আমরা অধিকাংশই যখন সংখ্যালঘু  

সালমা লুনা: ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটা নিয়ে বেজায় আপত্তি ছিলো আমার। সংখ্যালঘু বলতে কোনো এক বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায় বোঝায় বলেই আপত্তি ছিলো। আপত্তি ছিলো কারণ তারা তাদের সংখ্যালঘু পরিচয় নিয়ে ভয় পায়, গুটিয়ে থাকে! কেন গলা তুলে এতোটুকু আওয়াজ পর্যন্ত দেয় না! তারা কেন ঘর ছাড়ে, ভিটে ছাড়ে, দেশ ছাড়ে? কেন তারা গুমরে মরে? প্রতিবাদ নেই কেন তাদের কণ্ঠে?

Salma Luna“স্বাধীন” বাংলাদেশে সবাই ভালো আছে , মিলেমিশে আছে তবু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাকে পাত্তা দিতে কেন তাঁরা চুপিসারে কোনো ভিনদেশের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকত্বের জন্য হন্যে হয়ে ঘোরে? কেন সবকিছু থেকে প্রবল অভিমানে আলগোছে নিজেকে সরিয়ে নেয়!

সম্ভবত নিজেকে প্রবোধ দিতেই এই আপত্তি করে এসেছি এতোকাল! উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে ভালো থাকতে চেয়েছি। আজ আমিও যখন সংখ্যালঘু, তখন বুঝতে পারি অত সহজ নয় নিজেকে সংখ্যালঘু বলে সবকিছু থেকে আলগোছে সরিয়ে নেয়া। বড় বেশি লাগে কোথাও!

খুব লাগে যখন কোন বন্ধু বলেন, এবারের পূজোতে কী যে হবে ভগবান জানেন! লাগে তখন, যখন কোনো বন্ধু বলেন, আমাদের সব চার্চে হুমকি গেছে। যত যাই হোক আমরা তো মাইনরিটি প্রবলেমে আছিই ! খুব সাবধানে চলছি আজকাল! শুনে চোখ তুলতে লজ্জা হয়। নি:শ্বাস ভারি হয়ে আসে।

বুকের পাশে চিনচিন করে কেউ যখন বলেন, ভাবী আমার যদি সামর্থ্য থাকতো, আমার সব কয়টা ছেলেমেয়েকে বাইরে পাঠিয়ে দিতাম। মুসলমান হয়েই বড় অন্যায় হলো! পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে সুযোগ না পেলে প্রাইভেট ভার্সিটিতে দিতেই হবে। আর ওগুলো তো জঙ্গিদের টার্গেট। ওদিকে আছে গুম-খুন-জঙ্গি সন্দেহে ধরপাকড় …কীভাবে বাঁচাবো ওদের! চলেন সবাই মিলে অ্যাপ্লাই করি কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্বের জন্য!

আজ অমুক চলে গেছে। তমুক গিয়ে আর আসেনি। প্রতিদিন শুনছি অমুকের তো হয়ে গেলো!

জিজ্ঞাসা করি, কী হলো?

ভিসা। পাঁচ বছরের! গিয়ে বাচ্চাদের ভর্তি করে দেবে। তারপর থাকতে থাকতে একটা ব্যবস্থা ……!

আমি ছবিতে দেখেছি। সিনেমায় দেখেছি। ওই যে গানটা… বিখ্যাত যশোর রোড! ওতেও দেখেছি, পিলপিল করে মানুষ যাচ্ছে। যাচ্ছে তো না – পালাচ্ছে।

দেশে ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে। হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর আক্রমণ আর অত্যাচারে দলে দলে জীর্ণ-শীর্ণ গরীব মানুষগুলো ঊর্দ্ধশ্বাসে দৌড়ে পালাচ্ছে। চোখে-মুখে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা, জীবনটা হাতে নিয়ে, মা-বাবা সন্তানের হাত হাতে নিয়ে, সহায়-সম্বল যা কিছুই – একটা দুটো পোটলাতে বেঁধে পালাচ্ছে পাশের দেশে- আশ্রয়ের জন্য।

আমি মনোশ্চক্ষে ওই দৃশ্যটাই দেখতে পাচ্ছি যেন।

তফাৎ শুধু এটুকুই যে এবার সুবেশী অবস্থাপন্ন মানুষগুলো সন্তানদের হাত ধরে পালাচ্ছে। নিরাপদ সুখী নিশ্চিন্ত উন্নত জীবনের জন্য।

আজ দেশে কোন যুদ্ধ নেই। আক্রমণ করেনি কোন ভিনদেশী শত্রু। কোনো হানাদার হায়েনা বাহিনী আসেনি রক্তাক্ত করতে বাংলাদেশের মাটি। তবুও মানুষগুলো পালাচ্ছে। কেন জানেন?

এই মানুষগুলোও সংখ্যালঘু আজ। আমিও! আপনিও। আমরা সবাই।

শান্তিপ্রিয়, নিরীহ, সাধারণ সব মানুষ আজ সংখ্যালঘু। যারা ক্ষমতাবানদের সাথে দহরম মহরম করতে পারে না, কালো টাকার পাহাড়ের স্বপ্ন দেখে না, রাজনীতির নামে প্রতারণা বুঝতে পারে, তারাই সংখ্যালঘু।

আর যাদের চোখের উপর পর্দা নেই , ন্যায়-নীতি সততার বালাই নেই, দেশের প্রতি বিন্দুমাত্র মায়া নেই …. এমন অনেক নেই-অলারা আজ সংখ্যাগুরু হয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সোনার বাংলায়।

আমি নিজেও আজ সংখ্যালঘুর দলে। আমি আজ বুঝতে পারি সংখ্যালঘুরা কেন অভিমান নিয়ে নিজেদের গুটিয়ে রাখে। আমি বুঝতে পারি কী যন্ত্রণা বুকের পাঁজর ভেঙে দেয়। আমি সব বুঝি, কারণ এখন আমি অশুভ শক্তির কাছে পরাজিত প্রতিবাদহীন এক সংখ্যালঘু!

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.