রোজ নামচা-৩২: বুনো রাজহংসী

women hood 2লীনা হাসিনা হক: আমি এই প্রথম উগান্ডা এসেছি। রাজধানী কাম্পালাতে আমাদের অফিস আছে। উগান্ডা ম্যানেজমেন্ট ইন্সটিটিউটের একটি আন্তর্জাতিক কোর্সে ফ্যাসিলিটেটর হিসাবে আমাকে ডেকেছে। আমায় থাকতে হবে ১০ দিনের মতন।

ঢাকা থেকে দুবাই হয়ে এনটেবে। মোট দশ ঘণ্টার ফ্লাইট টাইম, ঢাকা থেকে দুবাই সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা আর দুবাই থেকে এনটেবে সাড়ে চার ঘণ্টা। কিন্তু ট্রান্সফার টাইম সাত ঘণ্টা, ডিলেড ফ্লাইটএর কারনে আরও দুই ঘণ্টা মোট নয় ঘণ্টা। সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে সতের ঘণ্টার ভ্রমন সময় ঠেকল গিয়ে ২২ ঘণ্টায়। এনটেবে এয়ারপোর্টে এবোলা পরীক্ষার জন্য বিশাল লাইনে লাগলো এক ঘণ্টা, ভিসা নিতে আধা ঘণ্টা, তারপরে শহরের হোটেলে পৌছুতে আরও দেড় ঘণ্টা!

হোটেলে চেক ইন করে কোনরকমে রুমে ঢুকেই এক ঘুম। পরদিন সকালে মোটামুটি ফ্রেশ হয়েই ঘুম থেকে উঠলাম। উগান্ডার সাথে আমাদের তিন ঘণ্টার সময়ের পার্থক্য। বাংলাদেশ তিন ঘণ্টা এগিয়ে আছে। গাড়ী নিতে আসবে সকাল আটটা পঁয়তাল্লিশে। পেটে দুদিনের খিদে নিয়ে আমি তৈরি হয়ে ব্রেকফাস্টের জন্য রেস্তোরাঁর দিকে এগোলাম যখন তখন মোটে বাজে সকাল সাতটা। এই হোটেলে লিফট নাই। সিঁড়ি দিয়ে নেমে লবি পার হয়ে রেস্তোরাঁ। লবিতে পা দিয়েই ধপাস! এই মাত্রই সাবান পানি দিয়ে পরিষ্কার করে গেছে, পুরোপুরি শুকায় নাই! মিনিট খানেকের জন্য মনে হল পাতালে চলে যাচ্ছি নাকি! নাহ, হোটেলের রিসেপশনিসট বিশাল দেহী ছেলেটি আর একজন হোটেল নিবাসী চোখের পলকে ধরে ফেললেন আমার মাথা সিঁড়িতে আছড়ে পড়ার আগেই। মাথা ফাটেনি, হাত ভাঙ্গেনি, চশমাও অক্ষত আছে, শুধু বাম পাটা আর সোজা করতে পারছি না।

হোটেল থেকেই অফিসে ফোন করলো, হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হল, পা এক্সরে করা হল, তেমন কিছু নয়, বাম পা’টি আগে থেকেই একটু আহত ছিল, সেই ব্যাথার উপরেই আবার ব্যাথা। ব্যান্ডেজ বেঁধে হসপিটালের বিছানায় শুইয়ে রাখা হল দিন দুয়েক। এসেছি মোট ১০ দিনের কাজে, তিনদিন গেল এমনেই। কপাল! অবশ্য চিকিৎসা খরচ ইন্সুরেন্স কোম্পানি আর অফিসের ঘাড়ে বলে শুয়ে থাকাটা ওতটা মন্দও হল না!

