নারসিসিস্টিক পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার

0

আনন্দময়ী মজুমদার:

আয়নায় নিজেকে দেখা দস্তুর। কারণ নিজের সম্পর্কে ভালোভাবে সচেতন হতে হয়। আত্মজ্ঞান, আত্ম-সতর্কতা আমাদের সকলের জন্য জরুরি। নিজেকে খুব ভালো করে চেনা আসলে আধ্যাত্মিক কাজ। সেরকম সচেতনতা আত্ম-শ্রদ্ধার নামান্তর। নিজেকে ভালবাসা খুব ভালো কাজ। শিখতে সময় লাগে।

কিন্তু এটা ঠিক আধ্যাত্মিকতার কথা বলা হচ্ছে না। নারসিসিস্টরা নিজদের “হওয়ার” চেয়ে “করার” দিকে খেয়াল রাখেন। তাঁদের সম্পদ বাইরের, স্বভাবের নয়। চেহারা, বাইরের সাফল্য ও বাইরের “বড়ত্বের” দিকে তারা নজর দেন।

তাঁদের কাছে অন্যরা নগণ্য। এটা তাঁদের সিগনেচার স্বভাব। ছোট থেকে শুরু করে বড়ো বড়ো কাজে ও সিদ্ধান্তে যা উদ্ঘাটিত হয়।

তারা আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবিতে একটা দৈত্য আকারের সর্বাঙ্গ-সঠিক মানব দেখতে পান, শুধু তাই না, সঙ্গে সঙ্গে অন্যদের পিঁপড়ের মতো খুদে, অপ্রামাণ্য আর তুচ্ছ বলে মনে করেন।

অন্যদের আনন্দবেদনা আশা-আকাঙ্ক্ষা দুঃখ-কষ্ট তাঁদের স্পর্শ করে না। হয়তো আশেপাশে রক্তপাত হচ্ছে , তখন তিনি মজা করছেন ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে। এমনটা হতে পারে।

তারা যদি কাঁদেন, সেই কান্না তাঁদের নিজেদের জন্য। অন্যদের জন্য কদাপি নয়।

লিফটে যেতে গিয়ে দেখবেন অনেকেই অন্যদের সুযোগ না দিয়ে আগে বেরিয়ে যান, যেন প্রায়োরিটি তাঁদের। অন্যরা গৌণ, তাঁদের তাড়া তাড়া নয়।

অনেকেই খেতে বসে মাছের সবচেয়ে ভালো টুকরোটা নিজের পাতে নেবেন আগেভাগে, কারণ তাঁদের ‘প্রায়োরিটি বেশি’ বলে তারা মনে করেন।

নিজের বাইরে তারা বিশেষ কাজ হাতে নেন না। নিজের সুবিধের খাতিরে তারা অন্যদের অনায়াসে ‘অসুবিধে’তে ফেলতে পারেন। কিন্তু সেটা তাঁদের কাছে স্বাভাবিক। না হলেই তারা অসন্তুষ্ট হোন।

দেখা যায়, অন্যরা কথা বলছেন, তাঁদের কথা তিনি শুনবেন না, নিজেদের কথাটুকু বলার জন্য তাদের মাঝখানে উচ্চস্বরে কথা বলে থামিয়ে দেবেন, এবং উগ্রভাবে হলেও, তাঁদের মতামত দেবেন।

এছাড়া নারসিসিস্টরা অপূর্বভাবে অন্যদের দরকারটুকু খারিজ করতে পারেন যদি তা তাদের আরামের উল্টো দিকে যায়। পেশাদার উকিলের মতো। শেষ পর্যন্ত তাঁদের কথাটুকু আর প্রয়োজনটুকু তারা বহাল রাখতে চান।

অন্যদের মনে আঘাত দিয়ে হলেও তারা ‘সত্যি কথাটুকু’ বলতে আগ্রহী, কারণ তাতে তারা যে সর্বদা সঠিক, সেটা তাঁদের তুলে ধরা জরুরি।

তাঁদের অনুশোচনা নেই, সচরাচর সরি বলেন না। তারা সবসময় ‘সঠিক’ ; অন্যরা কতো ভুল, সেটা নানাভাবে এক্টুও দমে না গিয়ে তারা তা বুঝিয়ে দিতে সক্ষম।

তাঁদের মধ্যে আবেগী দোলাচল নেই।

কৃতজ্ঞতাবোধ একেবারে নেই।

সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে পুরুষদের অনেকের মধ্যে এই ডিসঅর্ডার থাকে, যদিও মেয়েদের মধ্যেও তা বিদ্যমান। যুক্তরাষ্ট্র সহ বেশ কিছু দেশে এই শব্দ এখন পরিচিত, আর এই বিষয় নিয়ে এখন বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলা হচ্ছে।

নারসিসিস্টরা একদিনে নারসিসিস্ট হোন না, বাড়ির কোনো না কোনো ছাপ থেকে তারা এই স্বভাবকে তাদের হার্ডওয়ারে শৈশবে রপ্ত করেন।

তারা নিজেদের ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করেন বলে এই অসুখের কিনারা তারা কখনো করেন না।

**এই পোস্ট একাডেমিক পোস্ট। জানার কোনো শেষ নাই, তাই সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকার প্রয়োজনে আমাদের জানতে হয়। অন্ধকারে লড়াই করে আলোয় আসার জন্য আমাদের দক্ষতা লাগে, সেটা জানার মাধ্যমে আমরা পাই। কাউকে দুঃখ দিয়ে থাকলে ক্ষমা চাই।

শেয়ার করুন:
  • 968
  •  
  •  
  •  
  •  
    968
    Shares

লেখাটি ৪,১০১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.