রোজ নামচা- ৩১ (সিংহী হৃদয়)

Women Riseলীনা হাসিনা হক: অফিসের লিফটের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। সুরাইয়া নাজনীন নামের নারীটির সাথে এই লিফটে ওঠানামার সময়েই দেখা হয় প্রায় বছর তিনেক। এই বিল্ডিঙে আরও বেশ কটি অফিস আছে। লিফটের ভেতরেই হাসি বিনিময়, নাম জানা, কোথায় কাজ করেন এটুকু জেনে নেয়া। এমনকি কোথায় থাকেন এবং ছোট্ট করে পরিবারের কথাও জেনে নেয়া হয়। উৎসবে পার্বনে উইশ করা, এতো টুকুই।

সুরাইয়া একটি রিয়াল এস্টেট অফিসে কাজ করেন একাউনটেনট হিসাবে। ধারণা করি মায়নাপত্র খুব মোটা অংকের নয় হয়তো। চল্লিশের নিচেই বয়স হবে তার।

আজ কেন জানি তার মুখটা মলিন। জানতে চাই শরীর ভালো আছে তো? ‘শরীর ভালই আপা, মনটা খারাপ’। লিফটে আমি আর সুরাইয়া ছাড়া আর কেউ নাই। ‘বাসায় কোনও সমস্যা? ছেলেমেয়েরা ভালো আছে?’ আমার কথায় তার চোখ ছলছলে হয়ে ওঠে। ‘আপা, আসবো আপনার অফিসে একসময়? কথা বলতাম?’ লাঞ্চের পরে আসতে বলি।

সুরাইয়া আমার সামনে বসে। অফিসে একটা আলাদা রুম থাকাতে এই-ই সুবিধা। নিরিবিলিতে আলাপ করা যায়।

কাজীপাড়াতে থাকেন সুরাইয়া। দুটি সন্তান, বড়টি মেয়ে, ছোটটি ছেলে। দুজনেই পড়ালেখায় মেধাবী। মেয়েটি গত বছর একটি গোল্ডেন ফাইভ পেয়েছে, তাতেই বোঝা যায় আসলেই মেধাবী। ছেলেটি আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষা দিবে বেশ ভালো একটি স্কুলেই পড়ে সে। ইদানীং এই ছেলেটিকে নিয়েই চিন্তিত সুরাইয়া। ছেলেটি হঠাৎ অন্যরকম ব্যবহার করছে।

স্বামীর কথা জানতে চাইলাম। আবছা হাসলেন সুরাইয়া,’আপা, স্বামী চট্টগ্রামে থাকেন। একটি প্রাইভেট ফার্মে কাজ করেন।‘ একটু থেমে আবার বললেন,’ উনার আরেকটি পরিবার আছে সেখানে, মাসে-তিনমাসে একবার ঢাকায় আসেন।‘ সন্তানদের খোঁজ-খবর করেন তো ঠিক মতন?

জবাবে সুরাইয়া জানান, আসলে এটি সুরাইয়ারও দ্বিতীয় বিয়ে, তাঁর সন্তান দুটি প্রথম স্বামীর। এই স্বামীর সাথে আগের একটি কর্মক্ষেত্রে পরিচয়, সুরাইয়া তখন সদ্য স্বামী হারিয়েছেন রোড এক্সিডেন্টে। পরিচয়, ভালো লাগা, ভরসা তারপরে আবার নতুন করে সংসার। সেই চিরাচরিত কাহিনী, স্বামীর আরেকটি স্ত্রীর কথা কিছুই জানতেন না যতদিন না স্বামীটি আরেকটি চাকরি নিয়ে চট্টগ্রামে গেলেন বছর পাঁচেক আগে।

স্বামী এমনিতে কোনও খারাপ ব্যবহার সুরাইয়ার সন্তানদের সাথে করেন না, আবার তেমন খোঁজ খবরও করেন না। যে টাকা তিনি সংসার খরচ হিসাবে পাঠান, তা দিয়ে পুরো বাসা ভাড়াটাও হয় না। তবু স্বামী আছেন, এই ব্যাপারটিও নাকি সুরাইয়াকে অনেক ধরনের ঝামেলা থেকে রেহাই দেয়। সুরাইয়া এই কাজের বাইরেও সপ্তাহে তিনদিন একটি বুটিক শপের হিসাবরক্ষক হিসাবে আরও কিছু আয় করে ছেলেমেয়ের পড়াটা অন্তত ঠিক রাখার চেষ্টা করেন। কিই-ই বা আর করার ছিল সুরাইয়ার। মেয়েরা কেন যে একচক্ষু হরিণের মতন হয় সবসময়।

গত বেশ কিছুদিন থেকে ছেলেটি দেরীতে বাড়ি ফিরছে। যখন-তখন বের হয়ে যাচ্ছে। ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখছে। খাচ্ছে না ঠিকমতো, কণ্ঠার হাড় বের হয়ে গেছে, চুল কাটে না। যে ছেলে প্রতিদিন স্কুল ড্রেস ইস্তিরি করে পরে বলে মাসের শেষে ইলেকট্রিক বিল নিয়ে সুরাইয়া বকাবকি করেন, সেই ছেলে দিনের পর দিন নোংরা কোঁচকান শার্ট পড়ে থাকছে। কারণে-অকারণে বোনের সাথে ঝগড়া বাঁধাচ্ছে, মা কিছু বললে ঘাড় গোঁজ করে থাকছে।

