নারীদের স্যার সম্বোধন সম্মানের নয়: কমলা ভাসিন

Kamla 1
কমলা ভাসিন

উদিসা ইসলাম: কমলা ভাসিন এসেছিলেন বাংলাদেশে, বরাবর যেমন আসেন। তিনি নিজেকে সাউথ এশিয়ার নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দবোধ করেন। সাক্ষাতের দ্বিতীয় দিন কমলা ভাসিনের সাথে কথা বলার জন্য বসতে হবে, বায়োগ্রাফি লিখব তাঁর।  নারীনেত্রী খুশী কবিরের ধানমন্ডির বাসায় ঢুকতে দেখি এক পত্রিকার সাংবাদিক তার সাক্ষাতকার নিচ্ছেন। উনি চোখের ইশারায় বসতে বলে জানতে চাইলেন, চা খাব কিনা। খাবো জানাতেই নিজের মতো করে চা নিয়ে আসার কথা জানালেন বাসার সহকারী জনকে।

পত্রিকার সাক্ষাতকার দিয়ে এসে আমার সাথে মেঝেতে বসে নিজের হাতে চা বানিয়ে নিজে নিলেন এবং চিনি খাব না বলাতে একটু কপট বকা দিয়ে আমাকে কাপ এগিয়ে দিয়ে বললেন- বলো কিভাবে এগোবে।

আমি তাকে আমার পরিকল্পনা জানালাম। আর আগের দিনে সাংগাতের আড্ডার বিশিষ্টতা নিয়ে খুব ছোট করে জানালাম, সমালোচনার জায়গাটাও বললাম। এরপর আমার আর বেগ পেতে হয়নি। তাকে এবং তার কাজকে নিয়ে লিখতে হলে কত-শত আসলে রেফারেন্স আছে সেগুলো আমাকে পাঠাবেন জানিয়ে দিলেন। আমরা কথা বলে চলি।

কমলা ভাসিনকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো নিজেকে কিভাবে পরিচয় দিতে চাইবেন। কাঁধ সামান্য ঝাঁকিয়ে উনি বললেন, আমি আসলে জানি না। তবে যদি বলতেই হয় তাহলে বলব আমি একজন নারীবাদী, আমি একজন মানবাধিকার কর্মী, আমি একজন কবি, সমাজসচেতন মানুষ, আমি কমলা।

কমলা ভাসিন একজন নারীবাদী সক্রিয় কর্মী, যিনি সাউথ এশিয়ার খ্যাতিমান জেন্ডার প্রশিক্ষক। ১৯৪৬ সালে জন্ম নেয়া কমলা নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়েই এগিয়ে গেছেন জীবনের মানে খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। বড় হয়েছেন ভারতের রাজস্থানে এবং জয়পুরের কলেজ থেকে বিএ শেষ করে রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করেন।

জেন্ডার সমতা, মানবাধিকার, শান্তি প্রতিষ্ঠাসহ বেশিকিছু বিষয় নিয়ে তার শক্তিশালী লেখালেখি আছে। তবে যেটা কমলা বলতে ভালবাসেন, তা হলো তিনি একজন গীতিকার। বিভিন্ন জন আন্দোলনের সময় তিনি গান লিখেছেন। শিশুদের জন্য, নারীদের হয়ে নানা সময় তিনি কবিতা লিখেছেন। নিজের গান পাগলামী নিয়ে বলতে গিয়ে কমলা যা বলেন তাহলো, আমি ভাল গায়ক নই, কিন্তু আমার যে আকাঙ্খা এবং যে আগ্রহ তা আমাকে প্রায়শ গাইতে উদ্বুদ্ধ করে এবং যখন যেখানে পারি আমি গাই।

এরপর তিনি নিজের কাজের মূল্যায়ন করতে গিয়েই জীবনের শুরুর সময়ে ফিরে গেলেন। কারণ এখন এই মূহূর্তে উনি যা তাতো সারা জীবনেরই ফসল। কেউ হুট করে বদলে যেতে পারে না, জীবন ও জীবনবোধ তাকে সারাজীবন তৈরী করে।

