মেয়েটি এখন নাচে

0

women dress 1সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: মেয়েটির সাথে প্রথম পরিচয় একটি অভিজাত হোটেলের পানশালায়। না, ঠিক পরিচয় না, দেখা হয়েছিল। কথাও হয়নি। হলো আজ।

এই পানশালায় মাসে একবার যাই এক ছেলেবেলার বন্ধুসহ। সুন্দর আলো ঝলমলে পরিবেশ, যারা আসেন সবাই কেতাদুরস্ত। সুন্দর পোশাকে আসেন তারা। হালকা মেজাজে গান বাজে। কখনো সত্তর-আশির দশকের বা তারও আগের সুরেলা হিন্দি গান। শুনি মোহাম্মদ রফি, লতা মঙ্গেশকার, আশা, কিংবা কিশোর কুমারের গান। বাংলা গান কমই বাজে, তবে কখনো কখনো আনুরোধে বাজে কিছু লোক গান। বিদেশি অতিথি থাকেন অনেক, তাই বাজে আশির দশকের জনপ্রিয় কিছু ইংরেজী গানও। আর বাজে গ্লাস আর চামচের টুং টাং আওয়াজ।

আমরা দুই বন্ধু মাসে একবার যাই, যদি দুজনেই ঢাকায় থাকি। দু’একদিনের ব্যতিক্রম ছাড়া একজন মানুষকে সবসময় দেখেছি বসে আছেন, তাও আবার নির্ধারিত একটি সোফায়। বুঝতে পারি বেশ আর্থিক স্বচ্ছল তিনি। নিয়মিত আসেন এখানে।

এখানে যে দাম দিয়ে খেতে হয়, তা চিন্তা করলে এবং আমাদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নিলে, সেখানে যাওয়া মানায় না। কিন্তু আমরা দুই বন্ধু মাসে একবার যাই। কয়েকটি কারণ আছে। এক.. ছোটবেলার বন্ধু, সাথে এই একটা দিনেই এই ব্যস্ত শহরে দেখা হয়। দুই.. পরিবেশটি অসাধারণ. যারা আসেন তারা সবাই পরিণত বয়সের মানুষ। তাই গান যা বাজে তা আমাদের সময়কারই। বিদেশিরা আসে, স্থানীয় অনেক যুগল বা দম্পতিকেও দেখি আসতে। কিন্তু নির্ধারিত সোফায় এই মানুষটিকে দেখেছি একাধিক সঙ্গিনীসহ। এখানে আসেন সন্ধ্যা হতে না হতেই, তার বান্ধবীদের সাথে গল্প করেন, খাওয়া-দাওয়া করেন। ঠিক রাত সাড়ে এগারোটায় উঠে যান।

একদিন নিজেই আলাপ করলেন। বললেন, ভাল আছেন? বললাম, জ্বি আছি। বলেন, এতো কম দেখি কেন? নিয়মিত আসবেন, সন্ধ্যাটা এনজয় করুন। জীবনকে উপভোগ করুন। তাকে তো আর বলতে পারিনা যে, এখানে আসতে যে সঙ্গতি লাগে তা নেই। মাসে যে একবার আসি, তা-ইতো অনেক বেশি। জানালেন তিনি, দেশে থাকলে সপ্তাহে ছয় দিনই আসেন। কাজ করেন বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে। বুঝতে পারি অনেক টাকা বেতন তার।

তিনি যাদের নিয়ে বসেন, তারা সবসময় সুবসনায় থাকেন। সুন্দরীও বটে। আরেকটি বিষয় বোঝা যায় যে তারাও স্বচ্ছল পরিবারের। কিন্তু একদিন ছিল ব্যতিক্রম। আমার বন্ধুর নজর এড়ায়নি।

বলছে, ‘দেখ.. এই মেয়েটি ভদ্রলোকের আর সব বান্ধবীর মতো নয়’। হ্যাঁ আমিও লক্ষ্য করি। খুব সুন্দরী না, তবে অসুন্দরীও নয়। কিন্তু খুবই সাধারণ-সালোয়ার কামিজ পড়া, যা তার অন্যান্য চকচকে বান্ধবীদের চেয়ে তাকে আলাদা করে বুঝিয়ে দেয়। মাসখানেক পর আবার দেখি মেয়েটিকে। কিন্তু এবার বেশ অন্যরকম। দামী পোশাক, ঝলমলে মেকআপ। প্রথমবার যতটা জড়তা দেখেছিলাম, এবার তা নেই। হেসে গড়িয়ে পড়ছে, কখনো ভদ্রলোকের হাত ধরছে। একটা গ্লাসও আছে দেখলাম হাতে, রেড ওয়াইন নিচ্ছে।

তারা সাড়ে এগারোটায় চলে যায়, আমরা আরো কিছুক্ষণ থাকি। আমার বন্ধু বলে, ‘লোকটা কি দারুণ জীবন কাটাচ্ছে’। আমিও বলি, ‘হ্যাঁ দেখলে তো ঈর্ষা হয়’। অনেক মানুষ আসে, তাদেরও সঙ্গী বা সঙ্গীনিদের নানা খুনশুটি দেখি। কিন্তু আমরা কথা বলি তাকে নিয়েই। আমাদের চেয়ে ঢের লম্বা, দেখতে সুন্দর আর অভিজাত পোশাক তার গায়ে।

পরের মাসে আবার যাই। কিন্তু তাকে আর দেখি না। ভাবলাম হয়তো দেশে নেই। তার পরের মাসেও একই অবস্থা, তিনি নেই। এভাবে কয়েক মাস দেখলাম, তিনি নেই। এক সময় আমরাও ভুলে গেলাম তার কথা। সেই সোফায় নতুন নতুন মুখ।

