রগরগে র‍্যাগ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

পৃথিবীতে প্রশ্ন না করে কিছুই কখনও মেনে নেয়া ঠিক না। সুতরাং, র‍্যাগ আছে নাকি নাই এই মীমাংসাতেও বিনা আলোচনায় যাওয়া উচিত না। যেকোনো পরিস্থিতির সত্য/মিথ্যার কাঁটাছেড়া না করে তাকে বিভিন্ন দিক থেকে বিশেষ করে ‘আউটসাইডার ভিউ’ থেকে যৌক্তিকভাবে দেখার রেয়াজ আমাদের সংস্কৃতিতে কম। তার ফলস্বরূপ র‍্যাগ নিয়ে আলাপ গিয়ে দাঁড়িয়েছে কোনগুলো র‍্যাগ, র‍্যাগ ভালো না খারাপ, জাহাঙ্গীরনগর পরিবার, নাকি পরিবার না, পরিবারকে প্রশ্ন করা যাবে, নাকি যাবে না ইত্যাদি বিতর্কিত ইস্যুতে; যেই ইস্যুগুলোতে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বিতর্ক চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। তাই আমি র‍্যাগ ইস্যুতে আমার পঠিত কোনো লেখার জের এই লেখাতে টানছি না। আমি বলতে চাই, র‍্যাগ বিষয়ে আমার সম্পূর্ণ নিজস্ব অভিমত।

ju-7প্রতিবাদ, প্রতিরোধে জাহাঙ্গীরনগর সবসময়ই অনন্য। তাই ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন আমাকে বিব্রত না করে গর্বিত করে। তাই আমরা শুধু ধর্ষণ আর নিপীড়ন নিয়ে কথা বলি বলে আমাদের এখানেই শুধু এইসব হয় যেমন সত্যি না ঠিক তেমনি র‍্যাগ নিয়ে আওয়াজ তুললে এটা প্রমাণ হতে যাচ্ছে না যে র‍্যাগ শুধু জাহাঙ্গীরনগরেই হয়, এইখানে ছেলেমেয়ে পড়তে দিলে তারা অসুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে আসে।

প্রতি বছর ঠিক ভর্তি পরীক্ষার আগ মুহূর্তে র‍্যাগ ইস্যু সামনে আসে। কখনও অন্য দেশের র‍্যাগের ছবি ‘আমাদের’ বলে চালিয়ে দেয়া, অথবা কখনও ‘সত্যি সত্যি’ র‍্যাগের আলাপ। একই কথা ‘জাহাঙ্গীরনগরে মেয়েকে পড়তে দেয়া’ নিয়েও প্রাসঙ্গিক। ঠিক ভর্তি পরীক্ষার মৌসুমেই জাহাঙ্গীরনগরে মেয়েরা কতোখানি অনিরাপদ এই নিয়ে অনেক ধরনের ‘সচেতনতামূলক’ লেখা চোখে পড়ে।

আবার কিছুদিন আগে নৃবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী বিভাগের বিভিন্ন দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা আরও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ের কথা ভিডিও ক্লিপে পাবলিকলি শেয়ার করেছেন। আমার এতো কথা বলার পয়েন্ট হলো, এই চিত্রগুলো তো পুরো দেশের জন্যই কম-বেশি প্রাসঙ্গিক কিন্তু এইগুলোর চর্চা জাহাঙ্গীরনগরে ভীষণ রকম সময় স্পেসিফিক বলেই আমার অবজারভেশন। যেহেতু আমরা সারা বছরই প্রতিবাদ করি তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি এই সকল ঘটনা ঘটা বা ঘটনাগুলো নিয়ে আলাপ শুরু করা দৈব বা কাকতালীয় নয়।

ju-5র‍্যাগ নিয়ে জেনারেলাইজড আলাপ আমি ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করতে পারছি না। সবই র‍্যাগ কিংবা সবই শাসন কোনোটাই আমি মানতে রাজি না। এই বিষয়গুলো এতো সরল না। প্রতিটা মানুষের অভিজ্ঞতাই স্বতন্ত্র। সুতরাং একই ঘটনা বিভিন্নভাবে দেখতে গিয়ে বিষয়টার ভিত্তিটাকে ইগনোর করার সুযোগ আমাদের নাই। বিষয়টা যদি আদর/শাসন হয়, আপনি র‍্যাগ মনে করলেও এটা আদর বা শাসন, বিষয়টা যদি ‘র‍্যাগ’ হয়, আপনি আদর মনে করলেও সেটা র‍্যাগ।