কমলা জানালেন, কখন এবং কেন তিনি নারীদের নিয়ে কাজ করার প্রয়োজন বোধ করলেন:

‘আমি ১৯৪৬ সালে জন্ম  নিই। বাবা সরকারি চিকিৎসক হওয়ায় গ্রামে থাকতে হতো তাকে। আমি গ্রামের স্কুলে গেছি, সরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। আমি সাধারণ মানুষের সাথে বেড়ে উঠেছি। জন্মের বছর পর ভারত স্বাধীন হওয়ায় আমি স্বাধীন ভারতে বেড়ে উঠেছি। আমি শুরু থেকেই জানি আমাকে জনগণের জন্য কাজ করতে হবে, তবে তখনও কেবল বা বিশেষ করে আলাদা করে নারীর কথা ভাবিনি।

আমি কাজ শুরু করি দরিদ্র মানুষ, দলিত শ্রেণী, আদিবাসীদের জন্য। আমি যখন কাজ শুরু করি, আমার মনে হয়েছে  আমার জ্ঞানের পরিসরে যতোটা ধরে দরিদ্র মানুষ তার চেয়ে দরিদ্র, দলিত শ্রেণী আরও বেশি দলিত এবং আদিবাসী যেন আরও বেশি আদিবাসী। আমি হতদরিদ্রদের সাথে কাজ করতে গিয়ে প্রথম অনুধাবন করি যে নারীদের প্রতি আরও বেশি করে মনোযোগ দেয়া দরকার। আমি নারীবাদী হয়েছি আমার সামাজিক কর্মকাণ্ড শুরু হওয়ার পর। এবং দুটো একসাথে চলেছে। আমি কখনোই কেবল জেন্ডার সমতা অ্যাক্টিভিস্ট না, কখনো না। বাংলাদেশে আমার বন্ধুরা যারা কাজ করছেন খুশী কবীর, ফওজিয়া খোন্দকার তারাও কেবল জেন্ডার সমতা অ্যাক্টিভিস্ট না। আমরা সবাই বহু ধরনের মূল্যবোধ নিয়ে কাজ করি- জেন্ডার সমতা, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, শান্তি, অসাম্প্রদায়িকতা, সব একসাথে’।

যার এতো বন্ধু বাংলাদেশে তার এদেশের নারী মুক্তি আন্দোলনের পরিবর্তনের প্রতিটা সময় চেনা থাকারই কথা। কথা হলো এদেশের নারী অধিকার আন্দোলন নিয়ে। মূল্যায়ন জানতে চাইলে হেসে ওঠেন। চায়ে চুমুক দিয়ে বলেন, সেরা। বাংলাদেশে যা অগ্রগতি হয়েছে বা চলমান সেটা অনস্বীকার্য। এটা এজন্য নয় যে এখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে অনেকে নারীবাদ চর্চা করছেন বা এমন নয় যে বড়ধরনের একটা গ্রুপ এক হয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বা নারী অধিকার আদায়ে এনজিওগুলো সক্রিয় আছে। সরকারও অনেক কাজ করছেন। অন্তত কাজ যে করতে চাইছেন সেটা এখন স্পষ্ট। কিন্তু সরকারের নানাপদে যারা আছেন তাদের নিয়ে কাজ করা জরুরি।

সম্প্রতি নারী ও শিশু মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান যে বললেন, শালীনতার অভাবে ধর্ষণ ঘটে। এটার কারণ মূল জায়গায় কাজের দুর্বলতা আছে। যারা আইন তৈরি করবেন তাদের কাছ থেকে এমন কথা শোনা খুব আশান্বিত করে না। এর শক্ত প্রতিবাদ হওয়া দরকার।

