শিশুকে উদ্যমি হওয়ার উৎসাহ দিতে হবে

0
Jasmine-Image

মাহফুজা জেসমিন

মাহফুজা জেসমিন: প্রশংসা কোন দোষের বিষয় নয়। ভালো কাজের জন্য প্রশংসা সবারই প্রাপ্য। আর সে যদি হয় নিজের শিশু সন্তান, তার প্রশংসা করতে ভালো লাগে সব বাবা-মার-ই। কিন্তু অতিরিক্ত প্রশংসা বিশেষ করে তাদের বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা শিশু সন্তানদের ওপর ব্যাপক বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে এটি আমাদের অধিকাংশেরই  অজানা।  সম্প্রতি এক গবেষণায় এমনটিই দাবি করা হয়েছে।

ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি পরিচালিত এক সমীক্ষার বরাত দিয়ে সম্প্রতি এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুদের বুদ্ধিমত্তার অতিরিক্ত প্রশংসা তাদের আরো ভালো করার ক্ষেত্রে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

শিশুদের উন্নয়ন সংক্রান্ত এক জার্নালে প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বলা হয়, “শিশুদের বুদ্ধিমত্তার অতিরিক্ত প্রশংসা আরও ভালো করার জন্য শিশুদের আগ্রহকে কোন কোন ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্থও করতে পারে।   বুদ্ধিমত্তার প্রশংসার ফলে শিশুদের উপকারের চেয়ে বরং ক্ষতি যাতে না হয়, এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। কারণ শিশুদের  বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করার চেয়ে তাদের উদ্যমের প্রশংসা করাই বেশি জরুরী।”

প্রশংসা করার মাধ্যমে একটি শিশুকে সরাসরি অভিনন্দন জানানো হলে এটা তাকে কঠোর পরিশ্রম করা থেকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। কারণ সে বিশ্বাস করতে পারে যে তার সামর্থ্য উচ্চ পর্যায়ের। অন্যদিকে “তুমি সত্যিই কঠোর পরিশ্রম করেছো” অথবা “তুমি খুব ভাল করছো” শিশুদের এ জাতীয় কথা বলা হলে তারা বুঝতে পারে যে প্রচেষ্টার মাধ্যমেই ভাল ফল পাওয়া যায় এবং এটা তাদের নিজেদেরকে চ্যালঞ্জ করার সাহস যোগায়।

শিশুদের মানসিক অবস্থা মূল্যায়ন করার জন্য যে সব বাবা-মা’র ছোট বাচ্চা আছে তাদের উপর ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি এ সমীক্ষা চালায়। সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে যে, যেসব অভিভাবক তাদের সন্তানদের ‘প্রচেষ্টার’ জন্য তাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন সেসব শিশুরা চ্যালেঞ্জ গ্রহনের ক্ষেত্রে এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা এটাও বিশ্বাস করে যে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা নিজেদের উন্নয়ন ঘটাতে পারবে।

এই গবেষক দলের প্রধান ড. এলিজাবেথ গিউন্ডারসনের মতে, “ছোটবেলায় শিশুদের প্রশংসার ক্ষেত্রে যদি অভিভাবকদের প্রশংসার বৈশিষ্ট্যের উন্নয়ন ঘটানো যায় তাহলে শিশুদের এটা বিশ্বাস করানো যেতে পারে যে তাদের নিজেদের উন্নতি ও অধিক বিকাশ ঘটানো সম্ভব এবং যে কোন চ্যালেঞ্জিং কাজে নতুন কিছু শেখার সম্ভাবনা তৈরি করে দেয়।”

কার্যত, যেসব অভিভাবক শিশুদের বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করেন তারা বিশ্বাস করেন যে তারা যথার্থ কাজই করেছেন। কিন্তু অনেক গবেষণা এটা জোরালোভাবে প্রমাণ করে যে এটা ভিন্নভাবে করা যেতে পারে। একটি শিশুকে ‘বুদ্ধিমান’ আখ্যা দেয়ার মাধ্যমে তাকে খারাপ ফলাফল থেকে রক্ষা করা যায়না; প্রকৃতপক্ষে এটাকে তার খারাপ ফলাফলের জন্য দায়ী করা যেতে পারে।