র‍্যাগ বলতে আমি বুঝি, এক পক্ষের উপর অপর পক্ষের (নিশ্চিতভাবে ক্ষমতাবান) আধিপত্য বিস্তারের কৌশল। ক্ষমতাবান কারণ অপর পক্ষ সিনিয়র, কারণ প্রথম পক্ষের এই আবাসিক আবহে খাপ খাইয়ে নিতে গেলে অপর পক্ষের থেকেই বিভিন্ন ধরণের সহযোগিতার দরকার পড়বে, এবং গুরুত্বপূর্ণভাবে অপর পক্ষ রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান যেই ক্ষমতা ছাড়া আপনি আপনার প্রাপ্য সিট পর্যন্ত পাবেন না।

যেহেতু এতো এতো সুবিধা আপনি পেতে যাচ্ছেন, এইটুকু আনুগত্য, বিনোদন বড়রা প্রত্যাশা করতেই পারে। তার উপর ‘ছেলেরা অনেক শক্তিশালী’ বা ‘মেয়েরা অনেক মহান’ এই সকল কথা যেভাবে আপনার মাথায় ঢুকানো হয়েছিলো যাতে আপনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে এটা নিয়ে প্রশ্ন করার কিছু নেই, সেভাবেই আপনার মাথায় ঢোকানো হয়েছে যে র‍্যাগ একটি মহান এবং ভালো বিষয়। র‍্যাগ অদূর সুসম্পর্কের জন্য অবশ্যম্ভাবী। সুতরাং, আপনি আপনার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অনুষঙ্গ হিসেবে র‍্যাগ খাবেন এবং যখন আপনি সিনিয়র হবেন তখন জুনিয়রদের আপনি র‍্যাগ দিবেন।

ju-4কিন্তু সত্য কথা হলো, কেউ আপনাকে কিছু করতে বাধ্য করতে পারে না যদি আপনি সেটা না চান। সেটা আদরই হোক আর সংস্কৃতি। সম্পর্ক তৈরির জন্য র‍্যাগ দেয়ার বা খাওয়ার দরকার নেই, দরকার পারস্পরিক সংবেদনশীল আচরণ। আপনাকে ‘র‍্যাগ’ দেয়া বারণ জেনে আপনি কারও প্রতি অসংবেদনশীল আচরণ করতে পারেন না। তথাকথিত ‘প্রিভিলেজের’ অপব্যবহার আপনি কোনো অবস্থাতেই করতে পারেন না।

আপনাকে র‍্যাগ দেয়া যাবে না, এটা কোনো প্রিভিলেজ না, এটা আপনার অধিকার। যেই আপনি ভাববেন আপনি প্রিভিলেজড সেই আপনি নিজেকে ক্ষমতাবান ভাবতে শুরু করবেন এবং ক্ষমতার সেই পুনঃপৌনিক চক্র চালু হয়ে যাবে। আপনি শুরু করবেন আপনার চেয়ে কম প্রিভিলেজড মানুষদের নিপীড়ন করা, এমনকি সেটা আপনার সিনিয়ররাও হতে পারেন। পরিশেষে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হবে যেটা আমাদের কারওই কাম্য না এবং সেজন্যই এতো আলাপ।

