অন্ধকারের বন্ধ ঘরে কারা যেন ডুকরে কাঁদে…

Urmi ATN
ইশরাত জাহান ঊর্মি

ইশরাত জাহান ঊর্মি: শুধুই আমি নই, আজকাল অনেকের ছটফটানি দেখি। যাদের দেখি তারা সবাই মোটামুটি সফল বা বলা যেতে পারে টেকসই-সংসারে, কর্মক্ষেত্রে। তারা দক্ষতার সাথে অফিস সামলায়, পেশায় আরও আপ টু ডেট থাকতে চেষ্টা করে। তারা সকল সামাজিকতায় অংশ নেয়। সেজে-গুজে যায় বাপের বাড়ি বা শ্বশুড়বাড়ির গেট টুগেদারে। বন্ধুদের আড্ডায়ও কখনও কখনও। তারা আসলেই দশভূজা। কিন্তু তবু তাদের চোখের নিচে কালো ছায়া। সেইখানে রাত-বিরেতে অপূর্ণতার জল জমে। জলের শব্দেই কখনও কখনও ঘুম ভাঙে তাদের।

আমি ছাড়াও তুনাজ্জীনা তনু, মেহনাজ বনি, রত্না- এইসব আপাত: টেকসই মেয়েগুলা সারাক্ষণ ছটফট করে। চাকরি এবং সংসারে মোটামুটি একটা স্বচ্ছন্দ সফলতা ধরে রাখতে সবার আগে কুড়ুলের কোপ পড়েছে তাদের শিল্পচর্চার বৃক্ষতে। তাদের কেউ গান গাইতো, কেউ আবৃত্তি করতো, কেউ আবার মঞ্চ নাটকের প্রিয়মুখ ছিল। শুধুই হৃদয়বৃত্তি নয়, জীবনের একটা অংশ ছিল তাদের এইসব শিল্পের চর্চা।

সংসারে ঢোকার পর শুনতে হলো, অনেক তো করেছ, যখন ছাত্র ছিলে, তখন সময় ছিল, করেছো, এখন তো আর সেই সময় বা বয়স তোমার নেই। অর্থাৎ, এগুলো নিতান্তই শখের চর্চা। সিরিয়াস কিছু নয়। একটা সময় পর্যন্ত সবাই একটু-আধটু করে, তারপর আর দরকার নেই।

একসময় মেয়েদের চাকরি করা নিয়েও এরকম মতামত চালু ছিল। স্বামী স্বচ্ছল, তবে আর স্ত্রীর চাকরি করা কেন? ঘরে সন্তানকে মানুষ করে তুলতে তো মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে জরুরি, তাই না? অর্থের বিষয় যুক্ত থাকাতেই সন্তানের লালন এবং মানুষ করে তোলার এইসব মহত্ত্বের বুলি অসাড় প্রমাণিত হয়েছে। চাকরি করা মায়েদের বাচ্চারা এখন বড় হয়, মানুষ হয়। হয়তো সহজ নয় পুরো প্রক্রিয়া, তবু যেভাবেই হোক ব্যবস্থা হচ্ছে।

কিন্তু শখের শিল্পচর্চা? আমার খুব ঋতুপর্ণ ঘোষের ১৯শে এপ্রিল সিনেমাটার কথা মনে পড়ে। নাচের জন্য স্বামীর কূপমণ্ডুকতার অত্যাচার তো বটেই শেষকালে এসে মাকে ভুল বোঝে একমাত্র মেয়েও। অভিমানী মেয়ে মনে করে, মা খুব বহি:মুখী, মেয়ের জন্য সময় নেই তার। কাজের মানুষের কাছেই বড় হয়ে ওঠা মেয়ে মিঠু একা একা গোপন দু:খ পোষে। মা আর মেয়ের মধ্যে কোন সেতু তৈরি হয় না। তাই মা যখন এই নাচের জন্যই বড় একটা পুরস্কার পায়, তখন মেয়ে সেই সাফল্যকে উপভোগ করে না। কিন্তু এতসব প্রতিবন্ধকতার পরেও অপর্ণা সেন (মা) দৃঢ়চিত্ত। সে তার সাধনাকে ছাড়ে না।