যাই হোক, লেংচে লেংচে কাজ শুরু করলাম। হোটেল থেকে ক্লাসে আসি, ক্লাস থেকে হোটেলে ফিরে যাই। কোন ঘোরাঘুরি করার উপায় নাই। সপ্তাহের শেষে উগান্ডা ম্যানেজমেন্ট ইন্সটিটিউট আয়োজন করেছে সোশ্যাল ডিনার। আমাকে যে হোটেলে রাখা হয়েছে সেখানেই ব্যবস্থা করা হয়েছে এই অনুষ্ঠান। উগান্ডা ঐতিহ্যের নাচ গানের ব্যবস্থাও আছে।

অনুষ্ঠানে যাওয়ার খুব একটা ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু আমার পায়ের ব্যথার কারণেই অন্য জায়গায় আয়োজন না করে এখানে করা হয়েছে, তাই ভাবলাম, অল্প সময়ের জন্য গিয়ে চলে আসব।

বিশাল আয়োজন, ইউএমআই এর ফ্যাকাল্টি, ছাত্র, বেশ কিছু আমলা, আন্তর্জাতিক সংস্থা, স্থানীয় এনজিও, ডেনিশ এম্বাসি, সবাই এসেছেন। আহারের চাইতে পানের দিকেই লোকের আগ্রহ বেশী দেখা গেল। অবশ্য আফ্রিকানরা খেতেও ভালবাসে।

খাওয়ার মধ্যেই শুরু হল গান। উগান্ডান, সোয়াহিলি, ইংরেজি এবং অবধারিত দু একটা হিন্দি গান। তারপরে নাচ। আফ্রিকান নাচিয়েদের শরীরে হাড় নাই, এমন ভাবে তারা শরীরকে বিভিন্ন ভঙ্গীতে নিতে পারে, অবাক হয়ে তাকিয়ে রই। মোহনীয় এই নাচ ছেড়ে তাড়াতাড়ি আর যাওয়া হল না।

নাচিয়ে মেয়েদের মধ্যে লক্ষ্য করলাম একটি মেয়ের বয়স অন্যদের তুলনায় একটু বেশী, অন্যদের যদি বিশের কোঠায় হয়, এই মেয়েটির বয়স ত্রিশের উপরে তো বটেই। শেষ নাচটিতে এই মেয়েটিই মধ্যমনি। নাচের নাম ‘ বুনো রাজহংসী’।  কি যে তার শরীরের ঘূর্ণি, চোখের পলক পড়ে না দর্শকদের। প্রায় চল্লিশ মিনিটের সেই নাচ, শেষ হওয়ার পরও থামে না হাততালি ।

সব নাচিয়েরা একসাথে দাঁড়িয়ে হাতে হাত ধরে কোমর বাঁকিয়ে অভিবাদন জানালো সবাইকে। আমার কেন যেন মনে হল মেয়েটি একটু অসুস্থ বা কে জানে নেচে নেচে ক্লান্ত হয়েছে হয়তো, দাঁড়াতেও কষ্ট হচ্ছিলো তার। মেয়েটি সম্পর্কে জানার কৌতূহল মনে চেপে রেখেই ফিরে আসছি। অনুষ্ঠান হয়েছে বাগানে, সিঁড়ি দিয়ে হোটেলের ভেতরে যাওয়ার রাস্তা। সিঁড়ির নীচে নাচিয়েরা কাপড় বদলাচ্ছে, গোছাচ্ছে।

দেখি সেই মেয়েটি, এক কোনায় বসে বমি করছে। কি মনে হল, গেলাম তার কাছে, আমার হাতের জলের বোতল এগিয়ে দিলাম। প্রথমে মানা করলেও সে নিল জল। একটু স্থির হতে জানতে চাইলাম তার নাম- ভিভিয়ান। শরীর খারাপ নিয়ে কেন নাচছে জানতে চাইলে হাসলো সে। সিঁড়ির উপরের হালকা আলো অদ্ভুত এক আলো ছায়ার সৃষ্টি করেছে। সেই আলোয় রহস্যময় লাগলো তার হাসি। সে পা বাড়াল সাথীদের দিকে, আমি ব্যাগ থেকে একটা চকলেট বের করে বললাম এটা ছোট্ট উপহার আমার তরফ থেকে। নিলো সে। হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়ালাম। শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে তার।

মনের মধ্যে কি জানি খিঁচ খিঁচ করতে থাকল। রাতে ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলাম মেয়েটিকে, নাচতে নাচতে সে যেন সত্যি রাজহংসীতে পরিণত হয়ে গেছে।