মিডিয়া অনেক কিছু করতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ অনুষ্ঠান এতোবেশি নানাভাবে নারীবিদ্বেষী বার্তা বহন করে যে তথাকথিত বিষয়গুলো সমাজে বহাল থেকে যাচ্ছে। সংবেদনশীলতার শিক্ষা আরও বেশি বেশি করে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ বাকি আছে। এক্ষেত্রে আমি যোগ করতে চাই পুলিশ রিফর্ম প্রোগ্রামের কথা। এটা তো ঠিক একজন নারীবাদী জেন্ডার সংবেদনশীল মানুষ ফওজিয়া খোন্দকারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যারা আইন প্রয়োগ করবেন তারা যদি সংবেদনশীল না হন, তাহলে একজন নির্যাতনের শিকার নারী থানা, আদালত, মেডিকেল সব জায়গায় ন্যায়বিচার পাবেন না। ফলে কাজ অনেক দিক থেকেই হচ্ছে। এখন সেগুলোর প্রয়োগটা ধারাবাহিকভাবে যেন হয় সেজন্য তাগাদা দিয়ে যেতে হবে।

আপনার কি মনে হয় এধরনের রিফর্ম প্রজেক্ট আসলে কাজ করছে? পুলিশের আচরণ কি পরিবর্তন হচ্ছে?

হচ্ছে না- সেটা বলার সময় কিন্তু এখনও আসেনি। পুলিশ অনেক বড় ডিপার্টমেন্ট। তাদেরকে বেশি বেশি প্রশিক্ষণ দিতে পারলে সুফল আসবে বলেই আমি মনে করি। এর ভিতর এতো বেশি দুর্নীতি ঢুকে আছে, সেকারণে তারা নারীদের এখনও সেভাবে সহায়তা দিচ্ছে না। কিন্তু আরেকটা বিষয় এই প্রজেক্ট মাত্র তিন-চার বছর চলছে, এরমধ্যে শত বছর ধরে যে নেতিবাচকতা ঢুকে পড়েছে, ভয়াবহ পুরুষতন্ত্রের যে ছায়া তা এতো দ্রুত সরে যাওয়া সম্ভব না। এতোটাই প্রবল উপস্থিতি যে নারী পুলিশ কর্মকর্তাদের স্যর ডাকতে হয়।

আমি একটু টোকা দিয়ে তাকে বললাম- হুম আমাদের নারী মন্ত্রী সচিবদেরও স্যার ডাকতে হয়।

হ্যাঁ, এটা নিয়ম করেছে। তার মানে ক্ষমতার সংজ্ঞা ’পুরুষ’ই হতে হবে। নারীর জন্য ‘স্যার’ শব্দের ব্যবহার আসলে নারীদের সম্মান দিচ্ছে না। মানে হলো তুমি নারীকে নারী হিসেবে গ্রহণ করতে পারছো না। আমি যখন তাদের প্রশিক্ষণ দিতে গেলাম এবং এসব বললাম তখন মনে হলো, কিছু পরিবর্তন করতে পারেনি কারণ ক্ষমতা হলো ‘পুরুষ’। কি করা যায়? কি পরিমাণ পুরুষতন্ত্র আমাদের ভিতর ঢুকে আছে যে আমরা বিষয়টা অনুধাবন করতে চাইছি না। রাজনীতি করার আগে তারা কেউই মাথায় কাপড় দিতো না, কিন্তু এটাই স্ট্যান্ডার্ড হয়ে গেছে যে রাজনীতিতে নামতে হলে তাদের মাথায় কাপড় দিতে হবে। আমাদের সামনে ঐতিহ্যের নামে ভুল সংজ্ঞা হাজির করা হচ্ছে।

