সমস্যাটা কি হ্যাপির? নাকি পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির?

We-can-do-itফাতেমা শুভ্রা: ধরুন মেয়েটার নাম হেমা, আর ছেলেটির নাম তমাল। প্রেম হলো, মানে দুজন দুজনকে পছন্দ করলো। হেমা মেয়েটা সামাজিক অর্থে “সুন্দরী” নন, সে দেখতে সামাজিক অর্থে “শেপড” নন, ছেলেটি সুদর্শন। কয়েকটা বাস্তবতা ঘটে:

১. তমালের বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় পরিজন যারাই প্রেমের কথা জানছেন তারা এই মর্মে সত্যায়িত করছেন যে হেমা তমালের যোগ্য নন। ফলে তমাল প্রেম করতে পারেন বিয়ে করতে চাওয়া বোকামি কিংবা টাইম পাস করবার জন্য প্রেম করতে পারেন কিংবা তমাল একটা চান্স নিচ্ছে কারণ হেমার মতো মেয়েরা যেহেতু সামাজিকভাবে অতো চাহিদাসম্পন্ন নন; ফলে হেমার মতো মেয়েরা সহজলভ্য, সহজলভ্যকে একটু চেখে দেখা যাক।

এই প্রত্যেকটি বাস্তবতা একাধিক মেয়ের সাথে ঘটে এবং প্রেমিক হিসেবে একসময় স্বীকৃত পুরুষ ঐ মেয়েটিকেই আরো কয়েকধনের কথা বলতে পারেন, যেমন ধরেন:

ক. “তোমাকে বিয়ে করবো কেন? তুমি তো আমার টাইপ না”।
(এখন প্রশ্ন হলো, টাইপ টা কি? টাইপ হলো হেমা যেহেতু ভালবেসে শুয়েছে ফলে এই মেয়ে “কুমারী” বা ঠিক ঐ অর্থে রিজার্ভ নন, বউ হওয়ার মতো কাঙ্খিত নন।)
খ. আমার পরিবার তোমাকে মেনে নিবে না
গ. আমি তো প্রতিশ্রুতি দেই নাই যে বিয়ে করবো
ঘ. প্রতিশ্রুতি দিছিলাম, এখন ভাল লাগছে না।

২. তমাল বিয়ে করতে পারেন, কিন্তু তার আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধবের মনেই হতো পারে যে ডিশেপড হেমা তমালকে ডিজার্ভ করে না। এই সামাজিক চাপ ভয়ংকর রকম করে প্রেমের কিংবা প্রেমময় বৈবাহিক সম্পর্কের উপর পতিত হয় এমনকি না চাইতেও।

৩. তমাল যদি মানুষ হিসেবে খুব ভাল হয়ে থাকেন, তবে তিনি এই সামাজিক কথোপকথনের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন এবং আক্ষরিকভাবে তমাল হেমা দম্পতি জীবনের একটি বড় সময় কাটবে ”মানুষ কী তাদের দুজনকে যথার্থ ভাবছে কি ভাবছে না”- এই সংকট উত্তোরণের জন্য কাজ করতে করতে উনারা নিজেদের জীবনের একটি বড় অংশ ব্যয় করতে থাকবেন। [অসীম মনের জোর থাকা মানুষ এইসবকে উড়িয়ে দিতে পারে সে নিশ্চিত]

যেহেতু সামাজিকভাবে আমি খুব সমাজ কাঙ্খিত সৌন্দর্য্যের আধার ছিলাম না কখনো এই অভিজ্ঞতাগুলো কমবেশী আমার চেনা। প্রেম, বিয়ে, বিয়ে করবার আকাঙ্খা কিংবা প্রতিশ্রুতি বিহীন প্রেম করতে চাওয়ার কাঙ্খা কোনটার মধ্যেই আমি সমাজ সংস্কৃতির অনুপস্থিতি টের পাইনি।

রুবেল এবং হ্যাপির ঘটনা নিয়ে অনেক কথাবার্তা চলছে, গতদিন দেখলাম প্রথম আলোতে খবর এসছে যে শিক্ষিকা ছাত্রের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনেছেন। আমি এই প্রত্যেকটি সংবাদকে সাধুবাদ জানাই।

প্রশ্ন উঠতে পারে কেন সাধুবাদ জানাই…

ধর্ষণের একটা মিথ আমাদের মধ্যে বিরাজমান। নৃশংসভাবে ধর্ষণ করা হয়। কিন্তু ধর্ষণ নৃশংস হয় কেবল তার জৈবিক কর্মকাণ্ডের জন্য নয় বরং মানসিক কারণে, অসম্মতির মাধ্যমেও ধর্ষণ সহিংসতর হয়ে উঠতে পারে। আমাদের সমাজে বিবাহের মধ্যে ধর্ষণের ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়। বিবাহ সম্পর্কের মধ্যে ধর্ষণ কি- এটা জিজ্ঞেস করলেও পাবলিক বোঝাপড়া নৃশংস ধর্ষণের কথাই জানান দিবে। ধর্ষণের ধারণা গ্রোথিত থাকে একটি নির্দিষ্ট মুহুর্তের যাতে মনে করা হয় ধরে নেওয়া হয় ধর্ষণ হয় ঐ মুহুর্তের অসম্মতির সাপেক্ষে। ঐ মুহুর্তের অসম্মতি না থাকলে, পরবর্তীতে সে সম্মতি যে শর্তসাপেক্ষে অসম্মতি হতে পারে- এটা আসলে সামাজিক ধ্যানধারণা স্বীকৃতি দেয় না।

