বাঁশি লাঠির নিরাপত্তা বনাম আমাদের জীবন

মো: সাইদুর রহমান: গত ১৫ জুন ২০১৬ তারিখে আমার বন্ধু লীনা হাসিনা হকের বাঁশি-লাঠির নিরাপত্তা শীর্ষক একটি লেখা উইমেন চ্যাপ্টারে ছাপা হয়েছে। লেখাটি চমৎকার এবং শুভবুদ্ধির যেকোনো মানুষই লেখাটি পছন্দ করবে বলে আমি মনে করি; হয়েছেও তাই।

লেখাটিতে কিছু গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যেমন; রাষ্ট্রের পুলিশ কর্মকর্তারা যে জনগণের হাতে বাঁশি-লাঠি তুলে দিচ্ছে; আইনগতভাবে তারা কি তা পারেন? জনগণের নিরাপত্তার দায়িত্ব যদি জনগণই নেয়, তাহলে নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্ব কী? এরকম আরও কিছু মৌলিক প্রশ্ন।

‘মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা ১৯৪৮’ এর ৩ নম্বর অনুচ্ছেদটি এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ। এই একটি অনুচ্ছেদেই যেন মানবাধিকারের সব কথা বলে দেওয়া হয়েছে।

সেখানে বলা হয়েছে, “Everyone has the right to life, liberty and security of person”

Lathhi-Banshiঅর্থাৎ প্রত্যেকেরই তার জীবনের অধিকার আছে, তা থেকে তাকে বঞ্চিত করা যাবে না, প্রত্যেকের স্বাধীনতা আছে, তা থেকে তাকে বঞ্চিত করা যাবে না এবং প্রত্যেকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা লাভের অধিকার আছে, তা থেকে তাকে বঞ্চিত করা যাবে না এবং এ দায়িত্ব রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্টভাবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী ও বিচারবিভাগের হাতে ন্যস্ত।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ খুবই প্রাসঙ্গিক। সেখানে বলা হয়েছে “আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না”।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫ (৫) অনুচ্ছেদ বলছে “ কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাইবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাইবে না কিংবা কাহারও সহিত অনুরুপ ব্যবহার করা যাইবে না”।

বর্তমানে আমরা সকলেই নিরাপত্তাহীন বিশেষ করে আমাদের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠি; কথিত জঙ্গিদের হাতে তাদের বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছে, ব্লগারদের কেউ কেউ নিহত হয়েছে, একজন পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীও নিহত হয়েছে এবং প্রায় প্রতিদিনই এ ধরনের হত্যার খবর পাওয়া যাচ্ছে; যা ভীষণ দু:খের, ভীষণ কষ্টের, বেদনাদায়ক এবং অনভিপ্রেত।

প্রশ্ন হচ্ছে যে, কারা এই হত্যাকারী? সরকার বলছে বিএনপি-জামাত এ হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে? আইএস দাবি করছে, তারা ঘটাচ্ছে? আর যাদের ধরা হচ্ছে তাদেরকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে জেএমবি, হরকাতুল জেহাদ অথবা হিযবুত তাহরির এর নেতা কর্মী হিসেবে। তাদের অনেকের ক্রসফায়ারে মৃত্যুও সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু এদেশের ট্যাক্সপেয়াররা কি সত্যিই বুঝতে পারছে যে কারা ঘটাচ্ছে এ হত্যাকাণ্ড? কোন্ বক্তব্যটি সঠিক? কারটি সঠিক? সত্যিই আমরা কি বুঝতে পারছি?

এই না বোঝার মধ্যেই বাঁশি-লাঠির নিরাপত্তা চলে এল। জনগণ ট্যাক্স পেয়ার। ট্যাক্স পেয়াররা ট্যাক্স দেয়, তাদের জান মালের নিরাপত্তা পাওয়ার আশায়, কাঙ্খিত সার্ভিস পাওয়ার আশায়। তাদের হাতে বাঁশি-লাঠি তুলে দেওয়া হচ্ছে তাদের নিরাপত্তা তাদেরকেই নিশ্চিত করার জন্য তাও দিচ্ছে খোদ পুলিশ কর্মকর্তারাই। আমাদের দেশে এমনিতেই গণপিটুনিতে মানুষ মারার রেওয়াজ আছে যা বেআইনি, কিন্তু আছে।

কোনো সভ্য দেশে এ ধরনের গণপিটুনির মাধ্যমে মানুষ হত্যা করার কথা কেউ কল্পনাও করতে পারে না। কিন্তু আমরা পারি। এখনও পারছি। কাউকে কাউকে খুশি হতেও দেখছি।

প্রশ্ন হচ্ছে, যাদের হাতে লাঠি তুলে দেওয়া হচ্ছে তারা এই লাঠি দিয়ে কী করবে? তাদের ‘টার্মস অফ রেফারেন্স’ কী? আমরা কি জানতে পারি? জনগণ নিরাপত্তা বাহিনীকে অবশ্যই সাহায্য করবে, সহযোগিতা করবে। তারা সাক্ষ্য দেবে, চিনিয়ে দেবে, সম্ভব হলে আটক করে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে তুলেও দেবে। কিন্তু তার জন্য লাঠির কী প্রয়োজন?

জনগণের হাতে লাঠি তুলে দিয়ে কি বিচারবহির্ভুত কর্মকাণ্ড করতে তাদেরকে উৎসাহিত করা হচ্ছে না? এদেশের কোনো কোনো নিরাপত্তার বাহিনীর বিরুদ্ধে ভিকটিমের পরিবার গুমের অভিযোগ তুলছে, বিচারবহির্ভুত হত্যার অভিযোগ তুলছে, বিচারবহির্ভুত হত্যা ঘটেও চলেছে।

এ বিষয়ে সকলের ভরসাস্থল বিচার বিভাগ নীরবতা পালন করে চলেছে। এখন জনগণের হাতে তুলে দেওয়া লাঠি কোন্ কোন্ বিচার বহির্ভূত কর্মকাণ্ড ঘটায় তা আমাদের দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে?

সংবিধানের ৩২ ও ৩৫ অনুচ্ছেদ কি বাঁশি লাঠির সাথে সাংঘর্ষিক নয়? অবশ্যই সাংঘর্ষিক। নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক জনগণের হাতে লাঠি তুলে দেওয়া কি বেআইনি নয়? এতে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত হবে, যা ভয়ংকর এবং সার্বিকভাবে জনগণের নিরাপত্তার জন্য হুমকির সৃষ্টি করবে।

এদেশের ট্যাক্স পেয়ারদের জীবন, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার কোনো অধিকার আদৌ কি আছে? কতটুকু আছে?

কী বার্তা দিচ্ছে লাঠি-বাঁশি? নিজের হাতে আইন তুলে নাও যে যেমন পারো। ধরো আর মারো যে যত পারো। যাকে খুশি ধরো প্রমাণ ছাড়া-বিচার ছাড়া মারো, লাঠি দিয়ে মারো। এ লাঠি বিশেষ লাঠি, রক্তের দাগ লাগবে না। আজকাল ট্যাক্স পেয়াররা তাদের জীবন, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলতেও ভয় পেতে শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত আমরা কি মানুষের মর্যাদায় বেঁচে থাকতে পারবো?

লেখক: আইনজীবী

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.