এইতো হেথায় কুঞ্জ ছায়ায়—-

আফরিন জাহান হাসি: “এই তো হেথায় কুঞ্জ ছায়ায় স্বপ্ন মধুর মোহে এই জীবনে যে কটি দিন পাবো তোমায় আমায় হেসে খেলে কাটিয়ে যাবো দোঁহে স্বপ্ন মধুর মোহে”-

বসন্তের মিষ্টি বাতাস, দূরে গাঢ় নীল পাহাড়, চারিদিকে গাছের সারি আর স্নিগ্ধ চাঁদের আলোতে আমার বর যখন এই গান গেয়ে শোনাতো, তখন হাতে হাত রেখে ঐ পথচলাতেই জীবন পরিপূর্ণতা পেতো। সুন্দর, সার্থক মনে হতো এই মানব জীবন। এই হাসি-খেলা, নর-নারীর পরস্পরের ভালোবাসা-এইতো জীবন।

Flower 2আর এর সাথেই জড়িয়ে থাকে দুটি জীবনের নিত্যদিনের কাজ কর্ম, দায়িত্ব-কর্তব্য সব। পারস্পরিক নির্ভরশীলতায় এই সব প্রাত্যহিকতা হয়ে ওঠে সহজসাধ্য। সমস্যাটা বাঁধে তখনি যখন আমাদের সমাজের দীর্ঘদিনের নেগেটিভিটি বায়াস এসে বাগড়া দেয়।

অনেক আগে একটা গল্প পড়েছিলাম তা একটু সংক্ষেপে বলছি তাহলে এই নেগেটিভিটি বায়াস বোঝা সহজ হবে। গল্পটি হলো,”ছোট বোনের বিয়েতে এসেছে সুমি। বিয়ে উপলক্ষে বাড়ি ভর্তি আত্মীয়স্বজন, ক্ষণে ক্ষণেই গল্প জমে উঠছে সবার। কিন্তু সুমি কেমন যেন সবার থেকে আলাদা হয়ে পড়ছে, তাদের একজন ঠিক হতে পারছে না।

বিষয়টা হচ্ছে, সবাই সবার বর বা বউ এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে। কে কার থেকে বেশি কষ্ট সহ্য করছে তা নিয়ে একটা কম্পিটিশন হবার যোগাড়। সুমির কোন অভিযোগ নেই, তাই ও কিছু বলতে পারছে না। কেউ কেউ ওকে টিপ্পনী কাটছে, বর পাগল বলে, আবার এও শোনালো বেশি কষ্টে গোপন করতে চাইছে।

কেউ কেউ সুমিকে হিংসা করছে এটাও বোঝা গেল। সুমির আসলেই কোন অভিযোগ নেই ওর বরের প্রতি। যেটুকু টানাপোড়েন, সুমির কাছে তা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের স্বাভাবিকতা বলেই মনে হয়, পারস্পরিক বোঝাপড়ায় তা মিলিয়ে যায়। কিন্তু এটাই সবার কাছে অস্বাভাবিক লাগছে, সুমিকে তারা দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। বিষয়টা বুঝতে পেরে সুমি বানিয়ে বানিয়ে বর সম্পর্কে অভিযোগ করা শুরু করলো, তাতেই কাজ হলো, সবাই সুমিকে তাদের একজন করে নিলো।”
এই গল্পটি শুধুই গল্প নয়, এটাই আমাদের সমাজের প্রকৃত অবস্থা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় সবার মধ্যে একটা প্রি-কনসেপ্ট কাজ করে যে নব যুগলের বনিবনা হচ্ছে না। নতুন বিয়ের পর অনেককেই এইসব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, শাশুড়ি/শ্বশুরবাড়ি কেমন? বউ কেমন? বর কেমন? আদর-যত্ন করে, নাকি অত্যাচার করে?

Rel Edu 4পজিটিভ উত্তরে গল্পের সুমি’র মতো পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। আবার এও দেখা যায় যে, কেউ সত্যিই অত্যাচারিত, কিন্তু কাছের কারো পজিটিভ সমর্থন পাচ্ছে না তা মোকাবেলা করার জন্য। উপরন্তু তাদের শুনতে হয়,” এমন একটু-আধটু অত্যাচার তো স্বাভাবিক, তোমার বেশী বেশী, মানিয়ে নিলেই হয়”।