হ্যাপি রুবেলের সাথে কথোপকথন বাজারে ছেড়ে দিচ্ছে, এজন্য মানুষ ব্যক্তিগত বিষয় জেনে যাচ্ছে- এটা ব্যক্তিগত কথনের বাজারীকরণ; কিন্তু সবই তো বিকোয়, ব্যক্তিগত বিকোবে সেটাতে কেন এতো সমস্যা? কারণ আমরা ব্যক্তিগতকে রাজনৈতিক বললেও এর সাথে নৈতিকতাকে যুক্ত করি, ভাল মন্দের বিচারকে সম্পর্কিত করি।

রাজীব প্রভার ভিডিও আর হ্যাপি রুবেলের কথোপকথনের মধ্যে মিল যেমন আছে ঠিক তেমনি অমিলও আছে। আমাদের সমাজে নারী পুরুষ উভয়ই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রতারণার মধ্যে পড়তে পারেন। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রতারণা উভয়ের জন্য থাকলেও এর শাস্তি কিন্তু জেন্ডারড। কীভাবে?

কোন নারী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে তার শাস্তি হবে ব্যক্তিগত, মামলার নয়; যেমন তাকে বেশ্যা বা মন্দ নারী উপাখ্যান দেওয়াটা হচ্ছে কাজের। কারণ আমাদের সমাজে যে নারী ‘ভাল না’ সে কিন্তু জেলে থাকে না সে থাকে বেশ্যালয়ে। অন্যদিকে পুরুষ মন্দ হয় কারাগারে গেলে, ফলে পুরুষের শাস্তি পাবলিক, বাইরের, কারাগারের।

একটি মামলাধীন বিষয়, হ্যাপি ‍রুবেলের অসম্মতির ধর্ষণ, তার বিচারিক প্রমাণ হিসেবে থাকবার কথা ফোনের কথোপকথন। বিচারাধীন সে কথোপকথন কেন মিডিয়া প্রচার করছে সে নিয়ে বিচারালয় স্বয়ং গণমাধ্যমকে জবাবদিহিতার সামনে দাঁড় করাতে পারেন কিন্তু এই কথোপকথন প্রকাশের মাধ্যমে হ্যাপির অভিযোগ লঘু হয় না।

রাজীব যদি বাগদানের প্রতিশ্র্রুতি ভাঙ্গবার জন্য প্রভার ভিডিও টিউবে না ছেড়ে মামলা করতেন, তাকে আমি স্যালুট জানাতাম। আমাদের সমাজ ব্যবস্থাটা এমন যে, রাজীবের সেক্স ভিডিও বাজারে আসবার পর দর্শক কুল এ মর্মে সাব্যস্ত হয়েছে যে প্রভা “খুবই যৌন সক্রিয় এবং মন্দ” রাজীব প্রভাকে ভালবাসতো আর একারণেই প্রভার ভিডিও ‘খেপে গিয়ে বাজারে ছেড়েছে’ [ভিকটিম ব্লেইমিং]। অন্যদিকে হ্যাপির বেলায় বিষয়টা এমন দাঁড়িয়েছে যে হ্যাপির মতো মেয়েরা “রুবেলের মতো ভাল ছেলেদের ফাঁদে ফেলানোর জন্য” ফোন রেকর্ড করে আসলে এখানে কোন ভালবাসা নেই [ফোনালাপ প্রচারের সাপেক্ষে রুবেল এখানে ভিকটিম যদি হয়ে থাকেন তবে তাকে ব্লেইম করা হচ্ছে না; আবার ধর্ষণ মামলার সাপেক্ষে হ্যাপি এখানে ভিকটিম হিসেবে ব্লেইমড হচ্ছেন!]।

পুরুষেরও ধর্ষণ হয় এই ধারণা পুরুষালী সমাজ প্রকাশ করতে চায় না। প্রতারণার মামলা, পুরুষের ধর্ষণ ধারণা আমাদের সমাজে নেই সেসব নিয়ে কথা হোক। পুরুষ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হওয়ায় মামলা করুক, ভিডিও না ছাড়ুক। নারী্ও পুরুষালী অস্ত্র ব্যবহার না করুন। ধর্ষণের সীমানাকে একটি সারসত্ত্বাবাদী ভাবনা থেকে বের করে আনবার জন্য হ্যাপি কিংবা অভিযোগকারিণী শিক্ষিকাকে আমার তরফ থেকে অভিনন্দন।

কিন্তু একটা কথা না বলেই পারছি না, নারী হিসেবে আমি আমার ইত্যকার জীবনে একটা জিনিসই বিশ্বাস করে এসেছি “যে পুরুষের আমার মতো নারীকে গ্রহণ করবার মতো মেরুদন্ড নাই, তার দণ্ড আমার দরকার নাই”।

জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক

(লেখকের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে)

ফাতেমা শুভ্রা
শিক্ষক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.