বীরাঙ্গনাদের সম্মান নিশ্চিত করতে হবে

Pataka 4উইমেন চ্যাপ্টার: একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের বর্বরোচিত নির্যাতনের অন্যতম দলিল বীরাঙ্গনা মায়েদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে বর্তমান সরকার। গত ৪৩ বছর ধরে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিত্যক্ত হয়ে অবহেলা ও অপমানে মানবেতর জীবন যাপন করছেন এই নারী মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের মধ্যে যারা বেঁচে আছেন, তাদের খুজেঁ বের করে আনুষ্ঠানিকভাবে এই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে। তাদের অন্ন, বস্ত্র এবং বাসস্থানের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের সম্মানও নিশ্চিত করতে হবে যাতে সুদীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময়ের অপমান ও গ্লানিময় জীবন থেকে বেরিয়ে এসে জীবনের শেষ সময়টা তারা মাথা উঁচু করে বাচঁতে পারে।  ‘শেষ হোক বীরঙ্গনাদের বেদনার দিন- বীরাঙ্গনাও মুক্তিযোদ্ধা’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এই দাবি জানান।

তারা চলতি মাস অর্থাৎ বিজয়ের মাস ডিসেম্বর থেকেই বীরাঙ্গনা মায়েদের আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের মত সমান সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান দেয়ার আহবান জানান।

লন্ডনভিত্তিক সংগঠন রাইজিং পথ অব ওয়ার হিরোইনস এবং বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক  কেন্দ্রের উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় অংশ নেয়া বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধারাও সরকারের কাছে দাবি জানান, তাদেরকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পাশাপাশি সামাজিক স্বীকৃতি ও মুক্তিযোদ্ধাদের মতোই সমান সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। তারা মাথাগোঁজার জন্য একটু ঠাঁই চান। দুমুঠো ভাত চান। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা চান। মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের সন্তানেরা যেভাবে মাথা উঁচু করে বেঁচে আছেন, তাঁরাও চান সেই স্বীকৃতি ও সম্মান।

বিশিষ্ট কলামিস্ট ও ভাষাসৈনিক আব্দুল গাফফার চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ফ ম মোজাম্মেল হক। আলোচনায় অংশ নেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক ড. এম এ হাসান, সাংবাদিক আবেদ খান, বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কাজ করা শামসুন নাহার, যুক্তরাজ্যভিত্তিক বাংলা টিভির কর্ণধার সৈয়দ সামাদুল হক ও বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক পারভীন সুলতানা ঝুমা। সঞ্চালনা কনে রাইজিং পথ অব ওয়ার হিরোইনসের পরিচালক শাহমিকা আগুন। এই সভায় বীরাঙ্গনা রাজু বালা, রাহেলা বেগম, হাজেরা বেগম, যুদ্ধশিশু সুধীরও বক্তব্য রাখেন। সভায় মুক্তিযুদ্ধ ও বীরাঙ্গনাদের নিয়ে প্রদর্শিত হয় একটি বিশেষ তথ্যচিত্র।

মন্ত্রী মোজাম্মেল হক বলেন, সম্প্রতি সরকার নতুন দুটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে, পাঠ্য পুস্তকে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথার পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধী এবং তাদের অপকর্মগুলো উল্লেখ থাকবে। এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাশাপাশি আগামী প্রজন্ম যুদ্ধাপরাধীদের কর্মকান্ড সম্পর্কেও জানতে পারবে। আর দ্বিতীয়টি হলো, বিসিএস পরীক্ষায় মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত বিষয়ের ওপর ১০০ নম্বর বাধ্যতামূলক করা হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস না জানা কেউ সরকারি চাকরি করতে পারবে না।

মন্ত্রী আরো বলেন, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের কারণে আমরা অতিষ্ঠ। অনেকে মুক্তিযুদ্ধ করেননি, অনেকের মুক্তিযুদ্ধ করার মতো বয়সও হয়নি, অনেকের সে সময় জš§ও হয়নি, আবার মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে তারাও  মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেছে। এসব যাচাইবাছাই এর জন্য নীতিমালা করা হচ্ছে।

তিনি জানান, বীরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মর্যাদা বিভিন্ন দেশে যেভাবে দেওয়া হয় সেভাবেই সম্মানিত করা হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। যাঁরা বীরাঙ্গনা নামে পরিচিত তাঁদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে আলাদাভাবে আবেদন করতে হবে না। যেসব সংগঠন বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কাজ করছে সেই সব সংগঠনের কাছেই তালিকা চাওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত স্বল্প সংখ্যক তালিকা পাওয়া গেছে। ফলে গেজেট তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিটি জেলায় জেলায় নারীদের দিয়ে কমিটি করে বীরঙ্গনাদের খুঁজে বের করা হবে। শুধু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নয় তাদের জন্য আরো বেশি কিছু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বঙ্গবন্ধু যেহেতু বীরাঙ্গনা নামটি দিয়েছিল সেহেতু বীরাঙ্গনা নামটি রেখেই বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা নামে তাদের স্বীকৃতি দেবার জন্য কাজ করছে সরকার। মন্ত্রী বলেন, সামাজিক বাস্তবতার কারণে বীরাঙ্গনাদের তালিকা করা কঠিন। তাঁদের খুঁজে বের করার জন্য কমিটি গঠন করা হবে।