আবার অনেক ক্ষেত্রে ছেলের বউ সম্পর্কে পুরো পরিবারই প্রি-কনসেপ্ট নিয়ে রাখে যে সে অন্য বাড়ির মেয়ে, আমাদেরকে আপন ভাববে না, ছেলেকে পর করে দেবে। উল্টোটাও হয়, বর কিংবা বউ শ্বশুরবাড়ির মানুষ সম্পর্কে নেগেটিভ ধারণা নিয়ে রাখে।

এখানে আর একটা স্মৃতি উল্লেখ করছি, এক বাসার দেয়ালে একটা ফ্রেমে বাঁধানো লেখা অনেকবার দেখেছি, তা হলো ,

“ভাই বড় ধন রক্তের বাঁধন

ছিন্ন হবার নয়

যদি বা ছিন্ন হয়

তা নারীরই কারণ”
Cook 1কী প্রচণ্ড নেগেটিভ একটা বিষয় দেয়ালে প্রদর্শিত হচ্ছে। নেগেটিভিটির এই যে চর্চা তা কি আমাদের ভেতরে বাসা বাঁধছে না? নর-নারীর ভালোবাসায় পৃথিবীতে যে প্রাণ-প্রাচুর্য্যের সমারোহ দেখা যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় এই নেগেটিভিটি। তাই অনেক সুশিক্ষিত মানুষের কাছ থেকেও শুনতে হয়, ‘চালাক শাশুড়ীরা বউদের একটু টাইটে রাখে, এটাই হয়ে আসছে, এটাই স্বাভাবিক’।

কিংবা বাসর রাতের বিড়াল মারার গল্প জনে জনে ছড়িয়ে চলে। আজকে একটা বাংলা ছবি দেখছিলাম, স্বনামধন্য পরিচালকের ছবি। মুগ্ধ হয়ে দেখার মতো সুন্দর কাহিনীর ছবি। পুরো ছবির শুধু একটা অংশ মনটা খারাপ করে দেয়, আবার সেই নেগেটিভিটির চর্চা। ছেলের বউ তার শ্বশুরকে খুব অত্যাচার করছে। পুরো কাহিনীর জন্য এ অংশটুকু খুব জরুরি কিছু না, এটাকে কি ভিন্নভাবে দেখানো যেত না!

আমি দেখেছি, শ্বশুর-শাশুড়ীর সাথে বন্ধুর মতো সম্পর্ক ছেলের বউ এর। শ্বশুরের মৃত্যুতে নিজের বাবা হারানোর মতোই শোকাতুর ছেলের বউ। দেখেছি, ছেলের বউকে শহরে যাবার সময় বিদায় জানাতে কাঁদতে কাঁদতে দু’মাইল হেঁটে চলে আসা শাশুড়ী। যেন নিজের মেয়েকেই বিদায় জানাচ্ছে। যতক্ষণ বাস দেখা যায় ততক্ষণ শাশুড়ীর শাড়ির আঁচলে চোখ মোছা আর আবার কবে আসবে তাই নিয়ে বিলাপ পারা।
আমার মনে হয় আমরা যদি সবাই মিলে সম্পর্কের পজেটিভ দিকগুলো নিয়ে বেশি বেশি আলোচনা করি, প্রত্যেকের জীবনের সুন্দর মুহুর্তগুলো, অন্যদের সঙ্গে কাটানো সুন্দর সময়গুলো সবার সামনে তুলে ধরি, তাহলে আমাদের মজ্জাগত নেগেটিভিটির যে স্বাভাবিকতা, তার পরিবর্তন হবে।

প্রত্যেকটি মানুষই ভালো-মন্দ মিলিয়ে। নর-নারীর জীবনের যে ধারা এই পৃথিবীতে বয়ে চলছে ভালো আর মন্দও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তার সাথে। মানুষ মানুষকে ভালোবাসে, সম্মান করে, দোষ-ত্রুটিগুলোকে ক্ষমা করে। এই সুন্দর চিত্রটাই যে স্বাভাবিক তা আমাদের বার বার আলোচনায় আনতে হবে।

নাটক-সিনেমায় সম্পর্কের পজিটিভ দিকগুলো দেখাতে হবে। একটি পরিবার থেকে অসংখ্য পরিবারে ছড়িয়ে যাবে ভালোবাসার বার্তা। তাহলেই হয়তো একটা সময় আসবে যখন নর-নারীর নব বন্ধনে মানুষের মাঝে পজিটিভ প্রি-কনসেপ্ট কাজ করবে যে, শুরু হতে যাচ্ছে ভালোবাসা আর সম্মানের সুন্দর নতুন নতুন সম্পর্ক। জীবন বয়ে চলবে স্বপ্ন মধুর মোহে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.