লিপিবদ্ধ হবার সুযোগ পায় না। এর মধ্যে ছেলের সঙ্গে খেলা করাটা বিলাসিতাই বটে।

তাইতো ওকে যতদূর সম্ভব সামাজিক করে তোলার চেষ্টা করি। যেকোনো সামাজিক সমাবেশে বন্ধু করে নিতে ওর সময় লাগে না। তবুও বিশেষ কিছু বন্ধুর সাথে ছেলেটা ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এমনি একজন বন্ধুর বাড়িতে ছেলে খুব যেতে চায়। ওরাও দেখি ওকে খুব পছন্দ করে। স্বভাবতই এই পরিবারটির সঙ্গে আমরা সবাই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে যাই। যখনি আড্ডা দিতে ইচ্ছা হতো, ছেলেকে নিয়ে চলে যেতাম ওদের বাড়ি। সন্ধ্যেটা কাটিয়ে হালকা মনে বাড়ি ফিরতাম। মানসিকতা ও রুচিবোধের বিস্তর তফাত সত্ত্বেও বন্ধুত্বটা গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়।

কিন্তু এতোদিন যে কারণে কারও সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ হতাম না, আমার সেই ভয়টাকেই সত্য প্রমাণ করে এই সম্পর্কটা ভেঙে যায়। আমার নয় বছরের ছেলের একটা কথাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে ওরা দূরে সরে গেল। অথচ আমার ছেলে কিন্তু ওদের ভুলতে পারে না – মাঝে মাঝেই আমাকে প্রশ্ন করে, আবার কখন ওদের বাসায় যেতে পারবে। আমি ওর ছোট হৃদয়ের আকুতিটা বুঝতে পারি, কিন্তু কোনো সদুত্তর দিতে পারি না। তাই মুখ ঘুরিয়ে নিজের আবেগ লুকাই।

লেখক: শর্মিষ্ঠা সাহা, পার্থ, অস্ট্রেলিয়া

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 268
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    268
    Shares

লেখাটি ১,৯৯৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.