আবদুল গাফফার চৌধুরী বলেন, ইংল্যান্ডে ব্ল্যাক বললে ৫০ পাউন্ড জরিমানা করা হয়। সেখানে বলতে হয় ‘নন হোয়াইট’। আমাদের দেশেও বীরাঙ্গনাদের অসম্মান করে যেসব কথা বলা হয় এধরণের অপরাধের আইনী পদক্ষেপ নেয়া হোক। তিনি বীরাঙ্গনাদের জন্য আবাসন, হাসপাতালে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা এবং তাঁরা মারা যাওয়ার পর যাতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যথাযথ সম্মান পান, সে দাবি রাখেন সরকারের কাছে। একই সঙ্গে এই নারীদের সন্তানদের জন্যও যথাযথ কর্মসংস্থানের দাবি তুলেন। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভাতাসহ বীরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, সরকারের বৃহৎ পরিকল্পনার বাইরে এসে এখন যে কয়জন বীরাঙ্গনাকে পাওয়া গেছে তাদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়া হোক। নইলে এরাও হয়তো এই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি স্বচক্ষে দেখে যাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন। তিনি সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে এসে মৃত্যুর অন্তত আগের কয়টা দিন বীরাঙ্গনাদের সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য সহায়তা করার আহ্বান জানান।

ড. এম হাসান বলেন, একাত্তর পরবর্তী সময়ে দেশ স্বাধীন হবার পর আমরা মুক্তিযোদ্ধারা যখন আনন্দ উল্লাস করেছি তখন নির্যাতিত ওই নারীদের সহযোদ্ধা করিনি। করতে পারিনি। বঙ্গবন্ধুই প্রথম নির্যাতিত ওই নারীদের স্বীকৃতি দিয়েছেন। যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি সেই বীরাঙ্গনাদের আমরা তাদের প্রাপ্ত সম্মানটুকু দিতে পারিনি। বিলম্ব না করে বিজয়ের এই মাসেই বীরাঙ্গনাদের সম্মানিত করা, যেসব বীরাঙ্গনা মারা গেছেন তাদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা ও আর্কাইভ নির্মাণের দাবি জানান তিনি।

একাত্তর সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত সব বীরাঙ্গনাদের ভাতা দেয়ার দাবি জানিয়ে ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা লুটের পরও দেশ যখন অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যায় তখন মুক্তিযোদ্ধাদের মতো বীরাঙ্গনাদের ভাতা দেয়ার ক্ষেত্রে অর্থের অভাব হবে বলে আমার মনে হয় না।

আবেদ খান বলেন, বঙ্গবন্ধুই প্রথম তাদের স্বীকৃতি দেন। তাদের পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করেন। তার মৃত্যুর পর তাদের আশ্রয় ভেঙে দেয়া হয়। আমরা যদি এখন বঙ্গবন্ধু আদর্শ যদি প্রতিষ্ঠা করতে চাই তাহলে বীরাঙ্গনাদের সম্মান করার বোধ জাগ্রত করতে হবে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে আমরা অনেকেই গণভবনে যাই। মুক্তিযোদ্ধারাও যায়। মাঝে মাঝে মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশও হয়। কিন্তু বীরাঙ্গনারা গণভবনেও যেতে পারেন না সমাবেশও করেন না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার অনুরোধ থাকবে এই ডিসেম্বরের মধ্যেই একদিন তিনি বিশেষভাবে বীরাঙ্গনাদের গণভবনে আমন্ত্রণ জানাবেন। নিজেদের প্রাপ্ত সম্মান ও অধিকারের জন্য বীরাঙ্গনারা ৪৩ বছর অপেক্ষা করেছেন। হাহাকার করেছেন। এখন যদি আমরা তাদের যোগ্য সম্মান দিতে না পারি তবে কবে পারবো?

সভায় নারী মুক্তিযোদ্ধা (বীরাঙ্গনা) রাহেলা একাত্তরের সেই মর্মস্পর্শী ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, আমি বীরাঙ্গনা কী কইরা হইলাম? সেইটা কি আমার দোষ? অথচ আমার ছেলেমেয়েরে অন্যরা কয়, তোর মা নষ্ট হইয়া গেছে। এখন মুক্তিযোদ্ধা ভাইরাও অন্যদিকে তাকায় থাকে। শেখ হাসিনা একবারও দেখতি আসলো না। তারা খালি রাষ্ট্র নিয়াই পাগল।

চোখে পানি আর কণ্ঠে অভিমান ও ক্ষোভ নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘সরকার স্বীকৃতি দিছে শুনি। কিন্তু কবে দিব? এর মধ্যে দুইজন মইরাও গেছে। এ স্বীকৃতি হাতে পামু কবে?’

ঠাকুরগাঁও থেকে আসা যুদ্ধশিশু সুধীর বলেন, সবাই তাঁদের বাবার নাম ও পরিচয় বলতে পারে। আমি বলতে পারি না। আমার বাবা নাই তো তার পরিচয় কেমনে দিমু?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.