প্রিয় মমতা শংকর, দয়া করে আর মুখ খুলবেন না!

সুপ্রীতি ধর:

প্লিজ মমতা শংকর, আর মুখ খুলবেন না। খুবই অপরিণামদর্শী মতামত দিচ্ছেন একের পর এক আর আমরা বাংলার মেয়েরা রাগে-ক্ষোভে ফেটে পড়ছি। অযথা এই কষ্টটুকু আর দিবেন না আমাদের। নিজের ভাবনা নিজের মাঝেই রাখুন।

আপনার বংশপরিচয়, আপনার গুণ নিয়ে আমাদের কোন দ্বিমত নেই। বরং দুই বাংলায় আপনি বেশ সমাদরেই আছেন। সম্মান পেয়ে এসেছেন জীবনভর। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে আপনি যা যা বলছেন মেয়েদের প্রসঙ্গে, পিরিয়ডের ট্যাবু নিয়ে, তৃতীয় লিঙ্গ নিয়ে, এসব আর নেয়া যাচ্ছে না। বিশ্বাস করুন, সবকিছুর একটা পরিণাম আছে। আপনার এসব কথাবার্তা বিশাল প্রভাব ফেলছে আমাদের এতোদিন ধরে এগিয়ে নিয়ে আসা নারী অধিকার আন্দোলনে। মানবাধিকার আন্দোলনে।

আপনি অনেক গুণী একজন মানুষ, অভিনয়ে যেমন পারদর্শী, নৃত্যেও তাই। পরিবার আপনার ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। এতোদিন ধরে ভেবে এসেছি ব্যক্তি মানুষ হিসেবেও আপনি হয়তো গুণীই হবেন। কিন্তু ভুল ভাঙলো আমাদের। কর্মক্ষেত্রে গুণী হলেই মানুষ যে ইতিবাচক চিন্তাসম্পন্ন বা আলোকিত হন না, তা আপনি প্রমাণ করলেন আবারও। ১৯ শে মার্চ-এ আনন্দবাজার অনলাইনে নারীর পোশাক সংক্রান্ত আপনার যে মতামত আপনি রেখেছেন, মেয়েদের শাড়ি পরার ধরন বর্ণনা করতে গিয়ে স্পষ্টভাবে আপনার পছন্দমতো পোশাক না পরা মেয়েদের ‘ল্যাম্পপোস্টে দাঁড়ানো মেয়ে’ বলেছেন। রিয়েলি? আপনি কি জানেন যে এতে করে আপনার ভিতরে লুকিয়ে থাকা মিসোজিনিস্ট আচরণেরই প্রকাশ ঘটলো! আপনার সাথে অন্ধকারে থাকা, পিছিয়ে থাকাদের কোন পার্থক্য থাকলো না! যাদের আপনি ‘ল্যাম্পপোস্টে দাঁড়ানো মেয়ে’ বলেছেন, তাদের একেকজনের লড়াইটা কি জানেন? আপনার মতোন পুরুষতান্ত্রিক সমাজই ওদের ওখানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, এটা বিশ্বাস করেন তো?

ভিতরে ভিতরে আপনি ভয়াবহ পুরুষতান্ত্রিক একজন নারী। আজকের সমাজে ওই অন্ধকারে থাকা মানুষের চাইতে আপনার মতোন মানুষই বরং ভয়াবহ। আতংকের কারণ। কারণ আপনাদের মতোন জ্ঞানপাপী লোকজনের সাথে লড়াই চালানো যায় না, কষ্ট হয়। আমরা যখন এতো এতো বছর লড়াই করে একটা জায়গায় পৌঁছাতে চেষ্টা করছি, তখন এই আপনার মতোন মানুষজনই এক লহমায় আমাদের এগিয়ে থাকাকে পিছিয়ে দিচ্ছে অনেকদূর। এসব কথার জন্য আপনি হয়তো বাহবা পাচ্ছেন আপনারই মতোন গোষ্ঠীদের কাছে। পাবেনই তো। ওরা তো এমনটাই চায় সবসময়। ওরা এভাবেই মেয়েদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, অপমান করে, নির্যাতন করে। পিছিয়ে রাখতে চায়। ক্ষেত্রবিশেষে খুনও করে। আপনি হয়তো বুঝতেও পারছেন না যে আপনি কতোটা এগিয়ে দিয়েছেন ওদের! আপনি এই সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির। আপনি বুঝতে চাইছেন না আমাদের মেয়েদের কতোটা রক্তাক্ত পথ পেরোতে হয়, হচ্ছে।

মমতা শংকর, বন্ধুদের কাছে জানতে পেরেছি, এ ধরনের হীন মন্তব্য আপনি এবারও প্রথম করেননি। এর আগে ২০১৬ সালেও করেছেন। তখন স্বস্তিকা ছিলেন সাথে। বিষয়টা ছিল মেয়েদের পিরিয়ড, মানে ঋতুস্রাব। এর ট্যাবু নিয়ে কথা হচ্ছিল।

স্বস্তিকা যখন বলছেন এই নিয়ে প্রকাশ্যে অনেক কথা বলা উচিত, তখন আপনি মমতা শংকর, হাতে নৃত্যের মুদ্রা সৃষ্টি করে বলছেন, কোথাও একটা ‘আব্রু’ থাকা দরকার। কারণ ‘আমরা সব জানি’, তাই আবার আলোচনা কেন?
আপনি বললেন যে আপনি কখনও পিরিয়ড হলে বাবা বা ভাইকে পিরিয়ডের প্যাড আনতে বলতে পারবেন না যা এখনকার মেয়েরা পারে। আপনি পারবেন না বা পারেননি, ঠিক আছে। কিন্তু এখনকার মেয়েরা যে এটা পারে, একে আপনার সাধুবাদ জানানো উচিত ছিল। আজ আমরা সকলেই যখন পিরিয়ডের ট্যাবু ভাঙতে চাইছি, এ নিয়ে প্রচুর লেখালেখি করছি, লজ্জা, সংকোচ না করে বাচ্চা মেয়েদেরকে একে শরীরের স্বাভাবিক চক্র হিসেবে নিতে উৎসাহিত করছি, পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে বলছি, তখন আপনার এই মন্তব্য শুধুই হাস্যকর নয়, এটা অর্বাচীন চিন্তাভাবনারই প্রকাশ মাত্র।
সত্যি বলছি, আপনার মন্তব্যগুলো সব পাশের বাসার খালা-মাসীদের মতোন হয়ে গেল। নীতি পুলিশি সব জায়গায় চলে না, এটা ভুলে গেছেন কোন কারণে। এখনকার সময়ে তো আরও না। আপনার এমন বক্তব্যে ওপার বাংলায়ও দেখলাম বেশ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হয়েছে, বাংলাদেশেও  হয়েছে। সবাই আপনার ওমন মন্তব্যকে ‘মধ্যমা’ দেখাচ্ছে। এটা কি ঠিক হচ্ছে, আপনিই বলুন?
প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক
উইমেন চ্যাপ্টার

 

শেয়ার করুন: