কৈশোরেই ‘শরীর’ সম্পর্কে শিক্ষা লাভ জরুরি

0

সাজু বিশ্বাস:

এখন আপনারা সবাই মিলে শলা পরামর্শ করবেন, সবাই মিলে উপায়-তালুক বাতলাবেন, কী করে শিশুকে যৌন নির্যাতন থেকে বাঁচানো যায়! নিজের শিশুকে পড়শির বাড়ি পাঠায়েন না, কাজের লোকের সাথে দোকানে নয়, ড্রাইভারের সাথে স্কুলে নয়, একলা একলা নানা খালু ফুফার বাড়ি কোথাও বেড়াতে নয়।

এই সুদীর্ঘ তালিকায় আরো সব নিয়ম কানুন আছে। অতি উত্তম! কিন্তু স্কুল?? প্রতিদিনই স্কুল শিক্ষক দ্বারা ছেলে বা মেয়ে শিশুর যৌন হয়রানির কোনও না কোনও খবর থাকছে আজকাল। খেলতে গিয়ে ছোট্ট বাচ্চা আর ঘরে ফিরে আসছে না। তাকে মৃত অবস্থায় ছাদে কিংবা অন্য কোথাও পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি বাড়িতে নিজের বৃদ্ধ নানার দ্বারা শিশু মলেস্ট হবার ঘটনাও আছে এই সাম্প্রতিক সময়ে।
শ্বশুর দ্বারা ছেলের বউ…..। মেয়ে এবং শিশুরা কোথায় যাবে তাহলে! নিজের ঘর, স্কুল এমনকি প্রার্থনালয়ও মেয়ে এবং শিশুদের জন্য এখন নিরাপদ নয়।

আমাদের দেশে এক অদ্ভুত লজ্জা আর পবিত্রতার কালচার আছে। আমরা ছোটবেলায় দুই ধরনের শিক্ষা নিয়ে বড় হই।
এক. যৌনতা অত্যন্ত গোপনীয় বিষয় এবং
দুই. লুকিয়ে চুরিয়ে রসময়গুপ্ত পড়া যেতে পারে, এবং সুযোগ পেলে তার সদ্ব্যবহার করা যেতে পারে।
আমরা সহজ একটা শারীরিক বিষয় সম্পর্কিত সাধারণ জ্ঞান লাভ করি চোরা পথে। ছেলেমেয়েদের বড় হবার সময়ে এমন কোনও পাঠ্যপুস্তক নেই যাতে তাদের শারীরিক পরিবর্তন ও মানসিক পরিবর্তন নিয়ে কথা বলে। পরিবারের মধ্যে সুযোগ নেই শিশু থেকে বড় হবার সময়ে একটা মানুষের শারীরিক এবং মানসিক পরিবর্তন নিয়ে আলাপ আলোচনা করার।

লেখক: সাজু বিশ্বাস

আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা তাই প্রথমেই বন্ধু-বান্ধব, চটি বই আর চটি ফিল্ম দেখে নিজের শরীরের পরিবর্তন উপলব্ধি করে। স্বভাবতই এর ফল ভালো হয় না। যৌনতা নিয়ে আমাদের মনোজগৎ কালোয় কালোয় ভরে থাকে। যে শরীর এবং মনকে আমরা একরকম চোরাই পথে রেখে দিতে চাই, — সেই শরীর এবং মন কেমন করে তার স্বাভাবিক বৃত্তি প্রকাশ করবে! একটি মেয়ের শরীর কেবলমাত্র একটি স্বাভাবিক শরীর হিসেবে মাথায় না ঢুকে আমদের মাথায় ঢুকে যায়, মেয়েটির বুক- মুখ- নিতম্ব এইসব।
এর উপরে নতুন যন্ত্রণা ছেলেশিশু বলাৎকার।

আর পবিত্রতা কথাটি সমাজ এবং ধর্ম মিলেমিশে শুধু মাত্র মেয়েদের জন্যই বেঁধে দেয়। একটি মেয়ে যদি কারো সাথে বিবাহ-পূর্ব শারীরিক সম্পর্ক করে তাহলে সে নিশ্চিত অপবিত্র হয়ে যায়। এমনকি মেয়েটি যদি কারো দ্বারা বলাৎকার বা যৌন হয়রানিরও শিকার হয়, তখনো সে একইভাবে অপবিত্র হয়ে যায়।