পরদিন সকালে ইউএমআই এর কলিগকে জিজ্ঞ্যেস করলাম নাচিয়েদের কথা। জানালো, হোটেল থেকে আয়োজন করা করা হয়েছিল। বিকেলে ফিরে গিয়ে হোটেলের রিসেপশনে জিজ্ঞ্যেস করলাম। তারা আবার ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থার মাধ্যমে করে ইত্যাদি। তবু আমার এত আগ্রহ দেখে বলল, তারা চেষ্টা করবে ভিভিয়ানের সাথে আমার যোগাযোগ করিয়ে দিতে।

যদিও প্রবাদ হল ‘নো হারি ইন আফ্রিকা’ কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে শনিবার বিকেলে একটা ফোন নম্বর আমায় দিয়ে বলা হল, এই নম্বরে ফোন করলে ভিভিয়ানের সাথে কথা বলতে পারব। দেরী না করে সাথে সাথে কল করলাম। প্রথমবারে বিজি টোন, পরের বারে রিং হল, ভিভিয়ানই ধরেছে ফোন। পরিচয় দিয়ে বললাম কথা বলতে পারি কিনা। চিনল, জানালো, আজ সে বিজি, একটা প্রোগ্রাম আছে, আগামীকাল সে আসবে আমার হোটেলে ঠিক পাঁচটায়।

আজ ভিভিয়ানকে চেনাই যাচ্ছে না। উগান্ডা বাটিকের একটি ঐতিহ্যবাহী লম্বা পোশাক পড়েছে সে, মাথার চুল ছোট ছোট, সেদিনের সেই ঝাঁকড়া বেনী করা চুল নয়। একটি সস্তা চাইনিজ হাত ব্যাগ। পায়ে দু ফিতের স্যান্ডেল। একদম সাধারণ একটি মেয়ে। তার চোখ দুটো আসলেই পটল চেরা আর তার বাঁকানো চোখের পাতা- আঁখি পল্লব হয়তো একেই বলে শুধু চোখগুলো একটু বেশীই হলুদ।

হোটেলের বাগানে চেয়ার টেবিল পাতা আছে। বসলাম সেখানে। জানতে চাইলাম কি খাবে? চা-কফি নয়, সে এক গ্লাস তরমুজের জুস খেতে পারে। আমি তবু কিছু খাবার অর্ডার করলাম।

কি জানতে চাও? আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, দেখ, সেদিন আমার মনে হয়েছিল অন্য নাচিয়েদের তুলনায় তুমি একটু বয়সী আর একটু অসুস্থও ছিলে। কিন্তু তোমার নাচের তুলনা নাই। কিভাবে নাচের দলে এলে ইত্যাদি জানতে চাই।  জেনে কি করবে? কিছু না ভিভিয়ান, শুধু জানতে ইচ্ছে করছে, তুমি না চাইলে বোলো না, তার হাত ছুঁলাম, আজো গা গরম,  তার গায়ে জ্বর, আমি সিওর। চুপ থাকে কিছু সময়।

জুস আর স্ন্যাক্স আসে, লাল রঙের তরমুজের জুস আসে বাহারী গ্লাসে, লেবুর টুকরো দিয়ে সাজানো। জুসের গ্লাস এগিয়ে দেই তার দিকে। ধন্যবাদ বলে ছোট্ট চুমুক দেয় সে, চোখ নাচিয়ে জানায়, সত্যিই ভালো জুসটা। আমার নিজের কাপে চা ঢালি।