সুরাইয়া কিছুদিন আগে জেনেছেন, সে গত দুই মাস প্রাইভেট টিউটরের বেতন স্যারকে দেয়নি, টিচার ফোন করে জানিয়েছেন। সুরাইয়ার মা-ভাইয়েরা কেউ ঢাকায় থাকে না, কারো সাথে যে একটু পরামর্শ করবেন সেরকমও কাউকে ভরসা করতে পারছেন না।  স্বামীকে বলেছিলেন, তিনি বলেছেন, এই বয়সে ছেলেরা এরকম একটু করেই থাকে, আর সুরাইয়ারও দোষ আছে, ছেলেকে আহ্লাদ দিয়ে মাথায় তুলেছে।

আমি মনে মনে কনফার্ম জানলাম যে সুরাইয়ার ছেলেটি যেকোনো ধরনের ড্রাগসে ঝুঁকে পরার প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। বললাম তাকে সে কথা। আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সুরাইয়া, যেন আমি কি বলছি বুঝতে পারছেন না।

প্রাথমিক ধাক্কা কেটে যেতেই সুরাইয়া ভেঙ্গে পড়লেন, এখন আমি কি করবো আপা! আমার যে সন্তানরাই সব। আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলাম, ছেলেকে অতি দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে বললাম। চিন্তা করার কিছু নাই, আমার পক্ষে যা করার তা করবো।

তারপরে মাস তিনেক সুরাইয়ার যুদ্ধের সাক্ষী আমি। কি না সে করলো ছেলেকে ড্রাগস নামের দানবের হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে। দিনের পর দিন ছেলের সাথে সময় কাটালেন, চাকরি থেকে বিনা বেতন, সবেতন, আধা বেতন, যত ধরনের ছুটির অপশন ছিল, সব ছুটি নিলেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে গিয়ে কথা বললাম কোম্পানিটির ম্যানেজিং ডিরেক্টরের সাথে। নিজের যা কিছু সঞ্চয় ছিল তার প্রায় সবটাই খরচ হল তার, তবে ছেলে ফিরে এলো। ছেলে ফিরে এলো সুস্থ জীবনে।

ছেলের সুস্থতা আরও সুখবর বয়ে এনেছে সুরাইয়ার জন্য। আরেকটি চাকরি হয়েছে তার একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায়। বেতন বেশ ভালো। কাজী পাড়ার সেই বাসা ছেড়ে দিয়ে কচুক্ষেতের দিকে একটি বাসা নিয়েছেন সুরাইয়া। ছেলের পরীক্ষা হয়ে গেলেই ওই বাসাও বদলে বাড্ডা’র দিকে চলে আসবেন, যাতে ছেলে আর কোনভাবেই আর সেই পুরনো সঙ্গ না পায়।

সুরাইয়ার মেয়েটিও অসীম ধৈর্য্যে মাকে সঙ্গ দিলো এই যুদ্ধে। ভাইয়ের সাথে সময় কাটানো, তাকে ওষুধ খাওয়ানো সময় মতো, সব করলো সে মায়ের মমতায়। বেশ কয়েকবার সুরাইয়ার বাসায় যাওয়া হয়েছে আমার। ছেলেটির সাথে ভালো করে পরিচয় হয়েছে। কথা বলেছি অনেক তার সাথে। তাকে আলাদা করে খেতে নিয়ে গেছি আলাপ করার জন্য। আর সে ওই পথে হাঁটবে না। মাকে কষ্ট দিবে না।

মায়ের দ্বিতীয় স্বামী তার সাথে খুব একটা খারাপ ব্যবহার না করলেও আন্তরিক ছিল না। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে মায়ের অমানুষিক কষ্ট দেখে দেখে সে দিশেহারা হয়ে পড়ছিল। কিন্তু মায়ের সাথে কথা বলে নাই কেন?

এই প্রশ্নের জবাবে ছেলেটি বলল, অনেকবার চেয়েছি আন্টি, কিন্তু কেন যেন পেরে উঠি নি। মাও তো কেমন খালি মেজাজ করতো আমার সাথে।

বুঝতে পারি, সেই পুরনো ভাঙ্গা পরিবার, মায়ের একাকীত্ব, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, বয়সন্ধিকালীন শারীরিক মানসিক পরিবর্তন, মনের কথা প্রকাশের জায়গা না পাওয়া সব মিলিয়ে ছেলেটিকে ড্রাগসের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

রক্ষা পাওয়া কেবল সম্ভব হল সুরাইয়ার অসম্ভব মানসিক দৃঢ়তার কারণে। একমাত্র মাই-ই পারে সন্তানকে যেকোনো বিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্য কোনও কিছুর পরোয়া না করতে।

সুরাইয়ার সাথে এখনো দেখা হয় মাঝে মাঝে। এই অফিস ছেড়ে চলে যাওয়াতে নিয়মিত দেখা হয় না, তবে সুরাইয়া প্রায়ই আসেন আমার সাথে দেখা করতে, কথা বলতে। সেই ভঙ্গুর মা’টিকে আর দেখি না, আমার সামনে দাঁড়িয়ে সিংহী হৃদয় সেই নারী, বিনা যুদ্ধে যে একচুলও ছেড়ে দিতে রাজী ছিল না।  জীবনের এই যুদ্ধে জয়ী সুরাইয়াকে অভিবাদন।

সেইসাথে পৃথিবীর সকল সংগ্রামী নারীকে অভিবাদন।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.