প্রজন্ম চত্বর আমাদের হৃদস্পন্দন…

জাহানারা নূরী: মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে আজেবাজে কথা বললে বিষয়টি নিন্দার্হ…প্রজন্ম চত্বরে যারা দাবি নিয়ে অবরোধে আছেন তাদের দাবি যত যৌক্তিকই হোক না কেন তা উত্থাপনের জন্য ল্যাংগুয়েজ সোজা হওয়া চাই…যতদিন সাম্য ও সমতার বন্টন নিশ্চিত না করতে পারবে ততদিন দরিদ্র জনগোষ্ঠী, পিছিয়ে পড়া পরিবার ও বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য কোটা প্রয়োজন। কোটা তখনই আসে যখন রাষ্ট্র সমতা নিশ্চিত করতে পারে না। তবে যারা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও মেইনস্ট্রিমে আসতে পারছে না নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য বাধার কারণে – তাদের কোটার সুযোগ দিয়ে এগিয়ে নিতে চায়। দুর্নীতির কারণে এটি যার প্রাপ্য তারা পায় না। তাই বলে কোটা তুলে দেওয়ার পক্ষে নই আমি। আর তিরিশ লক্ষ শহীদও বেঁচে আছেন মুক্তিযোদ্ধা, তাদের পরিবারের মধ্যে, তাদের অবস্থা খারাপ হলে দেশ শুধূ নয় জাতি তাদের পাশে দাঁড়াবে এটি একটি স্বাভাবিক চিন্তা। আমরা জন্ম-জন্মান্তর তাদের স্মরণে রাখবো, তাদের দানের হিসেব মুছে যেতে দেবো না, এটি স্বাভাবিক চিন্তা…কোটা বন্ধ হোক যাদের আছে তাদের আরও প্রাপ্তির ক্ষেত্রে।

আর মেধাবী চত্বর মানে কি ভাই? মেধাবীরা কি প্রজন্মের মধ্যে পড়ে না প্রজন্মের বাইরে? কিসের ভিত্তিতে তারা নিজেদের মেধাবীরূপে চিহ্নিত করেছেন? পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে ? মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে কটূ কথা কোনও বুদ্ধিমান মানুষ বলতে পারে বলে ভাবতে পারি না। আশা করি এটি শুধুই রটনা…মেধা যাদের আছে তারা এমন মেধাহীনতার পরিচয় দিতেই পারেন না….তবে আমাদের প্রজন্মকে বুঝতে হবে…রাজনীতির মূলনীতির ওপর নির্ভর করে বন্টন প্রথা কেমন হবে। আপনি কোটা রাখেন কি কোটা তুলে দেন, এক বিশাল জনগোষ্ঠী দরিদ্র থাকবেই…তাদের মৌলিক অধিকারগুলো অর্জিত হবে না, যদি না সাম্য সমতার সমাজ ও রাষ্ট্র আমরা না গড়ি। আমরা যখন নিজের ভাগে কম পড়ে তখন একটি অধিকার নিয়ে সোচ্চার হই। কিন্তু গোটা সমাজটাকে পাল্টাবার দীর্ঘ মেয়াদী আন্দোলনের অংশ হতে আমাদের ভীষণ আপত্তি। শর্টকার্টে বড়লোক হওয়া আমাদের এক মহিলা পরিচালক শুনেছি একটি সিনেমা বানিয়েছেন। আমরাও শর্টকার্টে আমদের অধিকার চাই। আজ বিসিএস কোটা নিয়ে রাজপথ অধিকার করবো, চাকরি মিললে অফিসার্স ইউনিয়নে লড়বো যা খুশি নিয়ে….বৃদ্ধ বয়সে লড়বো কন্সালটেন্সির অধিকার নিয়ে…আসলে আমরা রোগের লক্ষ্মণ দূর করতে চাই…রোগটা নয়। যতবার মনে হয় মিশরে গণ আন্দোলনে রেপের খবরগুলো…যতবার মনে হয় প্রজন্ম চত্বরের ভিড়ের ভেতর পরিবার নিয়ে ঢাকার ও দূর দূরান্তের মানুষের নিঃশঙ্ক পদচারণার ছবি, যতবার মনে হয় এই প্রথম আমি এমন ভিড়ে গিয়েছে যেখানে মেয়েরা নির্ভয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে, কোনও শফির পা চাটা এককোষী প্রাণীর সাহস হয়নি ঐ চেতনার মাঝে কোনওভাবে নারীকে অপমান করে – ততবার বুঝতে পারি কেন গ্রামের একটি তরুণ বা তরুণী এখনও ঢাকা এলে শাহবাগে একবার ঘুরে আসতে যায়। প্রজন্ম চত্বর নানা প্রজন্মের তীর্থস্থান, তারা তাদের তীর্থে পা দিয়ে জনতার সম্মিলনের, লক্ষ মানুষের এক অভিন্ন বোধে উত্তরণের হৃদস্পন্দন অনুভব করতে যায়।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.