রোজ নামচা-৩০ (কারপেথিয়ানের গোলাপকুঁড়ি)

women hood 2লীনা হাসিনা হক: তাকে দেখি সুইডেনের লুনড শহরে। বেড়াতে গিয়েছিলাম বিখ্যাত লুনড বিশ্ববিদ্যালয় আর লুনড বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখতে। সকাল এগারোটার দিকে লুনড পৌঁছে খানিকটা ঘুরাঘুরি করে একটু বিশ্রাম নিতে বসলাম প্রায় এগারশ বছরের পুরনো স্কয়ারে।

অক্টোবর মাস হলেও রোদ্দুর ভরা দিন বলে বেশ ভালই পর্যটকের আনাগোনা। ছোট বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে স্কয়ারের মাঝ বরাবর একটি ভাস্কর্য আর জলের ফোয়ারাকে ঘিরে। স্কয়ারের এক কোনায় কিছু ভ্রাম্যমান খাবারের দোকান, আমাদের দেশে যেম ফুচকা-চটপটি বিক্রি হয়, তেমনি। তবে এখানে প্যানকেক, পপকর্ণ, হটডগ, সরমা (আরবী বা টার্কিশ খাবার, ঢাকায়ও পাওয়া যায়) বিক্রি হচ্ছে আর বিক্রি হচ্ছে গরম মধুতে মিশিয়ে আখরোট আর অ্যামন্ড বাদাম।

আমি প্যানকেক কিনতে গেলাম, ইউরোপে এই চিতই পিঠাটিতে আবার কলা মেশানো হয় যা আমার পছন্দ নয়। কলা ছাড়া চাইলাম। হাসলেন মধ্যবয়স্কা বিক্রেতাটি। নিজেই ভাজছেন, নিজেই পয়সার হিসাব রাখছেন। আমাদের দেশের পথের ধারের শীতকালীন চিতই বা ভাঁপা পিঠা বিকিকিনি করা যে কোন খেটে-খাওয়া নারীর প্রতিবিম্ব। কোনও ইংরেজি শব্দ জানেন না, কিন্তু তাতে ইংরেজিভাষী ক্রেতার কাছে পিঠা বিক্রি করা আটকায় না, যদিও আলাপ এগোয় না।

আমার সাথে ছিল রাজেশ, আমাদের স্টুডেন্ট ইন্টার্ন। সে আবার ডেনিশভাষী। ডেনিশ আর সুইডিশ ভাষার মধ্যে খুব বেশী ফারাক নাই। রাজেশকে বললাম, আমি আলাপ করতে চাই এই নারীর সাথে, সাহায্য করো।

নারীটি দেখা গেলো সুইডিশ ভাষাও তেমন জানেন না, কোনরকমে কাজ চলে। তাঁর নাম সোফিয়া। পূর্ব ইউরোপের দেশ রুমানিয়া থেকে পাড়ি জমিয়েছেন সুইডেনে। আরও দু একটি শহর ঘুরে লুনডে থিতু হয়েছেন তাও প্রায় বছর হয়ে এলো। রুমানিয়ার অর্থনৈতিক ধসের সময় তাঁর স্বামীর রুটির কারখানার কাজটি চলে যায়। নিজেদের একটি ছোট্ট বাড়ী ছিল। সেটিও বিক্রি করে দিতে হয় অভাবে পড়ে। তিন ছেলে যার যার মতন করে জীবন চালাচ্ছে। একজন রয়ে গেছে রুমানিয়াতেই, দুইজন পাড়ি জমিয়েছে জার্মানিতে। ফোন করে মাঝে মাঝে। একটি মেয়ে, তাঁদের সাথেই থাকে, একটু পরেই আসবে সে।

সোফিয়ার স্বামী বয়স্ক, কর্মহীন আর পানাসক্ত। খাবার না জুটলেও ভদকা তার চাই-ই চাই।

ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়া ভদকার জন্য বিখ্যাত হলেও সুইডেনও কম যায় না।

সোফিয়ার পিঠা বিক্রির আয়ে সংসার চলে কিনা জানতে চাই। সোফিয়া আমার দিকে তাকান। তার কোঁচকানো ধুসর চোখের তারার ভাষা বুঝি না। এইসব পূর্ব ইউরোপীয় উদ্বাস্তুদের কেউই ভালো মনে নেয় না এই সচ্ছল দেশের মানুষরা, কিন্তু মুখে কিছু বলে না হয়তো। শহরের একপ্রান্তে সোফিয়ারা থাকেন। সকাল-বিকাল সোফিয়ার স্বামী রেল স্টেশনে ভিক্ষা করতে যায়। রবিবারে চার্চের চত্বরে বসে, সেইদিন একটু বেশী পরিমাণে দান পাওয়া যায়। মেয়েটি ছোটখাটো কাজ করে মাকে সাহায্য করে। মেয়েটি থাকতে চায় না এখানে। প্রতিদিন সে বলে, কিছু পয়সা জমলেই তারা চলে যাবে তাদের ছোট্ট গ্রামটিতে। যেখান থেকে কারপেথিয়ানের মায়াবী সৌন্দর্য হাতছানি দেয়।

কথা বলতে বলতেই সোফিয়ার মেয়েটি এলো। মারিয়া নামের বছর বিশের মেয়েটি, রোগা পাতলা, খাড়া নাক, পূর্ব ইউরোপীয় সাধারণ চেহারা। কাঁধে একটি বড়সড় ঝোলা। বাদামী চুল। লম্বা একটি কালো কোট পরে আছে সে। চোখ দুটি সবজে নীলাভ, একটু বিষণ্ণতায় ছাওয়া কি? হাই ইশকুল পর্যন্ত পড়েছিল সে। আমার নিজের মেয়ের থেকে অল্প কয়েক বছরের বড়ই হবে সে, চেহারায় এখনো কিশোরী ভাব রয়ে গেছে। একটু-আধটু ইংরেজী বলতে পারে। সুইডিশ মোটামুটি কাজ চালানো গোছের জানে।

