বাংলাদেশের ‘হিজাব ডে’ নিয়ে ভয়

1

h2মারজিয়া প্রভা: অনলাইন পোর্টাল উইমেন চ্যাপ্টার এ হিজাব সংস্কৃতি নিয়ে অনেক লেখাই লেখা হয়েছে। এটা এ দেশের সংস্কৃতি না, বা এটা আমাদের দেশের মধ্যে হুট করে ঢুকে একটা অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। আমার এইসব বিষয় নিয়ে সত্যিই কোন মাথাব্যাথা নেই। আমি নিজে হিজাবি না, কিন্তু আমার প্রচুর বন্ধু হিজাব পরেন এবং এতে তাদের উদার মন-মানসিকতার কোন রকম পরিবর্তন হয়নি।

হিজাব মানেই কনজারভেটিভ, গোঁড়ামি মানসিকতার, এটা কখনই মনে হয় না আমার কাছে! আমি যেমন জিন্স পরি, অন্যেরা হিজাব পরেব্যস এইটুকু!

১ ফেব্রুয়ারিতে ‘ওয়ার্ল্ড হিজাব ডে’ পালন করছে বাংলাদেশের মেয়েদের একটি সাইক্লিং গ্রুপ। তারা নন-মুসলিম, নন-হিজাবিদের একদিনের জন্য হিজাব পরে সাইকেল চালাতে বলেছেন! খুব ভালো! একটা ফেস্টিভ ব্যাপার-স্যাপার। অনেকেই ‘উই সাপোর্ট হিজাব ডে’ টাইপ লিখে স্লোগান দিচ্ছে। আমার খুব কাছের বন্ধুরাও রয়েছেন এতে। ইভেন্টে গোয়িং দেবার আগেই, আমার কেন জানি মনে হল, একবার দেখে আসি, ভেতরের কথা!

আমি অবাক হয়ে গেলাম, এক দিনের জন্য নন মুসলিম বা নন হিজাবি মেয়েদের হিজাব পরার আমন্ত্রণ জানিয়ে এরা মেয়েদের পোশাক নিয়ে রীতিমত পোস্টমর্টেম শুরু করেছে।

h1তারা জিন্সের সঙ্গে হিজাব পরাকে কোনভাবেই মানছে না! তারা ওড়না সরে যাওয়া কোন মেয়ের হিজাব পরাকে মানছে না! এবং আবার সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলছে, সব ধর্মেই হিজাব পরার নির্দেশ আছে, সব ধর্মেই মেয়েকে চুল ঢাকতে বলেছে!

আমার রীতিমত স্ববিরোধী একটা ইভেন্ট বলে মনে হয়েছে এটাকে। তারা যখন বলছেই নন-মুসলিম, নন-হিজাবি মেয়েরাও এটাতে অংশ নিতে পারবে, তাহলে কেন আলাদা ড্রেসকোড সৃষ্টি করছে?

ওয়ার্ল্ড হিজাব ডে এর ওয়েবসাইট থেকে জানছি নাজমা খান নামে যুক্তরাষ্ট্রের এক বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত কন্যা অনেক আগে থেকেই হিজাব নিয়ে যুদ্ধ করে আসছেনতিনি হিজাব পরেছেন বলে ওসামা বিন লাদেনের সন্ত্রাসী দলের লোক বলে তাকে ভাবা হয়েছে। এইসব বিরোধিতা ও প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও তিনি হিজাব পরে গেছেনতাই তার ইচ্ছা সারাবিশ্বে একদিন সব মেয়েরা হিজাব পরুক! সেই থেকেই হিজাব ডে শুরু। এইবার সারা বিশ্বের ১৪০টি দেশে ‘হিজাব ডে’ পালিত হবে! তার মতে, হিজাব হয়ে উঠেছে পীড়িত মানুষের প্রতিবাদের হাতিয়ার!

প্রতিবাদের জন্য কালো ব্যাজ পরতে পারি আমরা, তবে হিজাবেও তো কোন সমস্যা থাকার কথা নয়! কিন্তু আছে! বঙ্গদেশের ব্যাপার-স্যাপার।

সারা ওয়েবসাইট ঘেঁটে হাজারও হিজাবি পেয়েছি যারা টাইট জিনস কুর্তা পড়েই হিজাব পরছে। আমার বঙ্গদেশীয় অ্যাম্বাসাডর একটা মেয়ের ছবি দিচ্ছে কিছুক্ষণ পর পর, আর বলছে ‘আমরা এইরকম হিজাব সাপোর্ট করি না’! তাইলে কি বোরকা পিন্দে সাইকেল চালাবো? নন-মুসলিম বা নন-হিজাবি মেয়েদের অংশগ্রহণে তাহলে স্বচ্ছতা থাকলো কই?

