আমরা যারা একলা থাকি-৩৯

0

imp 1উইমেন চ্যাপ্টার: ফেসবুকেই একজনের স্ট্যাটাস পড়ছিলাম। লেখাটা মনে ধরলো। অপরিচিত ওই বন্ধুটি লিখেছেন, ‘সম্পর্ক কখনো শেষ হয়না। শেষ হয় দুজনের দেখা। শেষ হয় একসাথে পথচলা। দূরত্ব বাড়তে বাড়তে দুজন দুদিকে চলে গেলেই সম্পর্ক শেষ হয় না। আবার কখনো দেখা হয়, কোনদিন দেখা না হলেও মনে পড়ে যায়। মনের অজান্তেই মনে পড়ে যায়। বিড়বিড় করে পুরনো কথা ভাবি আর বলি – একটা মানুষ ছিল। সে মানুষটা কোথায়? কেমন আছে?

ভালো থাকলে ভালো, খারাপ থাকলে আমার কী! আমিও যে তেমন ভালো নেই! তবু আলাদা হয় মানুষ, আলাদা হবার অভিনয়ে। সম্পর্ক শেষ হয়না, আমরা রাখতে পারি না। সম্পর্কে জড়ালেই বিপদ, কখনো ভোলা যায় না। প্রত্যেকটা মানুষই বিপদে আছে, যে যার মত করে অল্প, ভয়ংকর কিংবা নিষ্ঠুর “না ভুলতে পারা” জনিত বিপদে’।

এটা তো গেল, সম্পর্ক ভুলতে না পারার কথা। কিন্তু কিছু সম্পর্ক যা কিনা সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে জ্বালায়-পোড়ায়, জানান দিয়ে যায়, ‘আমি ছিলাম, আমি আছি’, সেইসব সম্পর্কের তিক্ততা

বা অম্ল-মধুরতা নারী-পুরুষ দুজনকেই ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। তবে নারীকেই যেহেতু এর দায়ভার নিতে হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, পুড়েও সে বেশি।

একজন সিঙ্গেল মা ইদানিং প্রায়ই আমাকে ফোন করেন, যিনি স্বামী-সন্তান থেকে বিতাড়িত হয়ে একদিন দেশ ছেড়ে গিয়েছিলেন প্রচণ্ড অপমান আর যন্ত্রণা নিয়ে। যখন বুঝেই গিয়েছিলেন যে, মেয়েকে আর পাবেন না তিনি, লন্ডনে পড়তে চলে গিয়েছিলেন। এর মাঝে দেশে ফিরে বার বার চেষ্টা করেও মেয়েকে দেখতে  পাননি তিনি। এই কষ্ট নিয়ে পার করেছিলেন দীর্ঘ আটটি বছর। আর দুবছর থাকলেই যেখানে তাঁর থাকার অনুমতি মিলতো, তখনই ডাক পড়ে মেয়ের।

মেয়ের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে হঠাতই। লেখাপড়া বন্ধ করে মেয়ের বিয়ে দিতে চায় বাবার পরিবার। কিন্তু ‘ও’ লেভেল পড়ুয়া মেয়ে বেঁকে বসে মায়ের সাথে যোগাযোগ করে। এতো বছর পর মেয়ের কাছ থেকে সাড়া পেয়ে আগেপিছে কিছু না ভেবেই মা চলে আসেন দেশে।

একটা ভাল চাকরিও পেয়ে যান, মাইনে ভাল, সম্মানজনক অবস্থান। শুরু করেন মেয়ের সাথে নতুন সংসার।  মা ফিরে পান নিজের আত্মজাকে, একটু একটু করে সংসারের জিনিসপত্র কিনে ঘর সাজান, স্বপ্ন সাজান। মেয়েও খুশি, মাও খুশি।

এদিকে বাবার সাথেও যোগাযোগটা আছে মেয়ের। প্রায়ই যায় দেখা করতে, দু’একদিন করে থাকেও সে ওখানে। মা বাদ সাধেন না। এভাবেই চলছিল। কিছুদিন ভালো কাটলেও, আস্তে আস্তে দেখা দেয় ভাঙন। মা-মেয়ের সম্পর্কে প্রায়ই তিক্ততা সৃষ্টি হয়। বাবার বাড়িতে গিয়ে মায়ের নামে শুনে আসে নানান কথা, মা-ও স্বাভাবিকভাবেই পুরনো ক্ষতের কারণে কিছুটা অসহিষ্ণু বাবার প্রসঙ্গে। ফলে দুজনের মধ্যে বনিবনার চেয়ে কথা কাটাকাটি আর ক্ষোভ কেবলই বাড়ে।

মাত্র কয়েকদিন আগেই একদিনের ঘটনা মাকে একেবারে ভেঙেচুরে দেয়।  হঠাৎ অফিস থেকে চলে এলেন আমার কাছে। ‘আপা, আমি কী করবো মেয়েটাকে নিয়ে?’ কিছুটা অবাক হলেও বুঝলাম সমস্যাটা গুরুতর। মা বললেন, ‘মেয়ে তার বাবার কাছে চলে যাবে বলছে। কিন্তু এটাও বলছে যে, খরচ সে মায়ের কাছ থেকেই নেবে’। খুব পরিচিত ঘটনা। বাবার টাকার জোর না থাকায় মায়ের কাছে বাধ্য হয়ে থাকা, কিন্তু মাকে প্রতি মূহূর্তে ঘৃণা করা, এ তো ঘর ঘর কা কাহিনী।

