এইটা কোন উপদেশও না, কোন দোষারোপও না

ডা. আর্শিয়া আনান:

আজ থেকে ১০০ বছর আগে মেয়েদের বিয়ে হতো ১০ বছর হবার আগেই। তাদের তখন শ্বশুরবাড়ির নিয়মনীতির মাঝে বড় হতে হতো। তাদের বাবার বাড়ির অল্প কিছুদিনের স্মৃতি ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যেত। ১২-১৩ বছর বয়সের মাঝে মা হয়ে যেত, সাথে সাথে পুরোদমে সংসারি।

তখন বাবার বাড়িতে থাকতো তাদের ১০-১২টা ভাইবোন। বোনেরা বিয়ে হয়ে নিজের সংসারে যেত আর ভাইয়েরা বিয়ে করে বৌ আনতো। তখন মেয়েদেরে মাথায় এই চিন্তা আসতো না যে আমি বিয়ে হয়ে চলে এসেছি, এখন আমার বাবা-মা এর কী হবে! বরং ১০-১২ টা ভাইবোনের সংসার থেকে বেরিয়ে নিজের সংসারের কর্তৃত্ব হাতে পেয়ে তারা ভালোই থাকতো।
যাওয়ার আর জায়গা নাই বলে লাঠিঝাঁটা খেয়েও নিজের সংসার কামড়ায় থাকার চেষ্টা করতো। তারপর আমাদের নানি-দাদীর জেনারেশন- ইনাদের বিয়ে হয় ১৩-১৬ বছরে, বাচ্চা হয় একটু পরে। এদের কেউ যৌথ পরিবারে, আবার কেউ একা সংসার করে।
এদের ছেলেমেয়ের সংখ্যা কিঞ্চিৎ কম, তবে এতো কম না যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে।

তারপরের জেনারেশন আমাদের বাবা-মা। এই জেনারেশনের সিংহভাগই একক পরিবার গঠন করেছেন। তারা মূলত শূন্য থেকে শুরু করা যাকে বলে তাই। একটু একটু করে সংসার বড় হয়েছে তাদের- ছেলেমেয়ের সংখ্যা ২-৩ এ সীমাবদ্ধ। অনেকের একটি সন্তান অথবা কোন ছেলে নেই। এই সময় কিন্তু বিয়ের বয়সটাও বেড়ে যায়।
এইসব পরিবার থেকে আসা ছেলেমেয়ে হয় উচ্চশিক্ষিত, বিয়ে হয় ২০-৩০ বছরের মাঝে। এইসব পরিবারে ছেলে বা মেয়ে যেই সন্তানই জন্ম নিক, তারা একই আদর যত্নে মানুষ হতে থাকে।

কিন্তু আমাদের প্রাচীন নিয়ম তাতে বদলায় না। মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি চলে যেতে হবে। এখন যেই মেয়েটা আট বছর বয়সে শ্বশুরবাড়ি যেতো, সে যদি ২৪ বছরে যায় তার মানসিকতা কিন্তু এক থাকবে না। তার পেছনে আট বছরের ভাসা স্মৃতি নয়, বরং ২৪ বছরের কোটি কোটি স্মৃতি আছে। স্বাভাবিকভাবেই নতুন জায়গায় তার খাপ খাওয়াতে সমস্যা হবে। তারপর যদি মেয়েটা হয় স্টুডেন্ট, তাহলে পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, নতুন পরিবার সব মিলিয়ে তার অবস্থা যাকে বলে ল্যাজে-গোবরে হয়ে যায়।

আরও ব্যাপার আছে- এখন নিজের সংসারের পাশাপাশি তাকে তার পিতা-মাতার দিকটাও চিন্তা করতে হয়। যদি একমাত্র সন্তান হয় অথবা ভাই না থাকে, তাহলে তো সব দায়িত্ব তার। অপরদিকে একটা ছেলে বাবা-মা নিয়ে থাকছে, বিয়ে করে বৌ আনছে, তার কিন্তু হারানোর কিছু নাই। সে কিন্তু বুঝতে পারছে না তার সাথে এক ঘরে থাকা মানুষটা কতখানি স্যাক্রিফাইস করছে!
এই মেয়েটা হয়তো বাড়িতে গেঞ্জি, পায়জামা, স্কার্ট পরে ঘুরতো, এখন তাকে মাথায় ওড়না দিয়ে থাকতে হয়। ইচ্ছে হলে খেতো, ইচ্ছে না হলে খেতো না। তার আবদার পূরণ হয়ে যেতো নিমিষেই। এখন তাকে ১০বার চিন্তা করতে হয় যেকোনো কাজ করতে গেলেই। স্বামীর সাথে বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে, রেস্টুরেন্টে খেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু বাকি সবাই কী ভাববে!সবাইকে নিয়ে যেতে হবে! এই মেয়েটা কিন্তু তার বাবা-মাকে যেমন করে সংসার সাজাতে দেখেছে, তেমনটা নিজে পায় না।সে গিয়ে পড়ে একটা সাজানো সংসারে।
ওখানে ছেলের মা আবার নিজের সংসার ছেড়েও দিতে পারেন না, আর মেয়েটাও হঠাৎ এতোবড় সংসারের দায়িত্বও নিতে সাহস পায় না। হয়তো তার শুটকি-ভর্তা খেতে ইচ্ছা করছে, কিন্তু এটার গন্ধ পেলেই শ্বশুরবাড়ির সবাই ছ্যাঁ ছ্যাঁ করে উঠবে।একে তো বাবার বাড়িতে হাজারটা বাধা-নিষেধের মাঝে মানুষ হয় সে, ভাবে এবার নিজের সংসার নিজের মতো করবে। কিন্তু তা না হয়ে বাধা নিষেধ আরও বেশি হয়ে যায়। এমনকি অসুস্থ বাবা-মাকে দেখতে যেতেও তার দুই-তিনজনের অনুমতি নিয়ে যাওয়া লাগে।

তার মাথায় তখন ঘুরতে থাকে আরও বয়স বাড়লে তার বাবা-মাকে কে দেখবে!

