সুপ্রীতি ধর:
“এই জয়টা আর পাঁচটা জয়ের মত সাধারণ নয়। কারণ এই জয়ের পথে মেয়েগুলোকে শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে লড়তে হয়নি। লড়তে হয়েছে বাড়ির বিরুদ্ধে, সমাজের বিরুদ্ধে, সিনিয়র পুরুষ ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে, লড়তে হয়েছে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে। আজও খবরে পড়লাম মেয়ে হওয়ার কারণে ঠাকুমা বিষ দিয়েছে সদ্যোজাতের মুখে। সেই দেশের মাটিতে এই ১১টা মেয়ে একটা বিশ্বসেরা হওয়ার পথে কত পাহাড় যে ডিঙিয়ে এসেছে তা কাউকে বলে দিতে হয় না। আমাদের দেশের যে মেয়েরা রোজ পথেঘাটে রুজির জন্য বেরোয়, তাদের বলে দিতে হবে না কেন এই জয়টা ভীষণ ভীষণ স্পেশ্যাল। এই জয় শুধু এই দেশের নয়, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা সহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ার মেয়েদের জয়। আজকের রাত যুদ্ধজয়ের রাত।
মনে আছে শাহিদ আফ্রিদির কথা, যিনি মনে করেন মেয়েদের জায়গা রান্নাঘরে? মনে আছে সৌরভ গাঙ্গুলির কথা, যিনি টিভি শোতে বসে বলতে দ্বিধা করেননি ক্রিকেটটা মেয়েদের খেলা নয়। এই দুজন ক্রিকেট লিজেন্ড, কিন্তু এরা ৫০ ওভারের সীমিত ওভারের বিশ্বকাপ ছুঁতে পারেননি। আমাদের মেয়েরা পেরেছে। আর ঘড়ির কাঁটা মেনে রাত ১২ টার পরেই পেরেছে।
হরমনপ্রীত এবং টিম তোমাদের নাম ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে গেল।”
ফেসবুকে অনির্বাণ মাইতীর এই মন্তব্যটুকু পড়ে আর একইসাথে আরও অনেকের লেখা পড়ে কাল রাত থেকে চোখের জল আটকাতে পারছি না। সেই একই অনুভূতি। এই জল আমার শুধুই কান্না নয়, এই জল মেয়েদের হিমালয়সম পর্বত ডিঙিয়ে আসতে গিয়ে শত শত প্রতিবন্ধকতা পেরুনোর কষ্টের জল, এই জল জীবনভর কথার আঘাতে, সমাজের কলুষতার আঘাতে, বৈষম্যের আঘাতে, বর্ণবাদের আঘাতে জর্জরিত, ক্ষতবিক্ষত হওয়ার জল। যারা আমরা এই দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছি জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে, আমরা জানি এই জল কেন আসে চোখে, কেন আমরা আনন্দে এমনভাবেই কান্নায় ভেঙে পড়ি।
আমি নিশ্চিত কালকের এই জয়ের পর এই মেয়েদের মনে কী স্রোত বয়ে গেছে, কতকিছু মনে পড়ে গেছে তাদের! আহা, আমাদের সোনা মেয়েরা, জন্মের পর তোমাদের কপালে ঠিকমতোন খাবারও জোটেনি, এটা আমি নিশ্চিত, জুটলেও তা তোমার ভাইদের সমান পাওনি, কতভাবেই না তোমাদের শোষণ করা হয়েছে শুধুমাত্র সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার মূলা ঝুলিয়ে!
জেমিমা সেদিন ফাইনালে উঠার পর যখন বললো সে দেশের কথা ভেবেছে, আমার সেদিনও কান্না পেয়েছিল। আজকাল আরও বেশি করে কান্না পায় দেশের কথা মনে হলেই। দেশ তো কেবল একটা ভূখণ্ডই নয়, দেশ মানে মা, দেশ মানে আপনার চেয়েও আপন কিছু। এটা আমরা যারা সেই সাতচল্লিশ থেকে শেকড়চ্যুত হওয়া, আপনজন বিচ্ছিন্ন হওয়ার ট্রমা নিয়ে বড় হয়েছি, বড় হতে হতে আরও একধাপ প্রিয়জন হারিয়েছি শুধুমাত্র একটা স্বাধীন ভূখণ্ড পাবো বলে, আবার সেই স্বাধীন দেশ থেকেও বিচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছি, তখন আমার চোখের এই জল তার সীমা ছাড়িয়ে যায় আরও বেশি করে।
ধান ভাণতে শিবের গীত গাইবো না। আজ কষ্টের কথা নয় আর, আজ কেবলই জয়ের আনন্দ ভাগ করে নেবো। স্যালুট তোমাদের আরও এই কারণে যে তোমাদের দেখে আরও কোটি কোটি মেয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করবে। এটাই সবচেয়ে বড় এচিভমেন্ট।
অভিবাদন তোমাদের!
লেখক: সম্পাদক, উইমেন চ্যাপ্টার