আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা চাইন্দাউ মারমার হাতে ভিক্ষার ঝুলি

Khagrachari pic-1 (1)চিংমেপ্রু মারমা: গ্রামের নাম থলি পাড়া। গ্রামে পৌঁছে প্রতিবেশীদের থেকে খোঁজ নিয়ে তার বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বাড়ীর কাছাকাছি পৌঁছাতেই দেখতে পাই জমির আইল বেয়ে দূর থেকে ৭০/৭৫ এক বয়স্ক নারী লাঠি ভর করে  আসছেন। আমারাও কাছে যাই। কিছুদূর  আসতেই মাটিতে বসে হাঁপাতে লাগলেন।পরে আবার উঠে জমির ভাঙ্গা আইলের কাদামাটি মাড়িয়ে হাঁটা শুরু করলেন। এক পর্যায়ে পৌঁছালেন বাড়ীতে। আমরাও তার পিছু পিছু যাই। বাড়ীর উঠোনে পৌঁছে ভিক্ষার লাল ঝুলিটা নামিয়ে বসলেন। ঝুলিটা খুলে তাতে চাল থেকে মরিচ, পেঁয়াজ,সুপারি যা ছিল তা আলাদা করতে লাগলেন। কাছে গিয়ে কথাবলি তার সাথে।

ভিক্ষা কেন করছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া, আমি কি চাই? আমি কি পারি? কিন্তু আমার কপাল পারে তাই এ বয়সে আমাকেও পারতে হয়। কদিন হচ্ছে কাঠের একটা টুকরাতে পা  লেগে পায়ের আঙ্গুল ভেঙ্গে গেছে। গায়ে অনেক জ্বর। তাও ঘরে বসে বিশ্রাম নেওয়ার কোন সুযোগ নেই। বিশ্রাম নিতে গেলে উপোস থাকতে হবে। তা কি কেউ জানে?

অনাহারে-অর্ধাহারে শরীরটা শুকিয়ে কাঠ। পরনেও জীর্ণ কাপড়। কিন্তু খুব বাকপটু ও সাহসী তা কথা বললেই বোঝা যায়।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে  নির্যাতনের শিকার খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলার থলি পাড়ার বীরাঙ্গনা চাইন্দাউ মারমা। প্রথম দিকে একটু রাগ রাগ দেখালেও এক পর্যায়ে সাংবাদিক বলাতে খুব আন্তরিকভাবে যুদ্ধে তার ঘটে যাওয়া ভয়াল স্মৃতির কথা  শোনালেন আমাদের।

সে সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের যোগাযোগের রাস্তাঘাটের ব্যবস্থা তেমন ভাল ছিল না।চারিদিকে পাহাড় আর বন বেষ্টিত। তবে হানাদাররা জেলায় প্রবেশ করেছিল অনেকটা পানি পথে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এলাকার পুরুষ এবং মুরুব্বিরা কেউ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে চলে যান, কেউবা  গ্রাম ছেড়ে গা ঢাকা দিয়ে থাকেন জান বাঁচাতে। পাক-হানাদার বাহিনীরা গ্রামে এসে পুরুষদেরকে দেখলে তাদের দলে ভিড়াতে চাইবে নইলে বন্দী কিংবা নির্ঘাত গুলি। এমন সময়ে স্বামীর অর্বতমানে চাইন্দাউ মারমা কিছু চাল,ডাল কিনতে যান মহালছড়ি বাজারে। বাজারের কোন পরিস্থিতি বুঝে উঠার আগেই এক দল হানাদার বাহিনী তাকে মুখ চেপে তুলে নিয়ে যায়।

এরপর কি নির্যাতন। ৭/৮টি মাস তারা যেখানে যেখানে ছিল সবখানে তাকে নিয়ে গেছে। লুকিয়ে চলে আসারও কোন উপায় ছিলনা। প্রথমে মহালছড়ির এক চালের গুদামে পরে মানকছড়ি,গুইমারা,রামগড়,মাটিরাঙ্গা,লোগাং,পুজগাং,পানছড়িসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে রেখে নির্যাতন করেছে। যুদ্ধ শেষ হলে পাকবাহিনীরা ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে গেলে সে সুযোগে চাইন্দাউ মারমাও ফিরে আসে তার গ্রামে। প্রথমে আত্মীয়-স্বজন,সমাজ তাকে গ্রহণ করতে চায়নি। একপর্যায়ে গ্রামে আশ্রয় পায় । তার স্বামীও আর সংসার করেনি তার সাথে। এক পর্যায়ে দ্বিতীয় সংসার। তাও কয়েক বছরের মাথায় মারা যায় স্বামী। সে সংসারেও কোন সন্তান নেই। তাই বৃদ্ধ বয়সে এখন  ভাইয়ের একটি ভাঙ্গা ঘরে তার আশ্রয়।

এ ছোট্ট ঘরটিতে একাই থাকেন। আত্বীয় স্বজনের প্রতি তার খুব অভিমান। তাই আশ্রয়ের জন্য কারো কাছে যান না। অভিমান দেশের মানুষের প্রতিও। বহু জনপ্রতিনিধি, মুক্তিযোদ্ধা বিজয় মাস এলেই তার কাছে আসেন, দেখে যান। কিন্তু প্রকৃত কোন সাহয্য সহযোগিতা তাকে করা হয় না। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও কোন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা তো দূরে থাক, বয়স্ক ভাতা,বিধবা ভাতা পর্যন্ত তার কপালে জোটেনি কখনো।

চিংমেপ্রু মারমা,সংবাদকর্মী,খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.