হু অ্যাম আই!

Terrorismতানিয়া মোর্শেদ: গতরাতে দীপ্ত কিছু কথা বলেছে যা আমাকে ভাবাচ্ছে। ভাবছি এ কোন পৃথিবীতে ছেলেটা বেড়ে উঠছে? নিজের জন্ম যে রেইসে, ধর্মে (পালন করা দূরে থাক, বিশ্বাস করবে কি না তাও বিবেচ্য নয়) জন্ম, তার জন্য প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হবে। মুসলমান শব্দটা আজ একটা “গালি”-তে পরিণত হয়েছে। মুসলমান আর “সন্ত্রাসী” আজ সমার্থক শব্দ।

মুসলমানের ঘরে জন্মে কোনো বিবেকবান মানুষ আজ কি প্রতিবার সন্ত্রাসীদের (মুসলমান) সন্ত্রাসের খবরে লজ্জায়, ঘৃণায় কুঁকড়ে যায় না? অন্য ধর্মের মানুষদের কি দোষ দেওয়া যায়? ক’জন মানুষ মানুষকে শুধু “মানুষ” হিসাবে দেখে? কারো গায়ে তো লেখা থাকে না সে কেমন মানুষ! অধিকাংশ মানুষ অচেনাকে ভয় পায়। আর ধর্ম এমন একটা বিষয় যা অধিকাংশ মানুষকে চিন্তায়, চেতনায় সীমাবদ্ধ রাখে। অথচ উল্টো হবার কথা ছিল না কি? ধর্ম যদি মানুষকে বিবেকবান হতেই সাহায্য, বাধ্য করতো, তাহলে কি আজ পৃথিবীর এই চেহারা হয়!

দীপ্ত যে স্কুলে যায় সেখানে একটা বড় সংখ্যায় ভারতীয়, চাইনিজ অরিজিনের স্টুডেন্ট। এরকম পরিবেশ নিশ্চয় আপাতত অনেক অভিভাবককে এক ধরনের মানসিক নিরাপত্তা দেয়। কারণ রেসিজম মানে শ্বেতাঙ্গরা করে, এটাই সাধারণের ধারণা। পরিসংখ্যানও তাই বলে। তবে শুধু শ্বেতাঙ্গরাই বর্ণবাদী, এটা বড় ভুল ধারণা। বাংলাদেশীদের ‘বর্ণবাদ’ নিয়ে আগেও অনেক বলেছি। সাম্প্রদায়িকতা নিয়েও বলেছি।

দুঃখজনক যে ভারতীয় উপমহাদেশের অনেক মানুষ নিজেদের ভালো কিছু বৈশিষ্ট্য বহন করে প্রবাসী হলেও সাম্প্রদায়িক, বর্ণবাদী মানসিকতা ত্যাগ করেন না। শিক্ষা, কর্মজীবনে চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা, জীবনের সব বিষয়ে চূড়ান্ত অর্জনের পরও এই মানসিকতা বদলায় না। আমি আগেও বলেছি, ১৯৭৩-১৯৭৫-এ বাবার কানাডায় পড়বার সময় কী ধরনের অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ ছিল বাংলাদেশী-ভারতীয়দের মধ্যে। আমি আমার বাইশ বছরের প্রবাস জীবনে তার সামান্যও পাইনি। মনে হচ্ছে প্রতিদিন তা আরো খারাপ হচ্ছে!

দীপ্ত গতরাতে বলেছে, বাংলাদেশী অরিজিনের ওর বয়সী (বন্ধুকে) নামের জন্য ভারতীয় অরিজিনের অধিকাংশ স্টুডেন্ট “সন্ত্রাসী” বলে! যার নামে মোহাম্মদ, রহমান, আহমেদ থাকে তাদের দিকে বিশেষ দৃষ্টিতে অনেকেই তাকায়। এটাই বাস্তবতা। কিন্তু আমি অবাক হয়েছি, নিজেদের সাথে পড়া একজনকে (অনেক বৎসর ধরেই অনেকেই পড়ছে এক সাথে) নামের জন্য এভাবে বুলিইং করছে! এরপর যা শুনলাম তাতে আরো কষ্ট পেয়েছি।

এই স্কুল শুরু করবার পর একজন নিজে থেকে দীপ্তর সাথে বন্ধুত্ব করতে ভীষণ আগ্রহী হয়েছে। পারিবারিকভাবেও যোগাযোগ করেছে। সেই স্টুডেন্টও মুসলমান মানেই সন্ত্রাসী তা বলে। আমি যাদের কথা বলছি তারা অনেক মেধাবী, পড়ালেখা বাদেও অন্যান্য ক্ষেত্রেও ভীষণ মেধাবী। অভিভাবকরা সবাই উচ্চ শিক্ষিত, সমাজে ভীষণভাবে প্রতিষ্ঠিত।