কাম্পালা মাসাকা রোডের ধারে যেখানে বিষুবরেখা ছুঁয়ে গেছে পৃথিবীকে দু ভাগ করে সেখান থেকে আরও প্রায় সত্তর কিলোমিটার ভেতরে তার গ্রাম।  নাচিয়ে হিসাবে নাম ছিল ভিভিয়ানের। উৎসবে পার্বণে স্কুল কি গ্রামের নাচের অনুষ্ঠানের মধ্যমনি ছিল ভিভিয়ান। ছেলের দল তার সাথে ভাব করার জন্য ব্যাকুল ছিল। এমনকি গ্রাম  প্রধানের ছেলে বিয়ের প্রস্তাবও দিয়েছিল। ভিভিয়ানের হৃদয় যে বাঁধা পড়েছে ভিন্ন গোত্রের তরুণের কাছে। চোখে স্বপ্ন নিয়ে হাই স্কুল শেষ করে কাজের খোঁজে কাম্পালা চলে এলো ভিভিয়ান, সাথে বয়ফ্রেন্ড, স্কুলে তার উপরের ক্লাসে পড়তো। দুজনে ভিন্ন গোত্র হওয়ার কারণে বাড়ী থেকে পালিয়ে আসতে হয়েছে তাদের। কাম্পালা এসে সে একটি হোটেলে কাজ নিয়েছিল, বয়ফ্রেন্ডটি ইংরেজী ভালো বলতো, তাতে একটি হোটেলের ট্যুর গাইড হিসাবে কাজ পেলো।

ভালই চলছিল। বছরখানেক বাদে বিয়েও করে ফেললো তারা। বিয়ে করতে নিজেদের গ্রামে গিয়েছিল তারা, ততদিনে সবাই তাদের মেনে নিয়েছে। বিয়েতে অনেক আনন্দ হয়েছিল। সাদা গাউন আর ব্যাক স্যুটে তাদেরকে অপূর্ব লাগছিল। ভিভিয়ানের চোখ দূরের ফুলগাছে কিন্তু চোখের তারায় ভেসে যাওয়া সেই সব দিনের আনন্দাভাস খেলে যায়।

ছেলে হল তাদের। চাকরীতেও উন্নতি। ভালো আছে তারা। খুব ভালো। ট্যুর গাইড হিসাবে আইভানের সুনাম হচ্ছে খুব। এর মধ্যে অন্য আরও দু’একজন বন্ধু মিলে আইভান নিজেদের ট্যুর কোম্পানি চালু করার জন্য চিন্তা ভাবনা শুরু করলো। খুলেও ফেললো একদিন। ভিভিয়ানকে স্বপ্ন দেখাল, ঠিক মতন চালাতে পারলে তারা  কাম্পালাতে না হোক, কাম্পালার শহরতলীতে একটি বাড়ী বানাতে পারবে। নিয়মিত একবার প্রার্থনা করা আর প্রতি রবিবারে চার্চে যাওয়া ভিভিয়ানের জেসাস কি তখন হেসেছিলেন উপর থেকে!

ভালই রোজগার হচ্ছে আইভানের। সচ্ছলতা এসেছে। ঘরে টিভি, ফ্রিজ, আরও নানাবিধ সরঞ্জাম এসেছে। ভিভিয়ানের দ্বিতীয় সন্তান পেটে। আইভানের মধ্যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে। দেরীতে বাড়ী ফেরা, উইকএন্ডে ঘরে না থাকা, খাবার খাওয়া কমে গেছে, কথা বলাও কমে যাচ্ছে। আইভানদের ট্যুর কোম্পানি, বিদেশী পর্যটকদের উগান্ডার বিভিন্ন জায়গা ঘুরিয়ে দেখানোর সাথে সাথে তারা বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী আফ্রিকান হ্যান্ডিক্রাফট এর দোকানের সাথেও সমঝোতায় এসে পর্যটকদের সেখানে কেনাকাটার জন্য নিয়ে যায়। এবং বলাই বাহুল্য কিছু পর্যটক নারী নেশার আস্বাদও নিতে আগ্রহী।

আইভান সেই সব রসদের জোগান দিতে দিতে নিজেও জড়িয়ে পরে নেশাতে। পতনের শুরু তখন থেকেই।  এক পর্যায়ে আইভান আর কাজ করার মতন শারীরিক সুস্থতায় আর থাকে না। ভিভিয়ানকেই সংসার সামলাতে হয়। খুব বেশী অসুস্থ হয়ে পড়াতে আইভানকে ডাক্তারের কাছে নেয়া হলে জানা গেলো তার এইচআইভি পজিটিভ, সেইসাথে লিভার সিরোসিস হয়েছে। আইভান মারা গেলো ছয় মাসের মধ্যেই।  ভিভিয়ানের বয়স তখন সাতাশ আর ছেলেদের বয়স যথাক্রমে নয় আর সাত।

