আমাদের উৎসবটা ফিরিয়ে দ্যান প্লিজ…

Election 2ইশরাত জাহান ঊর্মি: সবচেয়ে প্রিয়জন, যাকে আপনি সবচেয়ে আস্থায় রাখেন, যার চরিত্রের দৃঢ়তা আপনার গর্বের কারণ, হঠাৎ যদি একদিন আবিষ্কার করেন তার কোনো পুরুষালি দোষ আছে, অথবা তার চরিত্রের স্খলন হয়েছে-তাহলে আপনি যেরকম ভেঙে পড়বেন, আমিও সেরকম ভেঙে পড়েছি।

রাতে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমোতে গেছি। টেনিল টেন এমজি। তারপরও শান্তির ঘুম হলো কই? থেকে থেকে বাতাসে উঠেছে দীর্ঘশ্বাস।

আমার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার, আমার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার সরকার, আমার মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার লড়াই করা সরকার, আমার আনিসুল হককে ভোট দেবো, নাকি সাকিকে, সেই দ্বিধায় ফেলে দেওয়া সরকার…সেই সরকারই যদি প্রকাশ্যে বীরদর্পে ব্যালট পেপারে সিল মারে, তখন কি আর মুখ থাকে?

কাল সারাদিন ঘুরেছি ভোট কেন্দ্রগুলোতে। আহা সকালের টগবগে উত্তেজনা! মানুষ আসছে ভোট দিতে। প্রথম লাইভে আবেগে গলা কাঁপিয়ে নানা কথা বলি হেসে হেসে। তারপর মাত্র দেড়-দুই ঘন্টা। চোখে দেখা যায় না, কলমে লেখা যায় না, এমন সব দৃশ্য। ভোট কেন্দ্রের বাইরে ঠিক সিনেমায় দেখা চেহারার গুণ্ডা-পাণ্ডাদের টহল। এজেন্ট ছাড়া ভোটকক্ষ। অসহায় স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স আর বিব্রত করুণ চোখে তাকানো কতগুলো সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার।

তাবিথ আউয়ালের সাথে ঘুরি কয়েকটা কেন্দ্রে। বেচারী তাবিথ। শিল্পপতি বাবার ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ফার্মের মুরগিটা। গণমাধ্যম কর্মীরা সাথে না থাকলে হয়তো সরকারের ক্যাডার বাহিনীর কাছে মারই খেতেন।

কী হতো যদি জিততেন বিএনপি প্রার্থীরা? নাও তো জিততে পারতেন। উত্তরে হেভিওয়েট আনিসুল হক। কতরকম ভোট তার। অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ভোট, ব্যবসায়ী কিন্তু সৎ ব্যক্তিত্বের ভোট, আহারে বেচারি কালো হয়ে গেছেন বলাদের ভোট, টেলিভিশনে উপস্থাপনার ভক্তদের ভোট, স্মার্টলি কথা বলেন সেই ভক্তদের ভোট, সরকার দলের সমর্থকদের ভোট, আমার মতো দ্বিধান্বিত এবং রাজনৈতিকভাবে অসচেতন চ্যাতব্যতহীনদের ভোট—সব ভোটই তো তিনি পেতেন বা পেতে পারতেন। না করলেই কি হতো না এতোটা?

হয়তো হতো না। হয়তো আছে অন্য হিসাব। কাল সারাদিন আমার সঙ্গে থাকা পিএম কাভার করা ক্যামেরা পার্সন সোহেল রানার কথাটা খুব দাগ কাটে মনে।

ও বলে, “ আপা, শেখ হাসিনা বাঙালীর মন পইড়া ফালাইছে। এই যে এত ছি: ছি: করতেছেন, এই মেয়ররাই যদি যানজট ফ্রি করে শহর, ময়লা-আবর্জনা সরায়, নাগরিক সুবিধা দ্যায়, মানুষ সব ভুলে যাবে।“

কথা কি সত্য? সব ভুলে যাবে? মানুষ কি আসলেই সব ভুলে যায়?

তবে এটা ঠিক। এসব জিইয়েও থাকবে না। টেলিভিশন আর রেডিওগুলো ইতিমধ্যেই গাকগাক করে বিজয়ীদের বিজয়গাথা প্রচার শুরু করে দিয়েছে। আমাদের ফেসবুকের বিবেকরাও চুপচাপ। এতো আর স্ট্যাটাসের বন্যা ছুটছে না।

আফটার অল আনিসুল হক ভালো, স্মার্ট মানুষ, সবার আনিস ভাই। সাঈদ খোকনও ভালোই তো মির্জা আব্বাসের তুলনায়। অতএব অনেকেই রিল্যাক্সড হয়ে টেস্ট সিরিজ দেখছে-টেখছে। দুএকটা পত্রিকায় গণতন্ত্র হারলো বলে টলে হেডলাইন ছাপা হলো। হলো, তো কি হয়েছে! দুইচারদিন। তারপর? সাধারণ মানুষেরই এতো কি ঠেকা এইসব নিয়ে পড়ে থাকার। পেটের ভাত তো যোগাড় করতে হবে।

আমিও ঐ সাধারণ মানুষদেরই দলে। কিন্তু মনের মধ্যে একটা খচখচ। ভোট তো এদেশের অধিকারহীন মানুষদের কাছে একটা উৎসব ছিল। সাত-সকালে রান্না সেরে, সবচেয়ে ভাল পোশাকটা পরে ঘরের বউ-ঝিরা ভোট দিতে যেতেন। ছেলেরা-ছেলেরা, মেয়েরা-মেয়েরা রিকশায় চেপে ভোটকেন্দ্রগুলো ঘোরাঘুরি, সেই উৎসবটা কি আর কোনদিন ফিরে আসবে না? উৎসব হারানোর ক্ষতির মতো আরও বড়, আরও গভীর ক্ষত আর ক্ষতি অপেক্ষা করে আছে। প্রিয় জননেত্রী, আপনি এত বোঝেন, এটা কি বুঝতে পেরেছেন?

লেখক ও সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.