এর মধ্যেই হিজাব নিয়ে শুরু হয়ে গেছে রাজনীতি, এক ছেলে বলেছে, দেশের সব স্কুলে মেয়েদের হিজাব পরতে বাধ্য করতে !

আরেক ছেলে একটা ট্রল পোস্ট শেয়ার দিয়েছে, কেন হিজাব পরা জরুরি! খোলা চকোলেটে মাছি বসে, বন্ধতে বসে না!

h4একটা স্লিভলেস ব্লাউজের সঙ্গে শাড়ি পরা মা বাচ্চাকে নিয়ে দৌড়াচ্ছে, আরেকজন মা নিজে বোরকায় ঢেকে মেয়েকেও বোরকা পরিয়ে দৌড়াচ্ছে! হোস্ট এরকম দুটি ছবি পাশাপাশি রেখে বলছে, কোনটি ভাল! মানে মা হয়ে বাচ্চাকে নিয়ে দৌড়ালে ভাল মা হওয়া যাবে না, মেয়েকে কেবল বোরকা পরালেই মা ভাল!

যার যার বুঝ, তার তার তরমুজ!

আমি জানতাম এই দেশে ওয়ার্ল্ড হিজাব ডে পালিত হলে, সেটা ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধে যেতে পারবে না! পারেওনি! একটা মেয়ে হয়ে, মেয়ের ছবি শেয়ার করে তাই এই ইভেন্ট হোস্ট বলছেন, “এটা হিজাব না”! তাইলে কোনটা হিজাব! যেটা শুধু তিনি মেইনটেইন করেন?

“হিজাব” নিয়ে আমার ভয় কোনকালেও ছিল না! কিন্তু এখন হচ্ছে, যখন হিজাবে প্রকারভেদ আসছে, এটা ঠিক, ওটা বেঠিক! হিজাব দিয়ে নীতি নির্ধারণ করা হচ্ছে একটা মেয়ে ভাল না খারাপ! একজন মায়ের ভাল কাজ হচ্ছে মেয়েকে বোরকা পরানো! এবং সবচেয়ে আশ্চর্য লাগছে হিজাব দিয়ে আমাদের পুরানো মাছিতত্ত্ব আনা হচ্ছে। হিজাব না পরলেই মাছি মানে ছেলেরা শরীরের উপর বসলে কিচ্ছু করার নেই!

বর্তমান প্রেক্ষাপটে হিজাব একটি ফ্যাশন অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে! জিন্সে যেমন সমস্যা নেই, লেগিংসে সমস্যা নেই, ওড়না পরা বা না পরাতে সমস্যা নেই! হিজাবে থাকবে কেন? একটা মেয়ে নিজের ইচ্ছামতো জিন্সের সঙ্গে হিজাব পরলে কোন সমস্যা নেই!

নাকি হিজাব কেবল একটা ধর্মেরই? এবং ‘হিজাব ডে’ কেবল ওই একটা ধর্মের জয়জয়কার করতেই পালন করা? তাহলে যে হিজাবকে শোষিত মানুষের প্রতিবাদ বলা হচ্ছে, তার আড়ালে লুকিয়ে আছে সাম্প্রদায়িকতার বিষ?

আমার ভয় হচ্ছে, সত্যিই যদি এই ডে নামক প্রহসনের এর ছায়াতলে কোনদিন একটা মেয়েকে এনে জোর করে হিজাব পরতে বাধ্য করা হয়, তখন ওই অন্ধসংস্কার রুখবে কে?

 

শেয়ার করুন:
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

লেখাটি ২,৩৯৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

এই লেখাটিই আমি বুঝাতে চেয়েছি “হিজাব আমাদের সংস্কৃতি ছিলনা কখনোই” লেখাটার প্রতিক্রিয়ায়। যদিও এডমিন থেকে আমার কমেন্ট ৪ দিন ধরে ঝুলিয়ে রেখেছিল মডারেশনের নামে। আপনাকে ধন্যবাদ হিজাবের প্রসারতার ভয়াবহতা নিয়ে লেখাটার জন্য। কে হিজাব পড়বে আর কে হিজাব পড়বেনা সেটা একান্তই একজনের ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু হিজাবকে যদি পুতপবিত্রা নারীর প্রতীক হিসেবে দেখানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয় তবে সেটা সমাজের জন্য বেশ বিপজ্জনক বটে। যদি হিজাব না পড়ার কারণে কেউ বিদ্রুপের বা বাজে মেয়ের উপাধি পান তবে আমি অবশ্যই হিজাবের বিপক্ষেই থাকব কারণ হিজাব এখানে বৈষম্যের এবং মানুষের মাঝে উদ্ভট মনোবৈকল্যের বিকাশ ঘটাচ্ছে। পোশাকে কখনো চরিত্র বদল হয়না, আগে চরিত্র ঠিক করুক, তারপর নাহয় হিজাব বা অন্য কোন পড়ার চিন্তাভাবনা আসবে।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.