প্রশ্ন জাগে মনে, সব দেশেই কি বাংলাদেশের মত সার্টিফিকেট সর্বস্ব শিক্ষা ব্যবস্থা? উচ্চশিক্ষা যদি মানুষকে সীমাবদ্ধ মানসিকতা থেকে মুক্ত করতে না পারে তাহলে সমাজ, দেশ, পৃথিবী কী ভয়ানক দিকে এগুচ্ছে!

দীপ্ত বলেছে, এরা ধর্মের সাথে কালচারও এক করে ফেলে। বাংলাদেশের মানুষ যেহেতু অধিকাংশই মুসলমান, আর মুসলমান মানেই খারাপ, তাই বাংলাদেশের কালচারও খারাপ! বাঙ্গালী-অবাঙ্গালী ভারতীয় তারা। দীপ্ত খুব মন খারাপ করে বলেছে, “মা, আমার আর ওর কালচার তো একই (বন্ধু বাঙ্গালী অরিজিনের)। আর অবাঙ্গালী ভারতীয়দের সাথেও তো অনেক মিল আছে। আমাদের রেইস তো এক।”

আমার হৃদয় এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেলেও অনেকক্ষণ ধরে বুঝালাম। ওদের আর কি দোষ! আইসিস, তালেবান, বোকো হারামের কাজ জেনে-দেশে-শুনে ক’জন মনে রাখবে, মানুষের পরিচয় সে “মানুষ”। তারপর অন্য কিছু। দীপ্ত ছোটবেলা থেকেই জানে, মেনেও চলে নিজে থেকেই, ধর্ম নিয়ে কথা বলতে নেই বাবা-মা বাদে অন্য কারো সাথেই। ও-কে আবারও বলেছি, (বন্ধুটি জানে। বুঝতে অসুবিধা হয় না কেউ ধর্ম পালন বা বিশ্বাস করুক বা না করুক, কোন ধর্মে জন্ম কার।) “তুমি তোমার মতই থাকো। আশা করি একদিন তার এই ম্যাচুওরিটি আসবে যখন বুঝবে মানুষের পরিচয় ধর্মে নয়। একদিন বুঝবে মুসলমান মানেই সন্ত্রাসী নয়। (তার তো জানা নেই আমরা ধার্মিক না অধার্মিক, বিশ্বাসী না অবিশ্বাসী)। বন্ধুটি দীপ্তকে কোনো খারাপ কথা বলে না। কিন্তু মুসলমান মানেই ‘সন্ত্রাসী’, এটা বলে।

কিছুদিন আগে দীপ্তর অন্য বন্ধু (চাইনিজ অরিজিনের) ভারতীয়দের সম্পর্কে ভীষণ রকমের বর্ণবাদী মন্তব্য করে ই-মেইল দিয়েছে। এই ছেলেটিও খেয়াল করেনি দেশ আলাদা হলেও দীপ্ত ভারতীয় রেইসেরই! দীপ্ত তাকে বুঝিয়েছে যে, সে ভীষণ খারাপ কাজ করেছে। তখনো বলেছি, একদিন ও বুঝবে হয়ত! দীপ্তকে একথাটাই বলি, পৃথিবীতে সব পরিচয়ের মানুষের মধ্যেই মন্দ-ভালো আছে। যদি কারো কোনো মন্দ কিছু দেখো, তা গ্রহণ করবে না। যদি তারা অন্যায় করে প্রতিবাদ করবে। প্রতিবাদ সম্ভব না হলে তুমি বুঝিয়ে দেবে তা তোমার পছন্দ নয়। আর এধরণের মানুষের যদি মানসিক সীমাবদ্ধতা থাকে (দুই বন্ধুর মত) এবং যদি বন্ধুত্ব রাখতে চাও, তাহলে এমন কিছু করো বা হও যেন তারা তাদের সীমাবদ্ধতাকে বুঝতে পারে।

গতকাল দীপ্ত এক পর্যায়ে বলেছে, “হু অ্যাম আই?” আমার উত্তর, “মানুষ।” সব সময় এটাই বলে চলেছি, জীবনে যাই অর্জন করো না কেন, তোমার প্রথম ও প্রধান পরিচয় যেন হয়, “মানুষ”।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.