রোজ নামচা- ২৯

0

women abstractলীনা হাসিনা হক: পুরো নাম প্রণতি বালা মুরমু। বয়স প্রায় ষাটের কোঠায়। তাঁর সাথে আমার প্রথম দেখা প্রায় মাস ছয়েক আগে ঢাকা রংপুর হাইওয়ের উপরে সিরাজগঞ্জের সীমানা পার হয়ে একটি পান্থশালায়। যাচ্ছিলাম রংপুরে। থেমেছি বিরতি নিতে, যতটা নিজের কারণে, তার থেকে বেশী দরকার চালককে একটু বিশ্রাম দেয়া। বিশ্রাম মানে নেমে একটু হাত পায়ের আড়মোড়া ভাঙ্গা, চা খাওয়া, টয়লেটের ব্যবহার এই আরকি।

পান্থশালাটির দোতলায় নারীদের জন্য নির্ধারিত টয়লেটের বাইরে টুল পেতে বসা বয়স্ক এই মানুষটির সাথে হাসি বিনিময় হল একটু। আমার চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী আলাপ করতে চাইলাম, কতদিন এখানে কাজ করেন, বাড়ী কোথায় ইত্যাদি।

প্রণতি মুরমু একজন সাঁওতাল। থাকেন পান্থশালা থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের একটি জায়গায়। গ্রাম তাকে পুরোপুরি বলা যাবে না, হাইওয়ের বাড়ীতে বুড়ো স্বামী আর একটি ছেলে। ছেলেটির বয়স প্রায় পঁচিশ। ছেলেটি জন্ম থেকেই হাঁটতে পারে না। মনে হলো হয়তো পোলিওতে আক্রান্ত।  প্রণতির আরও তিনটি ছেলে আর দুটি মেয়ে আছে। তারা সকলেই বিবাহিত আর যার যার মতন করে জীবন পার করছে। তারা পঞ্চগড় আর দিনাজপুরে থাকে।

প্রণতি কেন এবং কিভাবে এখানে এলেন জানার কৌতূহল হলো।

প্রণতিদের আদি বাড়ী দিনাজপুর জেলার সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রামে। নিজস্ব ভিটেবাড়ী ছিল, ছিল একটুকরো ক্ষেতি জমি। এই বছরের (২০১৪ সালের) মাঘ মাসের এক সকালে এক দল লোক লাঠি-বল্লম নিয়ে প্রণতিদের গ্রাম আক্রমণ করে। তার আগের সন্ধ্যায় বাজারে প্রায় অনেকগুলো দোকান পুড়িয়ে তাণ্ডব চালানো হয়েছে। সবই হিন্দুদের দোকান। কারণ ভোটের দিন হিন্দু আর সাঁওতালরা নাকি নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছে। প্রণতির ভাষায়, তিনি বা তার পরিবারের কেউই ভোট কেন্দ্রে যায় নাই, সত্যি বলতে তাদের প্রামের কুড়ি বাইশ ঘর পরিবারের কেউই ভোট কেন্দ্রে যায় নাই।

বাড়ীতে ওইসময় প্রণতি, তাঁর প্রায় অথর্ব স্বামী, পোলিও আক্রান্ত ছেলেটিই ছিল। আর ছিল সেজ ছেলে রমেশ, তার বউটি ভরা পোয়াতি আর নাইওর আসা ছোট মেয়ে। অন্য দুই ছেলে গ্রামের শেষ প্রান্তে থাকে বলে তারা হয়ত ঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে পেরেছিল স্ত্রী সন্তান নিয়ে।

মূহূর্তের মধ্যে চোখের সামনে পূর্বপুরুষের ভিটে পুড়ে ছাই হতে দেখলেন প্রণতি।

তাঁর সেজ ছেলে থাকে পাশের ঘরেই, রমেশের পোয়াতি বউকে একজন ছেঁচড়ে এনে উঠোনে ফেললো। প্রণতির সব থেকে ছোট মেয়ে, অগ্রহায়ণ মাসে বিয়ে হয়ে চলে গেছে স্বামীর বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ে। বিয়ের পর এই প্রথম বাপ-ভাইয়ের বাড়ীতে বেড়াতে এসেছিল দিন কতকের জন্য, সেই মেয়েকে টেনে নিয়ে ভিটার পিছনের ক্ষেতিবাড়ীতে গেলো একজন আর বল্লম নিয়ে পাহারায় আরও কয়জন। পালাক্রমে আরও দু’একজন ক্ষেতিতে গেলো, ফিরে এলো। গাবরু জোয়ান রমেশকে বাইরের খুলিতে ( উঠোনে) কাঁঠাল গাছের সাথে বেঁধে বেদম পিটানো হলো। ক্ষেতির দোলা (নিচু জায়গা) থেকে আত্মজার গগনভেদী আর্তনাদ শুনে শুধু নিজের মৃত্যু কামনা করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেননি প্রণতি। পোলিও আক্রান্ত ছেলেটি সেই সব মানুষের চেহারাধারী হায়েনাদের পায়ে ধরেছিল বোনকে রেহাই দিতে। পঙ্গু এই ছেলেটির পরনের কাপড় খুলে নিয়ে বলা হলো এখনি তাকে খৎনা করিয়ে মুসলমান করা হবে এবং নিজের বোনের সাথে তাকে শারীরিকভাবে মিলিত করতে বাধ্য করা হবে।