হোটেলের চাকরিতে পোষায় না, নাচিয়ে হিসাবে সুনাম থাকায় যে হোটেলে কাজ করতো সেখানকার একজন প্রস্তাব দিলো নাচের দলে নাম লেখাতে। প্রথম প্রথম হোটেলের চাকরির পাশে পাশে দু একটা অনুষ্ঠানে নাচতে যেতো সে বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে। নাচের দলের ম্যানেজার বলল, ভিভিয়ান যদি পুরোপুরি দলে যোগ দেয় তাহলে তার মাইনে বাড়িয়ে দেয়া হবে আর টিপস পাবে অনেক। চাকরি ছাড়ল ভিভিয়ান। টাকার দরকার তার। মাস শেষে ঘর ভাড়া, খাওয়া, ছেলেদের স্কুল, নিজের খরচ সব তার একার কাঁধে। এক মাসের ঘর ভাড়া বাকী। বাড়ীঅলা যেকোনো সময় উঠিয়ে দিবে।

এর মাঝে একদল বিদেশী পর্যটকের মনোরঞ্জনের জন্য অনুষ্ঠান শেষে ম্যানেজার জানালো, ভিভিয়ান যদি কয়েক ঘণ্টা একজন বিদেশী পুরুষ পর্যটকের সাথে সময় কাটায় তাহলে সে এক লাখ চল্লিশ হাজার উগান্ডান শিলিং (পঞ্চাশ আমেরিকান ডলার) পাবে, আর খাওয়া-দাওয়া তো আছেই। মুহূর্তে থমকে গেলো ভিভিয়ানের পৃথিবী, যেন বিষুবরেখা পৃথিবীকে নয়, ভিভিয়ানকেই দ্বিখণ্ডিত করে ফেললো।

রাজী হল ভিভিয়ান। পঞ্চাশ ডলারে সে আজই বাকী পরা ঘর ভাড়া শোধ করতে পারবে, ছেলেদের ভালো খাবার খাওয়াতে পারবে, ছেলেদের জন্য কাপড় জুতো কিনতে পারবে। ছোট ছেলেটি ছেঁড়া জুতো পড়ে স্কুলে যেতে চায় না।

সেই থেকে শুরু। আজ প্রায় পাঁচ বছর ধরে ভিভিয়ানের আত্মা দুই টুকরো-তিন টুকরো হয়ে এখন আর কোনও খণ্ড অবশিষ্টই নাই, চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে।

গত বেশ কিছুদিন থেকে তার শরীর ভালো যাচ্ছে না। ঘুসঘুসে জ্বরটা যাচ্ছেই না। সে ডাক্তারের কাছে গেলো। পরীক্ষা শেষে ডাক্তার তাকে ‘টাসো’ নামের সংস্থায় যোগাযোগ করতে বলল। ‘টাসো’ র নাম শুনেই ভিভিয়ান বুঝে গেলো তার শরীরে বাসা বেঁধেছে মরনব্যাধি। টাসো – এইচআইভি আক্রান্তদের নিয়ে কাজ করে।

ভিভিয়ানের চিকিৎসা শুরু হল। এইচআইভি পজিটিভ। চিকিৎসা ঠিকমতো চালালে আর নিয়মমাফিক খাওয়া-দাওয়া আর জীবন যাপন করলে আরও পাঁচ কি সাত বছর কি আরও বেশী বেঁচে থাকবে ভিভিয়ান।

জিজ্ঞ্যেস করলাম, ইচ্ছে করলে সে তো আরেকটি বিয়ে করতে পারতো। এটা তো সম্ভব ছিল, জীবন হয়তো অন্যরকম হতো তাহলে। তা হয়তো সম্ভব ছিল, কিন্তু আমার ছেলেদের অসুবিধা হতে পারতো। আর শরীরের বিকিকিনি আমি করেছি সত্য, কিন্তু বিয়ে করতে হলে যে মনও দিতে হয়। আমি যে আইভানকে কথা দিয়েছিলাম, মাই হার্ট ইজ অল ওয়েজ ইওরস কমপ্লিটলি ফর এভার আনটিল দি এন্ড!

