হেলে পড়া সূর্য

ফারজানা নীলা:

প্রতিদিনকার মত আজও আমি দুপুরের খাবার নিয়ে বসেছি একা। সামনে একটি বক্সে অনেকগুলো মানুষ কিন্তু আছে। সেজেগুজে অনেক কথাই বলছে তারা।
আমিও প্রতিদিন তাদের দেখি। তাদের হাসিতে হাসি, তাদের দুঃখে দুঃখী হই। কিন্তু আমার সাথে তাদের কোন যোগাযোগ আছে কি? নেই, তারাই আমার সময় কাটানোর মাধ্যম। শুধু এইটুকুই সম্পর্ক।

ভাত নিয়ে নাড়াচাড়া করি। খেতে ইচ্ছে করে না। পাতে অনেক খাবার আছে যা আমি প্রতিদিন রান্না করি। কিন্তু প্রতিবেলা একাই খাই। এই একা খেতে খেতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার কথা। হয়েছিও। কিন্তু ইদানিং আর ভালো লাগে না একা খেতে।

কেন লাগে না? একা খেলেও আমার পেট ভরবে, সাথে কেউ থাকলেও পেট ভরবে। পেট ভরে যায়, কিন্তু তৃপ্তি আসে না। সাথে কেউ থাকলে কি তৃপ্তি আসতো? কেউ যদি এক খণ্ড মাছ পাতে তুলে দিতো, তৃপ্তি আসতো? কেউ যদি শাকের সাথে একটি কাঁচা মরিচ তুলে দিতো, তৃপ্তি আসতো? পানির গ্লাসটি কেউ এগিয়ে দিলে তৃপ্তি আসতো?

খাবার কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে ফেলে দিলাম। আজ একেবারেই খেতে ইচ্ছে করছে না। স্টার জলসাও আজ টানছে না। সোফা ছেড়ে বিছানায় গেলাম। যদি ঘুম আসে এই আশায়। গড়ালাম কিছুক্ষণ, বড্ড অবসন্ন লাগছে।

চোখ দুটো এমন হয়ে আছে যেন শতাব্দী ধরে এখানে কোন ঘুম নেই। অবশ্য চোখকে দোষ দিয়ে কী হবে! বয়সের কাছে শরীরের এক একটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ হার মানে ধীরে ধীরে। প্রথমে হার মেনেছে ডায়াবেটিসের কাছে, প্রতিবেলা নিয়ম করে ওষুধ খেতে হয়। এরপর বাম হাতের ব্যথা। মাঝে মাঝে একেবারেই চলে যায়। আবার যখন শুরু হয় অসহ্য ব্যথা হয়। কোন ওষুধই ঠিক করতে পারেনি। এরপর রাতের ঘুম দিনের ঘুম সবই গেলো। ঘুমের ওষুধও মাঝে মাঝে কাজ করে না।

উঠে গিয়ে সব রুমের আবার কিছুটা ঝাড়পোছ করলাম। সকালে একবার করি। এখন আবার করলাম। ক্লান্ত লাগছে। বড় ছেলের রুমে বিছানায় বসে পড়লাম। ওর পড়ার টেবিলে হঠাৎ ওর ছবিটি দেখে ভালো লাগলো। ওর ছোটবেলার ছবি। সবেমাত্র নিজ হাতে ভাত খেতে শিখেছে। মুখের আশেপাশে মাখানো ভাত লেগে আছে, আর ওর ঠোঁটে উচ্ছল হাসি। ওর বাবাই তুলেছিল ছবিটি।

হাসানকে প্রতিদিন একবার হলেও ফোন দেই। আজ এখনও দেওয়া হলো না। আমি না দিলে অবশ্য হাসানও দেয় না। ছেলে হয়তো অফিসে ব্যস্ত থাকে, মা তো বাসায় থাকে। অখণ্ড অবসর। মা’ই ফোন দিবে। তার দেওয়ার সময় কই! মাঝে মাঝে বিরক্তও হয়। একবারের বেশি দুইবার ফোন করলে হাসান রেগে যায়। আমিও ভাবি, থাক, ব্যস্ততার মধ্যে ফোন দিয়ে বিরক্ত করা ঠিক না। কিন্তু পারি না। একা থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠি।

ছেলেমেয়ের কণ্ঠস্বর শুনতে ইচ্ছে করে। কথা বলার মানুষের অভাব বোধ করতে থাকি। কেউ আমাকেও কিছু জিজ্ঞেস করুক, এই আকুতি অস্থির করে তুলে। খুব বেশি সময় ধরে যে কথা বলি তাও না। বড়জোর এক মিনিট কী দুই মিনিট। ওই এইটুকু সময় আমাকে দিতে খুব কি অসুবিধা হয়?