আদর-শাসন আমরা সবাই বুঝি। প্রতিদিন ২০/৩০ বার আমরা আমাদের ছোটো ভাইবোনদের হুকুম দেই, ‘অপদস্থ’ করি। একইসাথে আমরা ওদের এই আশ্বাসও দেই যে ওরা চাইলে বা ওদের সুবিধা হলে আমরাও ওদের জন্য অনেক কিছু করতে পারি/করবো এবং স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক বজায়ের লক্ষ্যে ওরা আমাদের ‘অপদস্থ’ও করতে পারে। এটাই সম্পর্কের সৌন্দর্য। কিন্তু একজন বড় ভাই বা বোন হিসেবে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য এসব কিছুই আমরা করতে পারি না, করা উচিতও না। উভয় পক্ষেরই এটা জানা উচিত যে, সম্মান, শ্রদ্ধা শুধু বড় এবং ক্ষমতাবানদের প্রটোকল না, এটা ছোটো এবং ক্ষমতাহীনদের অধিকারও।

আমি জাহাঙ্গীরনগরকে আমার পরিবার ভাবি, অ্যাজ অ্যা ‘আইডেন্টিটি’ আমি আমার ‘নিজের পরিবার’ এবং ‘জাহাঙ্গীরনগর পরিবার’ কেবল এই দুইটা পরিচয়েই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমি জাহাঙ্গীরনগরের বিষয়ে খুবই সেন্সিটিভ ফিল করি, আমার নিজের পরিবারের মতোই। আজ বের হওয়ার এতো বছর পরেও এবং বিশ্বাস করি বাকি পুরোটা জীবনই ‘জাহাঙ্গীরনগর’ শুনলেই বুকের ভেতর আবেগের পাখি ডানা ঝাপটাবেই।

কিন্তু আমি আমার পরিবারকেও প্রশ্ন করি, কেন শুধু ছেলে বলে আমার ভাইয়ের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকবে আমি অবশ্যই জানতে চাই, আমি জানতে চাই কেন সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও শুধু মেয়ে হওয়ার দরূন কয়েক লক্ষ টাকা আমার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ হিসেবে বিনিয়োগ করা হবে না, কেন আব্বু বাসায় আসলে সবকিছু রেডি অবস্থায় থাকতে হবে শুধু এই কারণেই যে তিনি আমাদের পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী এবং পুরুষ ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি বিশ্বাস করি এই প্রশ্নের জায়গাটা না থাকলেই বরং শ্রদ্ধার জায়গাটা নষ্ট হয়ে যায়, আদতে সম্পর্কটা গিয়ে দাঁড়ায় উর্ধ্বতন আর অধস্তনের সম্পর্কে।

র‍্যাগ থেকে ক্ষমতা আর রাজনীতিকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে গিয়ে আদতে আমরা ক্ষতি করছি আমাদের নিজেদেরই। একজন শিক্ষার্থী হয়তো তার পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে রঙ্গিন স্মৃতির এক বিশাল ঝুড়ি নিয়ে বের হয়েছে এবং আমি বিশ্বাস করি এরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। জাহাঙ্গীরনগরের সিনিয়ররা শুধু একটা ভাষাতেই কথা বলে, সেটা হলো র‍্যাগের ভাষা-এইভাবে আমরা জাহাঙ্গীরনগরকে রেপ্রেজেন্ট না করি।

আমরা বরং কথা বলি নির্দিষ্ট গ্রুপ অফ পিপলকে নিয়ে। প্রশ্ন করি প্রশাসনকে, জানতে চাই যে র‍্যাগের নামে নিপীড়ন সত্যি সত্যি কবে বন্ধ হবে? র‍্যাগের পাশাপাশি আমাদের রাজনীতি নিয়েও প্রশ্ন তুলি, আমরা কথা বলা শুরু করি শিক্ষকদের দ্বারা সংঘটিত বহুবিধ হয়রানি নিয়ে। হলের কমন রুমের সিটিং, রাজনৈতিক মিছিলে যেতে বাধ্য করা বা শিক্ষকদের নম্বরের রাজনীতি এইগুলোর মধ্যে আমি ব্যক্তিগতভাবে গুণগত কোনো হেরফের পাই না। নিপীড়ন তো কোনো ফর্মেই প্রত্যাশিত না, তাই না?

প্রাক্তন শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.