বোকার মতন বসে থাকি কিছুক্ষণ, মুখে কথা যোগায় না। একটু পরে আবার জানতে চাই,  আচ্ছা না হয় বিয়ে নাই-ই করলে, কিন্তু সুরক্ষার কথাও কি  জানতে না? জানালো, সে জানে আর রাখেও নিজের কাছে। কিন্তু কোনও কোনও পর্যটক কনডম ব্যবহার না করার শর্তে বেশী টাকা দেয়।  জানতে চাই কত বেশী টাকার কারণে সে এই ঝুঁকি নিলো। ভিভিয়ান সাধারণত আশি ডলার থেকে একশ ডলার নিয়ে থাকতো। কারণ শরীর ছাড়াও সে নাচও করতো প্রাইভেটলি। সেইসব ক্ষেত্রে সে এমনকি দুইশ থেকে চারশো ডলার পর্যন্ত একবারে রোজগার করেছে। কার কাছ থেকে এসেছে এই মরণ ব্যাধি তা  সে জানে না, আর আইভানই যে এই রোগ উপহার দিয়ে যায় নাই তাও তো সে জানে না।

শেষের দিকে আইভান মারাত্মক রকম হেরোইন মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছিল। ভিভিয়ান মনে করে এটা তার ভাগ্যে ছিল। জানে সময় কমে আসছে তার। ছেলেদের জন্য কিছু করে যেতে হবে। ছেলেরা বড় হয়েছে, ক্লাস নাইনে আর একজন ক্লাস সিক্সে। ভিভিয়ান অসুখের পরিণতি জানে বলে ভবিষ্যতের কথা কিছুটা ভেবেছে। কিছু টাকা সে ছেলেদের জন্য আলাদা করে ব্যাংকে রেখেছে। আর মাত্র পাঁচটা বছর সুস্থ বাঁচতে চায় সে। ছোট ছেলেটা এখনও অনেক আবদেরে। ওর যে আরও কিছুদিন সময় লাগবে মায়ের বুকের ওম থেকে খরতপ্ত পৃথিবীতে অভ্যস্ত হতে। সেই সময়টুকু ঈশ্বর নিশ্চয়ই দেবেন তাকে।

বড় ছেলে স্কুল পাশ করলে তাকে টেকনিক্যাল স্কুলে ভর্তি করবে। ছোটটি বড় হতে হতে হয়তো সে বেঁচে থাকবে না। কিন্তু আশা করে ছোট ছেলেটিও কিছু একটা করতে পারবে জীবনে। ছেলেরা জানে মায়ের অসুস্থতার কথা। এটাও জানে তাদেরকে খাওয়ানো পড়ানোর জন্যই মা নিজেকে শেষ করে ফেলেছে। ভিভিয়ান চার্চের ফাদারের সাথে কথা বলে রেখেছে তার মৃত্যুর পরে তার দাফন যেন সাদামাটা ভাবেই হয়। তার দাফনের জন্য মানুষের কাছ থেকে দান সংগ্রহ যেন না করা হয়। ছেলেদেরকে সে বোঝায় রোগটির ভয়াবহতার কথা। আশা করে, ছেলেরা এই রোগ হয় এমন কাজ করবে না।

প্রতি দুই সপ্তাহে সে একবার টাসোতে যায় চিকিৎসা নিতে। এখনো পণ্য হিসাবে তার শরীরের চাহিদা আছে, কিন্তু সে আর শরীর বিক্রি করে না, এমনকি অনেকবেশী টাকার বিনিময়েও না। সে চায় না আর কেউ তার থেকে আক্রান্ত হোক।