কিন্তু আজ আবার আলোচনায় এলেন তিনি। আমার বন্ধুটির সম্প্রতি এক বড় ব্যবসায়ীর সাথে পরিচয় হয়েছে। ঢাকার অদূরে তার বাগানবাড়িতে এক অনুষ্ঠান হবে, নিমন্ত্রণ পেয়েছে। সেই ভদ্রলোককে বলেই সে আমাকেও সাথে নিয়েছে। কারণ ওখানে যারা যাবে, তাদের সাথে আগে থেকে পরিচয় নেই।

এক ছুটির অপরাহ্নে আমরা রওয়ানা দিলাম। সন্ধ্যার কিছু আগে পৌঁছে গেলাম। আয়োজক ভদ্রলোক আর তার স্ত্রী অত্যন্ত হাসিমুখে আমাদের ভেতরে নিয়ে গেলেন। দেখি আমাদের আগে অনেকেই এসে গেছেন। খোলা জায়গায় শামিয়ানা টাঙিয়ে অনেক চেয়ার-টেবিল আর স্টেজ। গোল টেবিলগুলো এমন করে দেয়া যাতে খাওয়া-দাওয়া আর অনুষ্ঠান দেখা একসাথে চলতে পারে। শুনেছি এরকম অনুষ্ঠান তিনি প্রায়ই করেন।

আমরা দু’জনই বেশিরভাগ অতিথিদেরই চিনি না। তাই পেছনদিকে বসেছি। দেখি গানের দল বাদ্যযন্ত্র সহ অপেক্ষা করছে পাশের একটি খোলা ঘরে। কিছু মেয়ে বেশ কড়া মেকাপে ঘোরাফেরা করছে। এদের একজন আবার হিজাব পরা। হঠাৎ দেখি সে আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে।

এসে বললো, ‘চিনতে পেরেছেন’? কোন হিজাব পরা মেয়েকে আমরা চিনি না, কোনদিন কথাও বলিনি। আমরা তো অবাক। চেনার চেষ্টা করছি। কিন্তু চিনতে পারছি না। শেষ পর্যন্ত সে নিজেই পরিচয় দিল। বললো, ও সেই সাধারণ মেয়ে যাকে আমরা দেখেছিলাম সেই অভিজাত হোটেলের পানশালায় সেই কেতাদুরস্ত মানুষটির সাথে।

জানালো, সেই লোকটি নাগরিকত্ব পেয়ে চলে গেছেন পশ্চিমের এক দেশে। আর ফিরবেন না। কিন্তু যাওয়ার আগে এই মেয়েটিকে ছেড়ে গেছেন এক জটিল পরিস্থিতিতে। এখান থেকে কিভাবে সে বের হবে, কোন উপায় পাচ্ছে না।

সেই ভদ্রোলোকের বহুজাতিক কোম্পানীর সাধারণ একজন স্টাফের স্ত্রী ছিল মেয়েটি। প্রতিষ্ঠানের এক অনুষ্ঠানে তাকে দেখার পর থেকে ফোন নম্বর নিয়ে নিয়মিত যোগাযোগ।

এক সময় তার ব্যক্তিত্ব আর অর্থের প্রলোভনের কাছে সে ধরা দেয়। স্বামীকে না জানিয়ে তাকে সময় দিতে থাকে। গড়ে উঠে এক মধুর সম্পর্ক। স্বামী এক সময় টের পেয়ে তাকে ডিভোর্স দেন। স্বামীর সংসারে টিকতে না পারায় মা ছাড়া সংসারে ফেরা হয়নি তার। বড়লোক বন্ধু একটি বাসা ভাড়া করে দেন শহরের এক প্রান্তে। আসা যাওয়া চলে, হোটেলের পানশালায়ও যাওয়া হয়। সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল।

হঠাৎ একদিন লোকটি বলেন, তিনি চলে যাচ্ছেন। এবং যাচ্ছেন একেবারে। আকাশ ভেঙ্গে পড়ে যেন তার উপর। লোকটি বলেন, ছ’মাসের বাসা বাড়াসহ হাত খরচ বাবদ কিছু টাকা তিনি দিয়ে যাচ্ছেন, এর বেশি তিনি আর কিছু করতে পারছেন না। ‘আমি নিয়েছিলাম টাকাটা, কারণ আমার টাকার খুব দরকার ছিল’, বলে মেয়েটি, আমরা দুই বন্ধু শুনে যাই। তারপর যাওয়ার আগে আরো একদিন আসেন তিনি, শেষবারের মতো তারা আন্তরিক হন।

লোকটি তার চলার ব্যবস্থা করবে বলে নিয়ে যায় একজনের কাছে যিনি এই বাড়িতে আজ যে অনুষ্ঠান হচ্ছে সে ধরনের অনুষ্ঠানের ‘অ্যারেঞ্জার’ হিসেবে পরিচিত। এই লোকই এখন তার অভিভাবক। বাসা বদল করে অ্যারেঞ্জার-এর বাড়ির কাছাকাছি এসেছে, ধুমধাড়াক্কা হিন্দি গানের সাথে সেরকম নাচের তালিম নিয়েছে সে। এখন চুক্তিতে নাচে সে হোটেলে, ক্লাবে, বাগানবাড়িতে।

বলে, ‘কাজের সময়টুকু বাদে ধর্মকর্ম নিয়ে আছি। আমি একটা ফাঁদে পড়ে গেছি, কি করে বের হব এখান থেকে? যদি বেরও হই তবে কোথায় যাব’?

আমি আর আমার বন্ধু চুপ করে থাকি, কোন উত্তর নেই আমাদের কাছে। সময় হয়, তার ডাক পড়ে, কারণ নাচার সময় হয়ে গেছে তার।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, সাংবাদিক

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৬০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.