প্রণতি মুরমু’র ঈশ্বর সেই সময় গভীর নিদ্রায় মগ্ন ছিলেন। ফুল-বেল-পাতা ভোগের প্রসাদের সেবা তো তিনি কম পাননি, অতি যত্নে-অতি আহারে হয়তো শীতের সেই কুয়াশাঘেরা সকালে তাঁর নিদ্রা গভীর থেকে গভীরতর হয়েছিল। তাই তিনি এসবের কিছুই দেখতে পাননি।

কতক্ষণ এই তাণ্ডব চলেছিল প্রণতি মনে করতে পারেন না, চানও না। যখন পুলিশ এলো ততক্ষণে সেসব লোকেরা চলে গেছে। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করলো। প্রণতির ছেলে এবং স্বামীকেও গ্রামের অন্যান্যদের সাথে বার কয়েক থানায় যেতে হল জবানবন্দী দিতে। দিন কয়েক প্রণতিদের গ্রামে লোকের আসা-যাওয়া অনেক হল। সাংবাদিক, টিভি, ডিসি সাহেব সবাই এলেন। সবাই সাহস দিলেন। এমপি সাহেব কিছু চাল,  টাকা আর কাপড়ও বিতরণ করলেন।  কয়েকদিন দুজন করে পুলিশ গ্রামের পাশে ইউনিয়ন পরিষদ অফিসে বন্দুক বাগিয়ে বসে রইল। ‘এনজিও’র ভাই আর আপারাও এসে ‘নিপট (রিপোর্ট) নিখি নিয়া গেইল ( গেলো)’! তারপরে আর কারো কোনও সাড়া শব্দ নাই।

মেয়ে সেই থেকে থম মেরে আছে। কথা বলে না, খায় না, স্নান করে না। পুড়ে যাওয়া ভিটার ছাইয়ের গাদায় বসে থাকে। প্রণতির মেয়ের জামাই এসে মেয়েকে নিয়ে যেতে চাইল। এই ঘটনায় সে স্ত্রীর কোনও অপরাধ দেখে নাই। তার ভাষায়, পায়ে শুওরের গু লাগলে সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেললেই সেই ময়লা চলে যায়। এক্ষেত্রেও এই ঘটনাটি শুওরের গু এর মতন মনে করাই ভালো।

রাতে প্রণতি আর প্রতিবেশীরা মেয়েকে বোঝাল, এমন সোনার জামাই আর হয় না। মানুষ নয় দেবতা স্বয়ং। সব ভুলে মেয়ের সংসারে ফিরে যাওয়াই মঙ্গল। মেয়ে সারাটা সময় চুপ করেই ছিল, শুধু একবার নাকি বলেছিল, ‘আমার আত্মা মরে গেছে মা’। পরদিন সকালে কাঁঠাল গাছের ডালে মেয়ের ঝুলন্ত মৃতদেহ উত্তুরে হাওয়ায় এদিক-ওদিক দুলতে থাকল। তার পায়ের আবছা হয়ে আসা আলতার রঙ তখনো বোঝা যাচ্ছিল। পায়ের নখে বিয়াতি মেয়ের চিহ্ন রুপোর চুটকি ভোরের প্রথম সূর্যকিরণে ঝিকমিকিয়ে উঠছিল।

কেউ কেউ পুলিশে খবর দিতে বললেও বেশীর ভাগ লোক বুদ্ধি দিলো, পুলিশে খবর দিলে মেয়ের মৃতদেহ শেষ পর্যন্ত দাহ করাই আর হবে না। পুলিশী জেরাতে আরও জেরবার অবস্থা হবে পরিবারটির, উপরন্তু জামাইটির হাতে হাতকড়া পরবার সম্ভাবনা শতকরা শতভাগ। মেয়ে তো আর ফিরে পাবে না তারা, কাজেই এই সব ঝামেলায় না গিয়ে দ্রুত দাহ করে ফেলাই উত্তম। ঘণ্টা কয়েকের মধ্যেই ছাই হয়ে পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে গেল হাসদা নামের তরুণীটি, অসংখ্য স্বপ্ন চোখে নিয়ে জীবন যার মাত্র শুরু হয়েছিল।

আমরা শহুরে লেখাপড়া জানা বিবেকধারী লোকেরা এইসব কথার কিছু জেনেছিলাম, কিছু বলাবলি করবার চেষ্টা করেছিলাম আর বেশীরভাগ সময়টাই চুপ করে থেকেছিলাম।