“হ্যালো, কিরে, খেয়েছিস?”
“হ্যাঁ মা খেয়েছি। কী রান্না করছো আজকে?”
“শোল মাছ, আর মিষ্টি কুমড়ো”
“ ও”
“ ফিরতে কি দেরি হবে? মিটিং আছে?”
“ কী জানি, আচ্ছা রাখি এখন”
“আচ্ছা শোন……

কেটে গেলো। এমনই হয় সবসময়। হুট করেই কেটে দেয়। এ পাশ থেকে মা রাখতে চায় কিনা, মায়ের আর কোন কথা আছে কিনা জানতে চায় না। কিন্তু আমিও কি কিছু বলতে চাই? প্রতিদিনই তো একই কথা হয়। খেয়েছে কিনা, কী রান্না করেছি এসব। তবে কেটে দিলে আমার খারাপ লাগে কেন? নাকি হাসান যদি জিজ্ঞেস করতো আমি খেয়েছি কিনা, ভালো লাগতো আমার? যদি জিজ্ঞেস করতো “ মা সারাদিন তোমার খুব একা লাগে, তাই না? ভালো লাগতো আমার? কেন মনে হয় কী যেন বলার ছিল, কিন্তু কী বলার ছিল বুঝতে পারি না। একটা দীর্ঘশ্বাস কোথাও চাপা থাকে। একটি অব্যক্ত সুক্ষ্ম যন্ত্রণা ভেতরে ঘুরপাক খায়।

ঘড়িতে মাত্র চারটে বাজে। আজই কি সময়কে এতো মন্থর মনে হচ্ছে নাকি সময় এমন ধীরেই চলে? এ ঘর থেকে ও ঘরে হেঁটে হেঁটে মাত্র ১০ মিনিট গেলো। হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠলো। সাধারণত আমার মোবাইলটি খুব কম বাজে। আগ্রহ নিয়ে তাকালাম। মেয়ে তনিমা ফোন করেছে। মেয়ের নাম দেখে খুশি হলাম। কিন্তু এই নামটিও সচারাচর দেখি না মোবাইল স্ক্রিনে। বড় বাড়ির বড় বউ সে। সময়ের বড্ড অভাব তার মাকে ফোন দেওয়ার। কিন্তু যখনই দেয় বা যতক্ষণ কথা বলে সেই সময়টুকু আমার ভালো কাটে।

“হ্যালো, তনু , ভালো আছিস, মা?
“ আছি কোনরকম, মাত্র খাওয়া-দাওয়া শেষ করলাম’
“এতো দেরি হলো আজ?”“

আর কী, এদের আত্মীয় স্বজনের অভাব আছে নাকি, আজ এক পাল আসে তো অন্যদিন আরেক পাল আসে, সবকিছুর তদারকি তো আমাকেই করতে হয়”
“তোর শ্বশুর-শাশুড়ি ভালো আছে? জামাই কেমন আছে? রাফি কই, স্কুলে?”

“আছে সবাই ভালো। তোমার জামাই তো আসবে সেই রাতে। বাবা কেমন আছে? ফোন দিলাম, ধরলো না, ব্যস্ত মনে হয়”।

“সে কি কাজ ছাড়া কিছু বুঝে”?
“আচ্ছা মা রাখি, রাফিকে স্কুল থেকে আনতে হবে। পরে ফোন দিবো। রাখলাম।‘

এই পরে ফোন দেওয়া হয়তো আরও তিন চার দিন পর হয়।

বারান্দায় গিয়ে বসলাম। কিছুটা মেঘলা আকাশ। পাশাপাশি অনেকগুলো বিল্ডিং। সামনে একটি প্রশস্ত রাস্তা। প্রায় সব বিকেল আমার এই রাস্তায় গাড়ি আর মানুষের চলাফেরা দেখেই কাটে। একেক মানুষের একেক রূপ্‌ একেক রকম তাদের হাঁটার ভঙ্গি। একেক রকম তাদের কথা বলার ভঙ্গিমা, তাকানোর ভঙ্গিমা। একেকটি মানুষের জীবন একেক রকম। তবে সেই একেক রকম তা কী রকম ? শুধু এই রাস্তার মানুষজন নয়, আমার পাশের বাসার রাহেলা ভাবী, নিচের রাজুর মা, পাশের বিল্ডিঙের মরিয়ম ভাবী, তার নিচতলার রুমকির মা এদের সবার জীবন ভিন্ন, কিন্তু কেমন ভিন্ন? প্রতিজনের আলাদা সংসার, আলাদা জীবন ,আলাদা সময়। কারো সাথে কোথাও কোন মিল নেই। কিন্তু আসলেই কি মিল নেই?