আমি ভাবি, আসলে শুধুই কি সংসার বা অন্যান্য ব্যস্ততাই শিল্পচর্চার একমাত্র শত্রু। নগর জীবনের কাঠামোর কথা ভাবি। আমি যদি আবৃত্তি চর্চাটা জিইয়ে রাখতে চাই, তাহলে অফিস শেষে আমাকে যেতে হবে টিএসসসিতে রিহার্সেলে। সেখানে অধিকাংশ পুরুষেরা আসবেন হেলে-দুলে, তারা চা খাবেন, আড্ডা দেবেন, তারপর একসময় একটু আধটু রিহার্স করবেন, করাবেন। আমার তখন বারবার মনে হবে, কতক্ষণে ফিরবো আদাবরে, মেয়েটার কাছে।

রাস্তা মানে তো দুস্তর পারাবার, ৮টায় রওনা দিলে ১০টায় হয়তো পৌঁছাবো। থিয়েটারে যারা কাজ করেন, তাদেরও একই অবস্থা। ছেলেদের ক্ষেত্রে বিষয়টা সামান্য আলাদা। তারা অফিস শেষে মোটামুটি নিশ্চিন্তেই শিল্পচর্চা করতে পারেন, কারণ তাদের বাড়িতে স্ত্রী আছে বাচ্চা দেখার জন্য। নারীদের মতো তাদের অতটা অপরাধবোধে ভূগতে হয় না।

আমি, মেহনাজ, রত্না-আমরা প্রায়ই কিছু একটা করবো বলে প্ল্যান করি, তারপর সেসব ভাবনাবন্দি হয়েই থাকে। তারপর যখন ফেব্রুয়ারি মাস আসে, অথবা বিজয়ের-শহর হেসে ওঠে গানে-নাটকে-কবিতায়, আনন্দে ঝলমল করতে থাকে মঞ্চগুলো, তখন আবার আমরা মলিন হয়ে যাই। কেউ কেউ হয়তো জোর করে গ্রুপে যাইও, কিন্তু শো করার সময় পাই না। চর্চার এইসব মাধ্যমগুলিতে নিয়মিত না হলে দক্ষতায় তো মরচে পড়বেই। তাই আমরা আবারও ছটফটই করতে থাকি।

তবে কি আমাদের প্রায়োরিটি সেটিং ঠিক নেই?  চাকরি আর সংসার আমাদের প্রায়োরিটি। খুব ডেডিকেশন থাকলে নিশ্চয়ই পারতাম। তাই যদি হয়, তাহলে কেন মঞ্চের আলোর ঝলকানির জন্য সারাক্ষণ ছটফটানি? আমার, তনুর, মেহনাজ, রত্নার?

আমরা কেন ভাবি, একদিন আমরা সব বাদ দিয়ে এখানেই নিয়মিত হবো? ডেডিকেশন নিশ্চয় আছে, উপায় নেই, উপায় নেই। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে আমাদের কেন কষ্ট হয়? কেন মনে হয়, মিনিংলেস একটা জীবন কাটাচ্ছি? কে দায়ী? আমরা নিজেরা নাকি সুযোগ-সুবিধা না থাকা নগরজীবন?

আমাকে একজন বলেছিল, সারাদিন অফিস করে, ফেরার যুদ্ধ শেষে, ঘরে ফিরে স্বামীর সাথে ঘুমাতে পর্যন্ত যেতে ইচ্ছা করে না। দুজন দুদিকে মুখ করে অঘোরে ঘুমায়। এভাবে তো রীতিমতো নিজেদের মধ্যে সম্পর্কটাই নষ্ট হচ্ছে। আবার আরেকজন বলেছিল, এখন সামাজিকতা পর্যন্ত করার সময় নেই। ছুটির দিনেও কোন দাওয়াত থাকলে একটু দূরে হলে যেতে দুইঘন্টা পর্যন্ত সময় লাগে। যাওয়ার পর আধা ঘন্টা থেকে আবার দৌড়ে বাড়ি ফিরতে হয়।

এভাবে একটা শহর মানুষকে কিভাবে দিনে দিনে অসামাজিক, সম্পর্কহীন, সংস্কৃতিহীন  অর্ধমানব বানিয়ে ফেলছে, কেউ কি তা ভাবছে? কিছু একটা করতেই হবে, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে, নিজের আত্মাকে বিদীর্ণ না করতে দিতে চাইলে কিছু একটা করতেই হবে…কিন্তু কে শুনবে অতল জলের গান?

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.