কোলাহল নয়, শিরদাঁড়া সোজা করো শিক্ষা ও বিনয়ে!

0

শেখ তাসলিমা মুন:

একজন মনোচিকিৎসক হতে হলে তার ডিগ্রির পর, দুবছর নিজেকে থেরাপিতে যেতে হয়। নিজের বেদনা ও মনোযাতনা থেকে ডিস্ট্যান্স না হলে সে অন্যের চিকিৎসা করতে পারে না। একটি দেশের জনগণের নেতৃত্ব দিতে গেলে সেই নেতাকেও হতে হয় সুস্থ।
বেশকিছু বছর আগে সুইডেনের এখনকার লিবারেল পার্টির লিডার গাড়ি চালিয়ে স্বামী এবং দু সন্তান নিয়ে বাড়ি যাচ্ছিল। শক্ত হয়ে জমে থাকা বরফে তাঁর গাড়ি বিরাট এক্সিডেন্ট করে। সে এক্সিডেন্টে তাঁর স্বামী মারা যায়। তাঁর যে মনোবিপর্যয় হয়, তাতে তাঁকে তাঁর দলের সভাপতি পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এ কারণে যে তাঁর ব্যক্তি ট্রমা ও হারানোর তীব্র বেদনা থেকে ডিস্ট্যান্স না হওয়া পর্যন্ত তাঁর পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব নয়।

আমাদের দেশে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। বঙ্গবন্ধুর মেয়ে শেখ হাসিনা যখন পরিবারের ২২ জন সদস্য একরাতে হারিয়েছেন, সেই তাঁকেই নিতে হয়েছে এক বিশাল দলের দায়িত্ব। মনে হয় না, এই লিডার কোনদিন তাঁর এ তীব্র বেদনার কোনো প্রফেশনাল মনোচিকিৎসা নিয়েছেন। ওদিকে খালেদা জিয়া স্বামীর কফিনে মাথা দিয়েই নেতা হয়ে গেছেন।

আমাদের নারীরা যারা নারী বঞ্চনার ফিল্ডে নারীর ভাগ্যন্নোয়নের কথা বলবেন, বেদনার বিষয় তাঁরা অনেকেই তাঁদের নিজেদের বেদনা ও নিজেদের মনের ক্যাওয়াস থেকেই উঠে আসতে পারছেন না। একজন নারীর বঞ্চনা এবং তাঁর ক্রোধ একটি নিছক ছোটো কোনো বিষয় নয়। সেটা থেকে ডিস্ট্যান্স না নিলে নিজের মনের মানচিত্র ফুটে ওঠে। সমস্যার বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই নিজের মনের অবস্থা প্রতিফলিত হয় যা সমস্যার সমাধান থেকে বরং সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। তখন তা ব্যক্তি সমস্যার বলিরেখায় ভরে ওঠে। তখন ‘বিষয়ের’ প্রতি সুবিচার বজায় থাকে না, বা সুবিচার করার ক্ষমতা অর্জিত হয় না। বিষয়টির প্রতি অবজেকটিভ হওয়া একজন দায়িত্বশীল এক্টিভিস্টের জন্য খুবই দরকারি। আর এ বিষয়ে ‘আমি’ ফর্মটি থেকে উঠে আসা খুব দরকারি। ‘বিষয়’ এবং ‘নিজ’ দুটো বিষয় আলাদা করা দরকারি।

একজন ডাক্তার যখন রোগী হয়ে যায় তখন সে রোগ নির্ণয় করতে সক্ষম হয় না এবং রোগীর কোনো উপকারে আসতে পারে না। একজন ডাক্তারকে সারাদিন অসংখ্য পেশেন্টের সমস্যা শুনতে হয়, সমস্যা নির্ণয় করতে হয়। এর ভেতর তাঁকে যেটা শিখতে হয় সেটি হলো সেলফ ডিস্ট্যান্স। এ ডিস্ট্যান্স জানা না থাকলে সে কখনই পেশাদারিত্ব কী তা বুঝতে পারবে না, পেশাদার ডাক্তারও হয়ে উঠতে পারবে না।

আমাদের দেশে নারী আন্দোলনের ইতিহাস খুব বেশিদিনের নয়। বিষয়টির তাৎপর্য অনুধাবন করতে এ বিষয়ে শিক্ষার দরকার যে কতো বেশি, সেটি পাশ্চাত্যের মানুষ কিছুটা অনুধাবন করেছে। এগিয়ে আসা দেশগুলোর মানুষ, সংগঠন ছাড়াও রাজনৈতিক দলগুলোও বুঝতে পেরেছে নারীবাদ শিক্ষা ছাড়া তাঁদের শিক্ষা সম্পূর্ণ নয়। প্রত্যেকটি দলের জন্য আজ নারীবাদ জানা এবং পড়া একটি বাধ্যতামূলক বিষয়।

ট্রুডর মতো নেতাকেও বলতে হয়, ‘আমি ফেমিনিস্ট’। আবারও সুইডেনের উদাহরণ তুলতে হচ্ছে, সুইডেনের এমন কোনো দল নাই তাদের বলতে না হচ্ছে যে ‘তাঁরা নারীবাদী।’ নারীবাদ না জেনে তাদের রাজনীতি করা চলছে না। নারীবাদ না পড়ে তাদের ভাত হচ্ছে না।

আমাদের নারীরা অভিজ্ঞতা ভারে ন্যুব্জ। তাঁদের জীবনের উপর কালশিটে দাগ। হা করলেই ভেতরের রক্তক্ষরণ উপচে আসে। ছলকে পড়ে। তাঁদের বেদনাগুলো তাঁদের চারপাশ ঘিরে থাকে। সেগুলো শোনার মানুষ নেই। তাঁরা কথা বললেই আহাজারির মতো শোনায়। কষ্টগুলোকে পাথরচাপা দিয়ে তাঁদের নিজের জন্য এবং অন্যের জন্য কাজ করতে হয়। এটি সহজ নয়।