এই যে অপবিত্র-পবিত্রতার ধারণা, এটি মেয়ে শরীরের এবং মনের উপর বিরাট ট্যাবু হয়ে বসে যায়। সমাজ ক্রমাগত চোখ রাঙায়, মেয়েকে পবিত্র হতে হবে, মেয়ে মাত্রই পবিত্র হবে, এই ধারণা মেয়ে শরীর ও মনের উপর গিলোটিনের মত চেপে বসে। এধার-ওধার হলেই তোমার মুণ্ডু খসে পড়বে। মেয়েগুলি তখন ভয়ে নিকট আত্মীয়, শিক্ষক বা প্রতিবেশীর দ্বারা ছোট খাটো বা মাঝারি ধরনের যৌন নির্যাতনের কথাও ভয়ে ভয়ে চেপে যায়।

সত্যিকারের যখন বড় বিপদ হয়, বিরাট শারীরিক বা মানসিক ক্ষত এমনকি মৃত্যু, এই পর্যায়ে ছাড়া কেউ আর পবিত্রতা হারানোর ভয়ে যৌন হয়রানির কথা স্বীকার করে না। এই সাথে যুক্ত আছে মেয়েটির পারিবারিক ‘সম্মান’। যে কোনও বয়সের মেয়েই হোক, তার সম্মান মোটামুটিভাবে তার পারিবারিক সম্পত্তি।

এমন উদাহরণেরও এখন অভাব নেই, যে, মেয়েটি হয়তো বাড়ি এসে মায়ের কাছে বলেছে তার শিক্ষক বা যে কেউ তাকে শারীরিকভাবে নিগৃহীত করেছে, তারপরেও সব জানাজানি হলে মেয়ের পবিত্রতার উপর প্রশ্ন আসতে পারে, সেই ভয়ে মা পরিবারের বাকি সদস্যদের কাছে মেয়েটির সেই যন্ত্রণার কথাটি বলে তার প্রতিকার বা প্রতিরোধের ব্যবস্থা করেননি।

আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা ডাক্তারি শেখে কেমন করে? নিশ্চয়ই এক টেবিলের এক পাশে পর্দা দিয়ে ছেলেমেয়ে আলাদা করে মৃতদেহ টুকরো করে দুই পাশে রেখে প্রফেসারেরা ক্লাস নেয় না? ছেলে ডাক্তার শরীরের যা কিছু শেখে, মেয়ে ডাক্তারও তাই-ই শিখে।

একদম প্রাইমারি লেবেলে, যেখান থেকে ছেলেমেয়েরা স্কুল থেকে ঝরে পড়ে– সেই আগের স্টেজে শরীর এবং মনের বৃদ্ধির কথা নিয়ে সহজ সরল করে কি একটা সাধারণ শিক্ষা হতে পারে না?

বিশেষত, মেয়ে শরীর নিয়ে যে সব ট্যাবু আছে, সেইগুলো এবং বিকৃত পথে যৌন শিক্ষা পাওয়ার পর মানুষের মনে মেয়ে শরীর বা যৌনতার ব্যাপারে যে বিকৃত লালসা তৈরি হয়, তার একমাত্র হাল শিক্ষার মধ্যেই আছে।

এই শিক্ষা গতানুগতিক শিক্ষা নয়।
সব অশিক্ষিত মূর্খ লোকেরাই কেবল ধর্ষক তাতো নয়, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবী এমনকি হোমরাচোমরা লোকেদের মধ্যেও এই রকম বিকৃত-কাম অসুস্থ লোকের সংখ্যা কম না।

মানুষের শরীর কেবলমাত্র একটি স্বাভাবিক শরীর, যেমন আর সব হাজার কোটি মানুষের আছে। হ্যাঁ, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ভালোবাসার বিষয়টি আলাদা। সেই সম্পর্কের মূল্যও আলাদা। কিন্তু নখ-দন্ত নিয়ে নিজের বা নিজেদের গায়ের জোর সম্বল করে একটি ছেলে বা মেয়ে শিশুর শরীরের নাজুক অংশগুলো লক্ষ্য করে হামলে পড়ার মধ্যে যে হিংস্র পশুর সাথে নিজের কোনও পার্থক্য থাকে না, এইরকম একটি মনোবিজ্ঞানের সরল শিক্ষা আমাদের জন্য অতি ছোটবেলা থেকেই পাওয়া উচিত। ছেলেমেয়েরা পুরুষ বা নারী হয়ে ওঠার আগেই জানা উচিৎ শরীর কী, মন কী! এবং নিজের মন দিয়ে কীভাবে নিজের সহজাত পশুবৃত্তিকে দমন করে মানুষের কাতারে পাশাপাশি চলতে হয়।

শেয়ার করুন:
  • 637
  •  
  •  
  •  
  •  
    637
    Shares

লেখাটি ১,২৮৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.