এবার ধরা যাক ছেলেটার কথা। মেয়েটা যেমন ননীর পুতুল হয়ে মানুষ হয়েছে, ছেলেটাও কিন্তু তাই। দুজনের কেউই সংসারের ঝামেলাগুলো মোকাবিলা করার শিক্ষা পায়নি। তবে পুরুষ মানুষ মানে যে তার নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার আছে, এইটা সে ঠিক বুঝে। ওইদিকে ছেলের বাবা-মায়েরও হয়তো একটা-দুইটা সন্তান। তারাও ভয়ে থাকে বৌ ছেলেকে পর করে নিচ্ছে, আলাদা হয়ে যাচ্ছে। এই মানসিকতা থেকে তারা ছেলে- ছেলের বৌকে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করেন, তাদের যে আলাদা সংসার, এটা তাদের মাথায় আসে না। ওইদিকে ছেলেরা থাকে ইগো নিয়ে। মেয়েরা শ্বশুরবাড়ির জন্যে করবে, এটাই তো স্বাভাবিক, ছেলেরা করবে কেন?

আরে বাবা যুগ তো বদলে গেছে! তুমি না করলে অন্ততঃ তোমার বৌকে আটকানোর অধিকার তো তোমার নাই। বৌকে তার বাবা-মা এর জন্যে করতে দাও। মেয়েটা তো তোমার জন্যেই সব ছেড়ে-ছুঁড়ে এসেছে, একটু ঢিল দাও। ছেলের যদি ৪-৫ টা ভাই-বোন থাকতো, তাহলে হয়তো সে মেয়েদের মনোভাব কিছুটা বুঝতো, সেও সহজে মেয়েটার মন বুঝে না। এই জায়গায় হয় সবচেয়ে বড় সমস্যা। ছেলে শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে গেলে নাকি ছেলের জাত যায়। ফেসবুকে যতো মিম ঘুরে, তাতে মনে হয় ছেলের বৌ এর জন্যেই নাকি সবাইকে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হয়! কিন্তু কেউ এটা বলে না নিঃসন্তান বা মেয়ের বাবা-মা যারা তাদের কে দেখবে!

বৃদ্ধাশ্রম খুব ভালো জায়গা। কারণ আমি জানি, আমাকেও একসময় ওখানে যেতে হবে। অন্ততঃ বাড়িতে একা একা মরে তিন দিনে লাশের গন্ধ ছড়ালে সবাই জানবে, তা তো সেখানে হয় না।

বিয়ের সময় সবাই ধরে মেয়েটাকে উপদেশ দিবে- ‘সংসার নিজে সামলাবে, কাউকে কিছু বলবে না। শাশুড়ি কিছু বললে স্বামীর কানে দিবা না’।
ভালো কথা, নিজে সংসার সামলাবে কী, সে তো সংসার কী, তাই জানে না। নিজে বড় হয়েছে একক পরিবারে, যৌথ পরিবারের প্যাঁচ কী হতে পারে সে জানবে কীভাবে! স্বামী বলবে, সারাদিন কাজের পর ঝামেলার কথা শুনতে ভালো লাগে না। সে ছয় মাস পরেই কমপ্লেইন করতে থাকবে, সংসারে মন বসেনি তোমার। পিছনের ২০ বছর ভুলে মন বসাতে অন্ততঃ ৫ বছর তো লাগবে, ২-৩ মাসে সেটা হয় কীভাবে?

মেয়েটা বুঝতে পারে, তার এখন বাবার বাড়িও পর, শ্বশুরবাড়িতে অধিকার জন্মায়নি, স্বামীও আপন হয়নি। মেয়েটা চুপ থাকার চেষ্টা করে, চুপ থাকতে গিয়ে হয় ডিপ্রেসিভ, নাহলে ভায়োলেন্ট হয়ে যায়। আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটে যায়। অথবা সে ভাবে, আমার তো যোগ্যতার অভাব নাই, প্রতিমুহূর্তে পরগাছার মতো কেন বাঁচবো? সে তখন মুক্তি চায়।

এই ইগোফিডিং জেনারেশনে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় বাচ্চাগুলি। বাবা-মা কেউ এদের কথা ভাবে না। এই বাচ্চাগুলি বাবা-মা বেঁচে থাকতেও এতিম এতিম ভাব নিয়ে বড় হয়। না পায় তারা ভাইবোন, না পায় বাবা-মাকে। সিংগেল প্যারেন্টকে রোজগার করার জন্যে খাটতে হয়, বাচ্চাকে দেয়ার মতো সময় কোথায়?

এই জেনারেশন যখন বড় হবে, এদের কেউ কেউ থাকবে সাইকোলজিক্যাল ট্রমায়, কেউ হবে অ্যাডিক্টেড। এদের মাঝে কিছু ছেলে চাইবে ভালো বাবা হতে, আর মেয়েরা আবার যৌথ পরিবারে বিয়ে করতে ভয় পাবে। বিয়ে করতে ভয় পাবে। লিভ টুগেদার করবে। যেই সময়টা আজ আমরা পার করছি সেটা ইউরোপ-আমেরিকা ৬০-৭০ বছর আগেই পার করে ফেলেছে।আমাদের সমাজ সেদিকেই যাচ্ছে।

শেয়ার করুন:
  • 1.5K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.5K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.