কিন্তু নিষ্পেষণ এমন একটি বিষয় যা হাজার বছরের শ্রেণি বিভেদগুলো ভুলিয়ে দিতে পারে না। শ্রেণি বিভেদ এখানেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমনকি বেদনার ভাষাও শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। শ্রেণি বিভক্ত সমাজ সেটি ঢেকে রাখতে পারে না। সেখানে ঠুকাঠুকি অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।

একটি নবীন নারী আন্দোলনের ফিল্ডে এ অবস্থা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। প্রায় দুই যুগ আগে আমাদের দেশে তসলিমা নাসরিন সমাজের অসঙ্গতিগুলো একাই লিখতে শুরু করেছিলের। লক্ষ্য করার বিষয়, তখন কি প্রতিষ্ঠিত নারী লেখক ছিল না? অবশ্যই ছিল। তাঁরা ছিল সুবিধার গদিতে বসা পুরুষতান্ত্রিক লেখকগোষ্ঠীর একজন হয়ে ওঠার যুদ্ধে লিপ্ত। এটাকেও বলা হতো নারীর উত্তরণ।

একজন নারী একটি উপন্যাস লিখেছে। মানুষ পড়ছে এটাই ছিল বড় বিষয়। তসলিমা নাসরিন সে ‘বিড়াল আদরের’ গরগর আবেশ ভেঙে দিলো। দেখালো নারীর ব্যক্তি হয়ে ওঠার একটি আলাদা প্রয়োজনীয়তা। চারিদিকে রা রা পড়ে গেল। এই নারী একা পারেনি। কেউ পাশে দাঁড়ায়নি। একজন নারী লেখকও তাঁর পক্ষ নিয়ে একটি কথা বলেনি।

তসলিমা দেশ ছাড়ার পরে যে মেয়ের জন্ম হয়েছে সেই মেয়েরা আজ অসংখ্য। তাঁরা লিখছে। তাঁরা বেশ গুছিয়ে বলছে। নারী আন্দোলন যেখানে কেবল এনজিও দাদন আর অনুদানভিত্তিক কাজের ভেতর সীমাবদ্ধ ছিল, আজ সেখানে নারীরা তাঁদের শৃঙ্খলমুক্তির একটি আলাদা ডাইমেনশন উন্মুক্ত করে ফেলেছে। সেখানে নারীর শরীর থেকে শুরু করে সকল দিকের প্রতিপত্তি তাঁরা নিজেরাই ঘোষণা করেছে।

নারীর বিষয়টি জানতে হলে সেজন্য তার তাত্ত্বিক জানার ভিতটিও শক্ত করতে হবে। জানার কোনো বিকল্প নেই। নারীর শরীর না শিখে নারী তার শরীরের স্বাধীনতা কিভাবে বুঝবে? তাঁর শরীরের অধিকারের কথা বলতে পারবে না। তাঁর উপর চাপিয়ে দেওয়া সকল বিধানকে প্রশ্ন করতে হলে পুরুষতন্ত্রকে জানতে হবে, পড়তে হবে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, ধর্ম, আঞ্চলিক সংস্কৃতির ফোঁকরগুলো উন্মুক্ত করতে হবে। একটার সাথে আরেকটির সম্পর্ক গভীর। সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান সব বিজ্ঞানই এর সাথে সম্পর্কিত।

না জেনে প্রতিপক্ষের অসাড় এবং কুটযুক্তিকে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। একটি সুবিধাবাদকে উন্মুক্ত করা সম্ভব নয়। সে কারণে এ এরিয়াকে শিক্ষায় চৌকস করে তোলার বিকল্প নেই। এ ফিল্ডটিকে মজবুত করতে শিক্ষা ছাড়া গত্যন্তর নেই। সুশিক্ষিত এবং স্বশিক্ষিত উভয়ভাবে নারীদের দাঁড়াতে হবে। কেবল নারী নয়, পুরুষও যখন এ বিষয়ে শিক্ষিত হবে, তখন তাঁরাও বুঝবে নারীর বিপক্ষে তাঁদের যুদ্ধ অপ্রয়োজনীয়। তাঁদের যুদ্ধ ছায়ার সাথে এবং নিজেদের কায়ার সাথে। একটি দেশের পুরুষেরা যতো নারী শিক্ষায় শিক্ষিত সে দেশ ততো এগিয়ে। একটি দেশের অবস্থান কী সেটি নির্ণয় করতে হয় সে দেশের নারীর অবস্থান দেখে।

স্বতঃস্ফূর্ততা একটি মূল্যবান সম্পদ। তার পাশাপাশি শিক্ষাই নিজেদের আরও বেশি মজবুত করে। প্রত্যেকে প্রত্যেকের রিসোর্স হয়। প্রকৃত শিক্ষা ও জ্ঞান শ্রেণি অহংকার এবং বিভাজনের গান গায় না। প্রকৃত শিক্ষা তাঁকে উদার এবং বিনয়ী করে। দুর্বলতা নয়, প্রত্যেকের সবল দিক তাঁরা দেখতে পারে। সবল এবং দুর্বল দিক একত্রিত হয়ে একটি বড় কিছু গড়ে ওঠে।

বিপরীতে সেই পুরুষতন্ত্রের গর্তেই পড়তে হয়। সেটি সামনে এগুনোর নয়। হয় পেছন হাঁটা।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 186
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    186
    Shares

লেখাটি ৬৫০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.