এবার একটু আহ্লাদ করেই বললাম উদ্যমে উত্তরণে শতকোটি কর্মসূচিকে কড়া সমালোচনা করা হয়, শুনেছেন কখনো? সমালোচকরা বলতে চায়, নাচ-গান করে আসলে কোন পরিবর্তন আসে না। এবার কিন্তু খানিক বিরক্ত হয়েছেন বলেই মনে হলো। কিন্তু নিজেকে নিজ গুনে সামলে নিয়ে বললেন, প্রত্যেকের নিজ নিজ মতামত দেওয়ার অধিকার আছে, সেটা আমি মানি, তবে গ্রহণ করব কিনা সেটা ভিন্ন। যারাই এই কর্মসূচি দেখেছে, তারা জানে এটা কেবল নাচ করা না। এখানে প্রবন্ধ লেখা হয়, গান লেখা হয়, মানুষকে সংগঠিত করা হয়। তবে হ্যাঁ, নাচটা একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটার। এর অনেক কারণ আছে। আমরা এই ক্যাম্পেইনে ভিকটিম হিসেবে হাজির হই না, এখানে আমরা আসি সারভাইভার হিসেবে। আমরা এই ক্যাম্পেইনে আসি যেখানে নারীরা হাসি ধরে রাখতে পারবে। নাচ গুরুত্বপূর্ণ কারণ, পুরুষতন্ত্র আমাদের শরীর নিয়ন্ত্রণ করে। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকো, এভাবে ঢেকে রাখো, শরীরের কোন অংশ দেখিও না, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায়। সেদিক বিবেচনায় পুরুষতন্ত্রের আমাদের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে নাচ আমাদের জন্য খুব শক্তিশালী অস্ত্র।

নাচ গান তিনটি বিষয়কে সম্পৃক্ত করে- শরীর, হৃদয়, মন। নাচ ও গান ইমোশনকে ছুঁতে পারে। আমি মনে করি যে কাজ আমরা করতে চাই তা আকাঙ্খা দাবি করে, এখানে কেউ বোরিং লেকচার দাবি করে না। এটা এনার্জি দাবি করে, এর জন্য আগ্রহের এবং উদ্যমের দরকার। আমাদের জন্য নাচ গান এটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ, একমাত্র অংশ না। যারা নাচ গান পছন্দ করে না, তাদের তা করতে হবে না। তারা এই কর্মসূচির অন্য যে অংশগুলো আছে সেগুলোতে অংশগ্রহণ করতে পারে।

এখন নারী আন্দোলনের অন্যতম কাজ কি হতে পারে বলে কমলা মনে করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের মূল কাজ হলো এই আওয়াজ তোলা যে, সংবিধানবিরোধী কাজ করা যাবে না। যে সংবিধান নারী পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করেছে, প্রত্যেক সরকারের উচিত সেই অনুযায়ী নারীর অধিকার নিশ্চিত করা চেষ্টা করা। লিখিত সমানাধিকার থাকবে, কিন্তু তার বাস্তবায়নের পথে নিজেরাই বাধা সৃষ্টি করে যাবেন এমনটা আর হবার না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ভাষার পরিবর্তন। যার সাথে থাকবেন সেই পুরুষকে স্বামী, পতি হিসেবে বলা যাবে না। কেন যাবে না? শব্দগুলোর মানে জানান চেষ্টা করো, তুমি নিজেই বুঝে যাবে। আমি/আমরা চাই এই শব্দগুলো অভিধান থেকে মুছে ফেলতে। এবিষয়ে কাজ করা খুব জরুরি।

(বিশ্বের ১২ জন নারীবাদীর জীবন ও সাক্ষাতকার নিয়ে একটি বই করছি। এর অংশ হিসেবে কমলা ভাসিনের সাথে দুইদিন সময় কাটানোর সুযোগ হলো। এখানে তার পাশে থেকে তাকে দেখার ভিতর দিয়ে পাওয়া কিছু কথা সাজিয়ে সংক্ষেপে পাঠকের কাছে এগিয়ে দিলাম। বাকীটুকুর জন্য সামনের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সুপ্রীতি  ধরকে ধন্যবাদ, তাগাদা দিয়ে এই অংশটা তৈরী করতে সহায়তা করার জন্য- উদিসা)

 

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.