10348787_873336302681969_6912763683049726839_o
লীনা হাসিনা হক

আর নাচ তার রক্তে- তার একমাত্র আয়ের পথ এখন নাচ দেখিয়ে পর্যটকদের মনোরঞ্জন করে। ভিভিয়ান কামাঙ্গা নাচবে শুনলে লোকে অত্যন্তও আগ্রহী হয়। গত মাসে উগান্ডার স্টেট হাউজে একটি প্রোগ্রাম ছিল, ‘জংলী রাজহংসী’ নাচটি তাকে দুইবার করতে হয়েছে। উগান্ডার ফার্স্ট লেডি খুব পছন্দ করেছেন তার নাচ। আলাদা ভাবে তাকে পঞ্চাশ হাজার উগান্ডান শিলিং ( প্রায় ৫০ আমেরিকান ডলার) ঐ অনুষ্ঠান শেষেই তাকে দিয়েছেন ফার্স্ট লেডি। তবে দম কমে আসছে তার, আগে যেমন ঘণ্টা ধরে নাচতে পারতো এখন আর তা পারে না। শরীরে বয় না। তবু নাচে, নাচের ঘূর্ণির সাথে সাথে এই পৃথিবীর সব কষ্ট, অভাব, অসুখ থেকে অনেক দূরে প্রায় নক্ষত্রমালার কাছে পৌঁছে যায় সে।

ভিভিয়ানের চোখ দিয়ে জল পড়ে তার হাত ধরে থাকা আমার হাতের উপরে। বিকেল আবছা হয়ে এসেছে, শেষবার জানতে চাই, সে কি পরিতাপ করে জীবনের কোন কাজ নিয়ে? জানায়, নাহ, কোনও পরিতাপ নয়, তবে মাঝে মাঝে ভাবে যে আইভানকে যদি তখন বেশী টাকার পিছনে ছোটা থেকে বিরত রাখতে পারত হয়তো এই পরিনতি তাদের হত না।তার আর আইভানের এক সাথে বড় হওয়ার আর বুড়ো হওয়ারও কথা ছিল, একসাথে একই গ্রামে বেড়ে উঠেছিল তারা, যেন তারা জন্মই নিয়েছিল একে অপরের জন্য। বিয়ের দিন পাদ্রীর সাথে সাথে সেই উচ্চারণ তারা হৃদয়ের গভীর বিশ্বাস থেকেই করেছিল। বেঁচে থাকতে আলাদা হবে না তারা ‘টিল ডেথ ডু আস পার্ট…।‘ নাহ, পরিতাপ নাই, সবটাই সে ভাগ্য মনে করে।

ইদানিং একটা ভাবনা তাকে খুব অস্থির করে তোলে যে আরও কিছুটা সময় হাতে পেলে সে ছেলেদেরকে নিজের পায়ে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখে যেতে পারতো। তবে ওই পার (আঙ্গুল উঁচু করে আকাশ দেখায়) থেকে সে নিশ্চয়ই ছেলেদের দিকে নজর রাখবে।

আরও কিছুক্ষণ বসে থাকি আমরা চুপচাপ, আঁধার ঘনিয়ে আসে, শকুনগুলো মেইন রোডের ধারের বাওবাব গাছের দালে রাতের আশ্রয় নিচ্ছে, তাদের ডানা ঝাপটানি আর একে অপরকে ডাকাডাকির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। লেক ভিক্টোরিয়া থেকে বয়ে আসে ঠাণ্ডা হাওয়া। ভিভিয়ান উঠে দাঁড়ায়।

বলি, ভিভিয়ান তোমার ছেলেদেরকে উপহার কিনে দেবার জন্য কি কিছু টাকা দিতে পারি, আমি নিজেই কিনতাম, কিন্তু পায়ের অবস্থা তো দেখছ! ভিভিয়ান হেসে মাথা নাড়ে, লাগবে না মাদাম! তুমি যে আমায় খেয়াল করেছো কত কত মানুষের মধ্যে আর আমার কথা জানতে চেয়েছো তাতেই আমার বুক ভরে গেছে। বিদায় জানানোর জন্য হাত বাড়ায় ভিভিয়ান, আমি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরি। তার জ্বরতপ্ত হৃদয়ের গভীর থেকে ভেসে আসে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা। (চলবে)

 

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.