সবারই সেই নিয়মমাফিক জীবন? সবারই কি সেই চার দেওয়ালে বন্দী জীবন নয়? সবারই একটি সংসার আছে, সন্তান আছে। সবারই জীবন আবর্তিত হয় স্বামী সংসার আর সন্তান নিয়ে? স্বামী কাজে যায়, সন্তানও কাজে যায় বা স্কুলে যায় এরপর এদের জন্য সারাদিনের আয়োজন। কোথাও কি নিজের জন্য কোন আয়োজন আছে?

আর নিজের জন্য আলাদা কিছু থাকার কি কোন দরকার আছে? স্বামী-সংসার-সন্তান এসবই তো মুখ্য।

আমিও জানি এসবই মুখ্য। অথবা এসব ছাড়া আমার জীবনে আর কিছু নেই। আমি বড় হয়েছি এই ভাবনাকে প্রাধান্য দিয়েই। খুব বেশি পড়াশুনা ছিল না আমার। গ্রামের একজন সাধারণ মেয়ের এর চেয়ে বেশি চিন্তা থাকে না। এর চেয়ে বেশি চিন্তা কাকে বলে আমি জানিও না। ম্যাট্রিক এর পর বিয়ে, বিয়ের পর শহরে বসবাস , তিনটি সন্তান, তাদের মানুষ করা, স্বামীর সেবা করা। এইতো জীবন। এভাবেই ভেবেছিলাম। এভাবেই হয়ে আসছে। ঠিক এইভাবেই ওই আশাপাশের বাসার নারীদের জীবনও কেটে যাচ্ছে। কিন্তু তারাও কি এমন অলস হয়ে ক্লান্ত হয়ে অবসন্ন হয়ে বারান্দায় বসে জীবন নিয়ে ভাবে?

অথবা জীবন নিয়ে ভাবার কি কিছু আছে? আমি এই তো চেয়েছিলাম। তবে আজ এমন মনমরা উদাসীন ক্লান্ত কেন আমি? কেন ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস বের হয়? স্বামী কাজে যাবে, সন্তানরা বড় হয়ে যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বে, এটাই তো স্বাভাবিক। এখানে একাকীত্বের কী আছে?

না কিছু নেই। এ আমার মনের ভুল। এমন চিন্তা কেউ করে না। আমি উঠে গিয়ে চা বানিয়ে আবার টিভির সামনে বসি। সিরিয়াল চলছে। দুটি বোনের জীবন নিয়ে কাহিনী। হঠাৎ আমার বোনটির কথা মনে পড়ে গেলো। দু বছর হয়ে গেলো তাঁকে আমি দেখি না। যাবো যাবো করে যাওয়া হয় না। সেও আসতে পারে না। আমি গেলে হাসান আর ওর বাবার খাওয়ার খুব সমস্যা হয়ে যায়। এদের ফেলে যাওয়া তো সম্ভব না।

একজনও যদি কয়েকদিনের জন্য অফিস থেকে ছুটি নিতো তবে একটু বোনকে দেখে আসতে পারতাম। কিন্তু আমার বোনের সাথে দেখা করা এতোই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না এরা যে অফিস থেকে ছুটি নিতে হবে! নাই বা হলো দেখা, আমার না হয় সামান্য মন খারাপ হবে মাঝে মাঝে। এটা তেমন আমলে আনার মতো ঘটনা না।
আমার হঠাৎ বুকের ভেতর কাঁপুনি দিয়ে যায়। প্রচণ্ড ইচ্ছে করে বোনটিকে দেখতে। কিছুটা ভয়ে ভয়ে হাসানকে আবার ফোন দেই। বলে দেখি যদি ছুটি নিতে পারে।

“কী হলো, আবার ফোন করেছো কেন মা?”
“শোন না, এই বছর তো এখনও কোন ছুটি নিস নাই, দুদিনের জন্য ছুটি নিতে পারবি? তোর খালার কাছে যেতে খুব ইচ্ছে করছে। অনেক দিন দেখি নারে, চল না ঘুরে আসি”।

“ধুর, কী বলো এগুলা, আমার খালার বাসায় যেতে ইচ্ছে করে না। পারবো না আমি। আর অফিস থেকে এখন ছুটি নেওয়া যাবে না। রাখি তো মা”।

ফোন রেখে আমি যে খুব হতাশ হলাম তাও নয়। এর আগে অনেকবার বলেছি হাসানকে, ওর বাবাকে। কেউই যেতে চায় না। একা আমার পক্ষে যাওয়াও সম্ভব না। আমার বুকের ভেতর কোথাও একটু ব্যথা করে উঠে। চোখ দুটো জ্বলতে থাকে। বোনকে দেখার ইচ্ছে আমার সামলে নিতে একটু কষ্ট হয়।

সন্ধ্যায় আমি সারা ঘরময় হাঁটি। ডায়াবেটিসের জন্য হাঁটতে হয়। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আজ একটু বেশি ক্লান্ত লাগছে মনে হয় নিজেকে। ক্লান্ত হয়ে গেছি এই ঘরময় হাঁটতে হাঁটতে। ক্লান্ত হয়ে গেছি সারাজীবন রান্না করতে করতে। ক্লান্ত হয়ে গেছি সারাজীবন সেবা করতে করতে। ক্লান্ত হয়ে গেছি দায়িত্ব পালন করতে করতে।
আমি কোথাও কখনো কোন দায়িত্ব পালন করতে অবহেলা করিনি। স্বামীর প্রতিটি ইচ্ছে পালন করেছি, তাঁর সকল সুবিধা-অসুবিধার কথা সারাক্ষণ ভেবেছি, ছেলেমেয়েদের কোন চাহিদা অপূর্ণ রাখিনি। দায়িত্ব সব একে একে পালন করা শেষ। কিছুটা ক্লান্তি তো আসতেই পারে। একটু জিরিয়ে নেই। সোফায় হেলে পড়লাম। চোখ বন্ধ করতেই হঠাৎ একটি কুৎসিত চিন্তা আমাকে আঁকড়ে ধরলো।

আমার সব কাজ, সব দায়িত্ব আমার পরিবর্তে একজন দাসিও তো করতে পারতো! কাউকে যদি মাইনে দিয়ে রাখা হতো আমার স্বামী সন্তানদের দেখাশোনা করার জন্য, তবে সেও তো সফল হতো! যেমন প্রতিদিন সকালে আমার বুয়াটি আসে ঘরের কাজ করতে! তাকেও নিশ্চয় তার ইচ্ছে-অনিচ্ছা অনুসারে ছুটি দেওয়া হতো না! মনিব যখন চাইবে তখনই সে ছুটি পেত! তার বোনের সাথে দেখা করে আসতে পারতো ! তার সাথে আমার পার্থক্য কী!

আমি আতঙ্কে কেঁপে উঠে চোখ মেলে তাকাই। আমার সামনে আমার ঘরের চিরেচনা প্রতিটি আসবাব প্রতিটি দেয়াল ঠিক ঠিক জায়গায় অবস্থান করছে। আমার গলা শুকিয়ে যায়। নিজেই বিশ্বাস করতে পারছি না, এ আমি কী ভাবলাম। আমার এতো বছরের সাজানো সংসারের প্রতি আবেগ ভালোবাসা, আমি একজন বুয়ার কাজের সাথে তুলনা করলাম! আমি হাঁপাতে থাকি!

কলিংবেলের আওয়াজে আমি সংবিৎ ফিরে পাই। হাসানের বাবা এসেছে। আমি স্বাভাবিক হয়ে যাই। ভুলেই যাই কিছুক্ষণ আগে আমি একটি নিকৃষ্ট চিন্তা করেছিলাম।

তাঁকে নাস্তা দেওয়ার জন্য আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ি। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে উনি আবার খুব কড়া। একটু যদি স্বাদে নড়চড় হয় তবে ভীষণ রেগে যান। বিয়ের অনেক বছর পর্যন্ত এই স্বাদ নিয়ে অনেক কথা শুনতে হয়েছে । আজও মাঝে মাঝে ভুল হয়ে যায়। আর তখনই দু কথা না শুনিয়ে থাকতে পারেন না।