প্রণতির ছেলেরা পুড়ে যাওয়া ভিটে ছেড়ে পঞ্চগড় চলে গেলো। ওখানে নাকি চা বাগানে কাজ পাওয়া যাচ্ছে আর এই তাণ্ডব সেখানে হয়তো হবে না। বুড়ো-অশক্ত স্বামী আর অথর্ব ছেলেটিকে নিয়ে প্রণতি এখানে-সেখানে কাজ খুঁজে নাটোর হয়ে কিভাবে, কিভাবে যেন এখানে এসেছেন। প্রতিবেশী কপিল নামের একটি ছেলে বাসের হেল্পার, একদিন জানালো পান্থশালায় সাফ-সুতরো করার লোক লাগবে। মাসী (প্রণতি) যদি চায় তাহলে সে নিয়ে যেতে পারে।

প্রণতির বয়সের কারণে বেশী ভারী কাজ সে করতে পারবে না বলে পান্থশালার ম্যানেজার তাকে নারীদের টয়লেটের কাজটা দিয়েছে। পরিষ্কার করা আর টুল পেতে বসে থাকা। সকাল ১১টায় কাজে আসেন প্রণতি আর রাত ১০ টায় শেষ করেন।  মায়না পান পনেরশ টাকা। প্রতিদিনই দশ-বিশ টাকা করে বখশিশ দেয় কোনও কোনও দয়ালু মানুষ, সেটা তার।  প্রণতির নিজের ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়।

যে বাড়ীটিতে তারা থাকছেন সেটি আসলে কোনরকমে মাথা গোঁজার মতন ঝুপড়ি। সুবিধা একটাই, বড় রাস্তার পাশেই সরকারী জায়গা বলে কাউকে কোনও ভাড়া এখনো দিতে হয় না। তারা পাঁচ ঘর সেখানে থাকেন।

কতদিন এই কাজ করতে পারবেন, জানে, না। কিন্তু করবেই বা কি। নিজের জীবন যদি নিজে শেষ করে ফেলা যেতো, তাহলে তাই করতো প্রণতি, কিন্তু তা করলে যে সাক্ষাত নরকভোগ। এই জীবনেও কষ্ট, আবার মৃত্যু পরবর্তী জীবনে কষ্ট পেতে চান না প্রণতি। আর ছেলেটি আছে যে তার। এই অসুস্থ সন্তানটি আর সম্পূর্ণই তার উপরে নির্ভরশীল স্বামীকে তিনি ছাড়া আর দেখার কেউ নাই।

ছেলেরা বলেছে, প্রণতি যদি চায় তাহলে চা বাগানে কাজ পেতে পারে হয়তো। ভাবছেন তিনি, এই অচেনা নির্বান্ধব জায়গায় প্রায় খেয়ে না খেয়ে থাকার চেয়ে নিজের জনদের কাছাকাছিই চলে যাবেন। বখসিশের টাকাগুলো তিনি জমান। গাড়ী ভাড়া লাগবে তো তিনটা মানুষের। আরও খরচ আছে। গিয়েই তো আর ছেলেদের ঘাড়ে চেপে বসতে পারবে না তিনটি পেট। যতদিন কাজ না পায়, খাওয়া চালাতে হবে- একবেলা হলেও। প্রণতির হাতে একটি সবুজ রঙের নোট ধরিয়ে দেই, প্রণতি অবাক বিস্ময়ে তাকান আমার দিকে, হয়তো ভাবেন ভুল করে দিয়েছি। আশ্বস্ত করি যে ওটা তারই। ভেজা চোখে আমার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে শুভকামনা জানান বর্ষীয়ান নারীটি।

ফিরতি পথে ভাবতে থাকি প্রণতির কথা। আরও কত এমন প্রণতি আমাদের সমাজে বেঁচে থাকার সংগ্রামে রত, কয়জনের কথা জানি?

ভাবতে থাকি, গণপ্রজাতন্ত্রী একটি দেশের নাগরিক তার ভোটের অধিকার প্রয়োগ করার অপরাধে (এই ক্ষেত্রে প্রণতিরা ভোটই দেয় নাই) অত্যাচারিত হবে, তার ঘর পুড়িয়ে দেয়া হবে, তার কন্যাকে গণ ধর্ষণ করা হবে, তাকে ঘরবাড়ী থেকে উচ্ছেদ করা হবে আর আমি এবং আমরা প্রণতির হাতে একটি সবুজ নোট ধরিয়ে দিয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ীতে বসে আবেগের ভিয়েন দিয়ে একটি মানবিক লেখা তৈরি করবো, সেই লেখা পড়ে পাঠকেরা আরও আবেগ মেশানো মন্তব্য করবে। আমার দায়িত্ব আমি তো ঠিকঠাকই পালন করলাম ভেবে নিজের বিবেককে বুঝ দিয়ে নুতন কোনও প্রণতির গল্পের খোঁজ করবো।

চলছে এভাবে, চলুক না, কারো কোনও সমস্যাতো হচ্ছে না, হচ্ছে কি? (চলবে)

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.