জানতে পারি, ওইদিন খুব সামান্য কথা থেকেই  কথা কাটাকাটি।  মেয়ে রাগ করে দরজা বন্ধ করে দেয়ায় মায়ের বুক ধড়াস করে উঠে। জোর করে তিনি ঘরে ঢুকলে মেয়ে তার প্রাইভেসি নষ্ট হয় বলে মাকে বের করে দেয় ঘর থেকে। এক পর্যায়ে মা বিষয়টা সামাল দিতে অফিসে চলে যান, এসে দেখেন ঘর লণ্ডভণ্ড। সব কাপড়-চোপড় পড়ে আছে মেঝেয়। মেয়ের ঘরের ফ্যানে ওড়না ঝুলছে। এসব দেখে কোনো মায়ের পক্ষে কী স্থির থাকা সম্ভব! কতটা কষ্ট নিয়ে একজন মা বলেন যে, ‘জানেন আপা, আমার ইচ্ছে করে মেয়ের গালে ঠাস ঠাস করে চড় লাগাই, কত বড় বেয়াদবি! টাকা ছাড়া যেন সম্পর্কই নেই আমার সাথে!’

একমাত্র মেয়ের দিনের পর দিন এসব আচরণে প্রচণ্ডভাবে ভেঙে পড়েছেন উনি। মা-মেয়ে দুজনেই নিয়মিত কাউন্সিলিংয়ে যান একজন মনোচিকিৎসকের কাছে, তারপরও কোথায় যেন বার বার গড়মিল হয়ে যাচ্ছে। দুজন দুজনের ভাষা হয় বুঝতে পারছেন না, নয়তো চেষ্টা করছেন না বুঝতে। নিজের অভিজ্ঞতা এতোটাই নির্মম যে, কোথায় সেই মা’কে একটু সান্ত্বনা দেব, সেই ভাষাও হারিয়ে ফেলি। ভাবতে চেষ্টা করি, আমারও এই বয়সটা গেছে, আমি কি আমার মা’কে এমন কষ্ট দিয়েছিলাম?

কাল সেই মা আবার ফোন করে জানালেন, মেয়ে বার বার বলেছে, বাবার কাছে চলে যাবে, কিন্তু যাচ্ছেও না, হুমকির মুখে রেখেছে। আমি বলি, যেতে দিন। কিছুদিন থেকে আসুক, জীবন কেমন, জানুক। শুনলাম, আগেও সে কয়েকবার গেছে বাবার কাছে। কিন্তু দাদী চান না, মেয়ে তার বাবার কাছে গিয়ে থাকুক। কী এক টানাপড়েন!

মা বলেন, ‘আপা, আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না, আমার সাথে এক সুরে কথা বলে মেয়ে, বাবার সাথে ঠিক তার বিপরীত। বাবার সাথে কথা বলার সময় এতো কোমল, সুন্দর, মোলায়েম কণ্ঠ, অথচ আমার বেলায়? কথাটা শেষ করতে পারেন না, গলাটা ধরে আসে তার। ‘আমার কাছে টাকা চাওয়া ছাড়া যেন আর কোন কথা নেই, কোথাও রিকশা ছাড়া যাবে না, অথচ বাবার কাছে থাকলে এই মেয়েই আবার বাসে যাতায়াত করে’।

মেয়েটার সাথেও কথা বলেছি আমি। এই মেয়েই আমার কাছে মায়ের প্রশংসা করেছে। তার মাকে বাবার দেয়া কষ্টের কথাগুলো সেই প্রথম আমাকে জানিয়েছিল। তাই মায়ের মুখ থেকে মেয়ের কাণ্ডকীর্তির কথা শুনে মেলাতে পারি না। কিন্তু বুঝতে চাই দুটি প্রজন্মকে। কোনো সিদ্ধান্ত জানা না থাকলেও এটুকু বুঝি, দুটি হৃদয়ই ক্ষতবিক্ষত, দুজনই জায়গা খুঁজছে, পাচ্ছে না। ফলে একে-অন্যকে দোষ দিচ্ছে। আমাদের বড়দের কিছু ভুলের মাশুল দেয় শিশুরা। তারা এরকমটি হতে চায় না, কিন্তু হয়ে যায় আমাদের কারণেই। আবার ওরা কখনই আমাদের জায়গা থেকে ভেবে দেখতে চায় না, যখন দেখতে পারে, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। শুধরানোর পথ থাকে না। ততদিনে দুজন আরও দূরে চলে যায় মনের দিক দিয়ে। কিছুদিন আগে সাংবাদিক জয়শ্রীর দুটি বাচ্চার আত্মহত্যার পর একাকি মায়েরা আরও বেশি করে যেন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। আর শিশুরাও মায়েদের সেই দুর্বলতার সুযোগটুকু নিতে পিছপা হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের উপায় কী!

একজন শুধু দায়িত্ব পালন করে যায়, অন্যজন জোর করে সেই দায়িত্ব আদায় করে যায়। মাঝখানের পথটুকু খুবই অমসৃণ। এটা যারা পাড়ি দেয়, কেবল তারাই জানে, কতটা রক্তাক্ত এই পথ। (চলবে)

 

 

শেয়ার করুন:
  • 29
  •  
  •  
  •  
  •  
    29
    Shares

লেখাটি ১৯২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.