“সারাদিন বাসায় কী করো, রান্নাটাও ভালো মতো করতে পারো না, জানো শুধু হাঁড়ি ঠেলতে”।

ঝাল বড়া বানিয়ে হাসানের বাবাকে দিলাম। উনি বসে আছেন হাতে রিমোট নিয়ে। এই প্রতিদিনের অভ্যাস। সকালে অফিসে যান, সন্ধ্যায় এসে হাতে রিমোট। শুক্রবার যেদিন বাসায় থাকেন সেদিন সকালে বাজারে যাবেন, এসেই আবার রিমোট। উনি হয়তো ক্লান্ত হন না এই বছরের পর বছর এভাবেই কাটিয়ে দিতে। অথবা ভেতরে ভেতরে হয়তো ক্লান্ত। আমি বুঝতে পারি না।
এই যে এতো বছর একসাথে আছি আমরা, সত্যি কি একে অপরকে চিনি আমরা? আমি জানি হাসানের বাবা আসলে কে? কেমন মানুষ তিনি? কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে তাঁর সম্পর্কে, কী বলতে পারবো আমি?
“উনি আমার স্বামী , আমার সন্তানদের বাবা, একটু রাগি” এছাড়া আর কিছু কি আমি জানি তাঁর সম্পর্কে? অথবা উনিও কি জানেন আমার সম্পর্কে?
“আমি তাঁর স্ত্রী, তাঁর সন্তানদের মা, এবং মোটেও রাগি না” এছাড়া আর কী জানেন আমার সম্পর্কে উনি?

জানেন কি আমার এখন তীব্র একাকিত্ব অনুভব হয়, প্রচণ্ড ইচ্ছে করে খাওয়ার সময় কেউ আমার পাশে থাকুক, কেউ দিনে অন্তত একবার আমার খোঁজ নিক, খুব ইচ্ছে করে ঢাকায় গিয়ে বোনকে একটু দেখে আসি। উনি এসবের কিছুই জানেন না। কখনো জানতে চাননি।

যেমনভাবে আমিও কখনও জানতে চাইনি উনার সম্পর্কে। স্বামীর সম্পর্কে জানতে হয় আলাদা করে এ আমি কখনও ভাবিনি। স্ত্রীর সম্পর্কেও কখনও আলাদা করে ভাবতে হয় তা উনিও নিশ্চয়ই ভাবেননি।

স্ত্রী সংসার সামলানোর জন্য, সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য। স্বামী সংসারের ভার নেওয়ার জন্য, সন্তান পালনের জন্য। এর বাইরে কিছু জানার নেই।

ঝাল বড়া সবগুলোই খেয়ে ফেললেন, মানে স্বাদ ঠিকমতো হয়েছে। যদিও স্বাদ ঠিক হলে খুব একটা প্রশংসাও করেন না। হঠাৎ মনে পড়লো কয়েকদিন ধরে আমার সরপুঁটি মাছ খেতে ইচ্ছে করছিলো। তাঁকে আনতে বলেছিলাম বেশ কয়েকদিন। আনেননি। হয়তো ভুলে গেছেন।

রাতে হাসান ফিরেই তাঁর ল্যাপটপ নিয়ে রুম বন্ধ করে বসে থাকে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ছেলের সাথে একটু গল্প করি। টিভিতে যেমন দেখায় মা-ছেলে গল্প করছে, ঠিক তেমন। মাঝে মাঝে কিছুটা ভয় নিয়ে হলেও দরজায় কড়া নাড়ি। যদি খুলে দেয় এই আশায়। কিন্তু অপর পাশ থেকে আওয়াজ ভেসে আসে, “ মা, বিরক্ত করো কেন?”
আমি বুঝতে পারি মা ছেলের গল্প শুধু টিভিতেই সম্ভব।

আমি মাথা নিচু করে দরজার পাশ থেকে সরে যাই। বাসায় দুটি প্রাণী আছে, তারপরও নিজেকে একা লাগে, অসহায় লাগে, অবহেলিত লাগে, মাঝে মাঝে অপমানিতও লাগে। আমার চারপাশে একটি সুগভীর হাহাকার ঘুরতে থাকে। যাকে আমি দূরে ঠেলে রাখতে চাই, কিন্তু চুম্বকের মতো এ আমাকে আকর্ষণ করে যাচ্ছে।

আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই বলে আমি আবার ড্রয়িংরুমে হাসানের বাবার পাশে এসে বসি। উনি রিমোট টিপেন আর মাঝে মাঝে টিভিতে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে কথা বলেন। আমিও সায় দেই। মাঝে মাঝে গ্রামের বাড়ির কোন ঝামেলা নিয়ে কথা বলেন। আমি শুনি, তাঁর কথায় সায় দেই। নিজ থেকে বলার মতো কিছু থাকে না। কারণ নিজ থেকে বললে কখনও তিনি কিছু শোনেন না।

রাতে খাওয়ার সময় হলে আমি হাসানকে ডাকতে যাই। ফোনে কারও সাথে কথা বলছে শুনতে পেলাম।
“শনিবার আর রবিবার ছুটি নিবো দোস্ত। তাহলে শুক্রবারসহ তিনদিন ছুটি পাওয়া যাবে। তিনদিনের কক্সবাজার ট্যুর। হেব্বি মজা হবে”।

আমি শক্ত হয়ে যাই। কে যেন ঠাস করে গালে চড় লাগিয়ে দিলো। মনে পড়লো বিকেলের হাসানের কথা,
“পারবো না আমি। আর অফিস থেকে এখন ছুটি নেওয়া যাবে না”।

আমি কোনোমতে দরজায় নক করেই রান্না ঘরে চলে এলাম। চোখ দিয়ে পানি গড়াচ্ছে। নিজের কাছেই লজ্জা পেলাম। এখানে কষ্ট পাওয়ার কী আছে! ছেলে তাঁর বন্ধুদের সাথেই তো বেড়াতে যেতে চাইবে, শুধু শুধু খালার বাসায় গিয়ে কী করবে! কিন্তু
নিজেকে বোঝাতে আমার কষ্ট হচ্ছে। প্লেটে খাবার বাড়তে হাত কাঁপছে। চোখ বার বার ঝাপসা হয়ে আসছে। বোনটির চেহারা বার বার ভেসে উঠছে।

মাছের তরকারি বাড়তে গিয়ে মনে পড়লো, হাসান শোল মাছের মাথা খেতে ভালোবাসে। আমারও ভালো লাগে। খেতামও আগে। এখন ওর জন্য সব সময় আলাদা করে তুলে রাখি। হাসানের প্লেটে খাবার সাজিয়ে ওকে রুমে দিয়ে আসি। ও ল্যাপটপে চোখ রেখেই ভাত খায়। ডাইনিং টেবিলে তার আসা হয় না। হাসানের বাবাও টিভির সামনে বসেই খান। আমি একা রাতেও ডাইনিং টেবিলে বসে খাই।

প্রতিদিনের মতো সকালে আমিই সবার আগে উঠে সবার জন্য নাস্তা রেডি করি। যে যার যার মতো খেয়ে বের হয়ে যায়। আমি আবার সেই পুরনো নিয়মমাফিক কাজে লিপ্ত হই। ঘর গোছাই, রান্না করি, স্টার জলসা দেখি, বারান্দায় গিয়ে বসি, হাসানকে ফোন দেই, সন্ধ্যায় তাদের ফেরার অপেক্ষা করি।

রাতে যখন হাসানের বাবার পাশে বসে টিভি দেখছিলাম তখন কানাডা থেকে ছোট ছেলে শামিম ফোন করে। তিন বছর সে কানাডায়, মাঝে মাঝে তাঁকে দেখার জন্য বড্ড ব্যাকুল হয়ে উঠি। কথা শেষে জানতে পারলাম সে দেশে আসছে আগামী মাসে।

খুশিতে আমি চঞ্চল হয়ে উঠি। আমার শামিমকে আমি দেখবো তিন বছর পর।

আমি হাসতে থাকি, হড়বড় করে কথা বলতে থাকি হাসানের বাবার সাথে। ঠিক করতে থাকি শামিম এলে কী কী করবো, কী কী রান্না করবো, ওর রুমের কিছু পালটাতে হবে কিনা, ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি ভুলেই যাই আমার ইদানিং মন খারাপ থাকতো, ভুলে যাই ইদানিং আমার ভীষণ প্রচণ্ড একা লাগতো, তীব্র ইচ্ছে জাগতো বোনকে দেখার, ভুলে যাই ইদানিং প্রায় আমি সন্ধ্যাবেলায় ডুবন্ত সূর্যের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম,
“সূর্যটি হেলে পড়ছে, আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে, আজকের মতো সে তার দায়িত্ব পালন করেছে, এখন সে ছুটিতে যেতে পারে”

ফারজানা নীলা

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.