দোভাষী রাজেশের মাধ্যমে জানতে চাইলাম কি কাজ করে। বয়সের তুলনায় তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে একটু খর গলায় বলল, যখন যা পাই তাই করি। বুঝলাম বিরক্ত হচ্ছে। তাও নাছোড়বান্দা আমি, জিজ্ঞ্যেস করি, দেশে ফিরে যেতে চায় সে, কিন্তু সেখানে কি তার জন্য কোনও ভবিষ্যৎ আছে? কি ভাবে সে জীবন নিয়ে? কিছুটা রুঢ়ভাবে বলল সে, ‘এখানে থেকেই বা কি ভবিষ্যৎ? ওটা আমার দেশ। কিছু না কিছু করতেই পারবো। এখানে মানুষের জীবন তো নয় আমাদের। মা-বাবা ফিরে না গেলেও আমি ফিরে যাব, ভালো কিছু করবো নিজের দেশে সম্মানের সাথে। এতে কি তোমার কোনও অসুবিধা আছে?’ তার শেষের প্রশ্নে ভাবলাম কেটে পরাই ভালো, তাছাড়া আমাদের পিঠা কেনাও শেষ। বের হলাম আবার শহর দেখতে।

ঘুরেফিরে শেষ বিকেলে ট্রেন ধরতে যাওয়ার আগে আরেকবার গেলাম স্কয়ারে কফি খেতে। বিকেল সাড়ে পাঁচটার ট্রেন ধরে কোপেনহেগেন ফিরে যাব। সোফিয়ার দোকানের ঝাঁপি বন্ধ। দুটো কফির দোকান ছাড়া চত্বরের আর সব দোকানই প্রায় বন্ধ। ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করেছে, হাওয়া কনকনে হয়ে লাগছে। স্কয়ারে লোকজন বলতে দু’একটি যুগল আর হাতে গোনা কজন মানুষ কফির মগ হাতে এখনো বসে। কফি শেষে চলে এলাম হাঁটতে হাঁটতে রেল স্টেশন।

ছোট্ট ছিমছাম স্টেশন, এই ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যায় মনে হল যেন আমরা ছাড়া আর কোন যাত্রীও নাই। ওভারব্রিজ পার হয়ে ওইপারের ট্র্যাকে ইন্টারন্যাশনাল ট্রেন থামে। হোক না পঁয়তাল্লিশ মিনিটের দূরত্ব- দুটি আলাদা দেশ বলে কথা। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় দেখলাম সিঁড়ির কোনায় একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে, সাজ পোশাকে কেমন কেমন একটা ব্যাপার আছে। এই শীতেও ছোট স্কার্ট আর গলা খোলা ড্রেস, পায়ে যদিও বুট আছে। সাজও একটু কেমন যেন চড়া, সাঁঝের এই আবছায়াতেও চোখে লাগে। এই দেশে কারো দিকে একবারের বেশী দুইবার তাকানো একধরনের অভব্যতা বলে বিবেচনা করা হয় জানা সত্ত্বেও পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালাম মেয়েটির দিকে। কানে বড় বড় দুল, গলায় ঝকমকে মালা ঝোলানো চড়া সাজের এই মেয়েটি যে সোফিয়ার সেই মেয়েটিই তাতে আমার কোনও সন্দেহ রইল না। কারপেথিয়ান পর্বতমালার মতন নীলাভ সবুজ চোখের বিষণ্ণতা এতো সাজের পরও ঢাকা পড়েনি।

রাজেশ আমার হাত ধরে টানল। ট্রেন স্টেশনে ঢুকেছে। পিছনে তাকিয়ে মারিয়াকে দেখতে দেখতে মাথার মধ্যে নাড়া দিয়ে উঠলো শাহরিয়ার কবীরের লেখা একটি বইয়ের নাম- কারপেথিয়ানের কালো গোলাপ! এই গোলাপকুঁড়িটিও তো কারপেথিয়ানের পাদদেশ থেকে এখানে এসেছে। কুঁড়িটির ফুল হয়ে ফোঁটার স্বপ্ন কি এই রেল স্টেশনের ওভারব্রিজের আলো-আঁধারীতেই শেষ হয়ে যাবে? নাকি বেঁচে থাকার সংগ্রাম সে চালিয়েই যাবে!

আমি ইউরোপের সকল কেতা ভুলে পিছন ফিরে তাকিয়েই রইলাম। ট্রেনে চড়েও আবার দরজা দিয়ে মুখ বের দেখলাম, মারিয়াও তাকিয়ে আমার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে, সেই দৃষ্টিতে আমি স্পষ্ট দেখলাম সংকল্প, জীবনে হেরে না যাওয়ার সংকল্প, জীবনের এই সাময়িক ঝঞ্ঝা পেরিয়ে যাবার সংকল্প। আমাকে অবাক করে দিয়ে হাত নাড়ল মারিয়া, আমি হাত নাড়তে নাড়তে খেয়াল করলাম কোনও কারণ ছাড়াই আমার চোখ দিয়ে জল পড়ছে।

পৃথিবীর যেই প্রান্তেই যাই, কেন শুধু সংগ্রামী নারীদের সাথেই আমার দেখা হয়। একি আমার ভাগ্যলেখা যা আমাকে বারে বারে তাঁদের কাছেই টেনে নিয়ে যায়! (চলবে)

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.