কাজেই নিজেদের সন্তানকে একটি ভালো স্কুলে ভালো শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়ার পাশাপাশি তারা যেন পরিবারের অভিভাবকদের কাছ থেকে সঠিক শিক্ষাটা পায় সেদিকেও নজর দিতে হবে। অভিভাবকদের এটা মনে রাখতে হবে যে, একটি ভালো স্কুল এবং স্কুলের শিক্ষকগণ লেখাপড়ার পাশাপাশি নিয়মানুবর্তিতা শেখায়। কিন্তু পরিবারের শিক্ষাটা পায় তার অভিভাবকদের কাছ থেকে। এক্ষেত্রে অভিভাবকরা যদি অতিস্নেহে সন্তানদের গঠনমূলক সমালোচনা না করেন কিংবা ‘সে অনেক বুদ্ধিমান’ এমন প্রশংসায় উচ্ছসিত থাকেন তা তাদের সন্তানদেরকে পরিশ্রম বিমুখতো করবেই। তাদের সামনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়ও বাধা সৃষ্টি করে। মোট কথা তারা সব সময়ই কারো না কারো ওপর নির্ভরশীল হবে। কখনো বাবা মা। কখনো শিক্ষক। কখনো বা বন্ধু-বান্ধব বা অন্য কেউ।

কলম্বিয়ার মনোবিজ্ঞানী ক্যারোল ডোয়েক এবং তার দল ডজন খানেক স্কুলে শিশুদের উপর প্রশংসার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং এই প্রভাবের ব্যাপকতার উপর মন্তব্য করেছেন। ডোয়েক বলেন, “প্রচেষ্টার উপর জোর দেয়া হলে তা শিশুদের মধ্যে একটি পরিবর্তন এনে দেয় যা তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সফলতা তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। প্রাকৃতিক বুদ্ধিমত্তার উপর জোর দেয়া হলে তা শিশুদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এবং ব্যার্থতা ঠেকাতে এটা কার্যকরী ভ’মিকা রাখতে পারে না।”

গবেষকদের মতে, ভালো করার প্রেরণা হিসেবে প্রশংসা কার্যকর হতে পারে। যে বিষয়ের উপর প্রশংসা করা হয় তার উপর নির্ভর করে প্রশংসার প্রভাব প্রচন্ডভাবে ভিন্ন হতে পারে। তাই কার্যকর হওয়ার জন্য প্রশংসা সুনির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন। সেই সাথে প্রশংসার আন্তরিকতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশংসার মাধ্যমে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের কি বার্তা দিতে চাচ্ছেন সে ব্যাপারে ভালোভাবে চিন্তা করার জন্য মনোবিজ্ঞানী এডি ব্রামেলমেন পিতামাতাদের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, অভিভাবকরা যেন এমন প্রশংসা না করেন যা পূরণ করতে গিযে ভবিষ্যতে শিশুরা ভয় পেয়ে যায়।

এ গবেষণা এটাই প্রমাণ করেছে যে, শিশুদের কোন ব্যর্থতা বা সমস্যার ক্ষেত্রে গঠনমূলক সমালোচনা করতে হবে। যাতে শিশুরা শিখতে পারে কিভাবে সমস্যার সমাধান করতে হয়। শিশুদের ব্যর্থতাকে ভয় করা উচিত নয়। অভিভাবকদের উচিত চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে, কঠোর পরিশ্রম করতে এবং সংকল্পের মাধ্যমে উচুঁমানের ফলাফল অর্জন করতে শিশুদের উৎসাহিত করা।

লেখক: সিনিয়র রিপোর্টার, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.