শিখরছোঁয়া অহংকার……

0

Wasfiaফারহানা আনন্দময়ী: ‘নিজেরে করো জয়’……কথাটা গুরুদেব লিখেছেন খুব সহজ করে, কিন্তু কাজটা কি অতোটাই সহজ ? সত্যিই কি জয় করা যায় নিজেকে ? হ্যাঁ, জয় যে করা যায়, তার একটা হৃদয়রাঙা অভিজ্ঞতা হলো আমার বেশ কিছুকাল আগে। আষাঢ়ের পূর্ণিমা সাধারণত এমন হয় না, চাঁদি ফেটে যাওয়া জ্যোছনায় পুড়তে পুড়তে পৌঁছুলাম বিশদ বাংলোয়। সেখানে অপেক্ষা করছিল এক অপার বিস্ময়…একজন মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ কিছু সময় কাটানোর আমন্ত্রণ ছিল। বুদ্ধির দীপ্তিতে ঝলমল করছে তাঁর দু’টো চোখ, আত্মবিশ্বাসের দ্যুতি ঠিকরে পড়ছিল তার পুরো অবয়ব জুড়ে। মুখ থেকে বের হওয়া কথাগুলোর মধ্যে শব্দের কোনো শিথিলতা নেই, পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা নুড়ি পাথরের মত স্বতস্ফুর্ততা তার বলা প্রতিটি শব্দে। সাধারণ ভঙ্গীতে অকপটে শুনিয়ে গেলেন নিজেকে জয় করার অসাধারন এক সাহসী গল্প। তিনি ওয়াসফিয়া নাজরীন, আমাদের শিখরস্পর্শী অহংকার…তিনি শুধু হিমালয়ের সর্বোচ্চ চূড়াই জয় করেননি, জয় করেছেন তার বিশ্বাস প্রতিজ্ঞা আর আমাদের মত স্বপ্ন দেখা, কিন্তু স্বপ্ন ছুঁতে না পারা সকলের স্বপ্ন।

একুশ শতকের এই বিশ্বায়িত সমাজে ওয়াসফিয়া নাজরীনকে বিশ্বের অন্য কোন এগিয়ে যাওয়া সভ্য দেশে আলাদা করে নারী হিসেবে মূল্যায়ন করা হবে না, সে আমি জানি। তাঁকে তারা বলবে হিমালয় জয় করা এক দুঃসাহসী অভিযাত্রী…নারী পুরুষের স্বতন্ত্র জৈবিক পরিচয় সেখানে গৌণ। তবে আমাদের এই পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত, ধর্ম-শোষিত সমাজে তাঁকে অসম্ভবের বিধি নিষেধ ডিঙোনো এক ‘বিস্ময় নারী’ হিসেবে চিহ্নিত করতেই বেশি গৌরব বোধ করছি। তিনি যখন হিমালয়ের সাথে তাঁর ভাব-ভালবাসার গল্প বলছিলেন, তার জীবনের পেছনের কথা বলছিলেন, শুনতে শুনতে কেবল এ কথাই মনে বাজছিল, মানুষ চাইলে সব কিছুই পারে। তবে সে চাওয়ার মধ্যে সততা থাকা চাই, ইচ্ছের জোর থাকা চাই, প্রবল সাহস আর আত্মবিশ্বাস থাকা চাই।

ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় যে কোনও চ্যালেঞ্জিং কাজের জন্য প্রথম এবং প্রধানতম নিয়ামক হলো আত্মবিশ্বাস। তবে ওয়াসফিয়ার কাছে যখন জানতে চাইলাম, তিনি প্রথাগত ধারণার একটু বাইরে দিয়েই কেন হাঁটলেন। তাঁর মতে, জীবন জয় করার প্রধান শর্ত হলো জীবনের প্রতি সততা। নিজের প্রতি সৎ থাকা, তাকে জড়িয়ে থাকা মানুষের প্রতি সৎ থাকা, সর্বোপরি নিজের প্রতিজ্ঞার প্রতি একনিষ্ঠ সততাই তাঁকে আজ তার গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছে দিয়েছে। ওয়াসফিয়া জীবনটাকে শুধু পাহাড়চূড়া জয় করার মতো সাহসী অ্যাডভেঞ্চারে ভরিয়ে রাখেননি। সমাজের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে, সমাজের অসাড়তার বিরুদ্ধে, সাজানো শ্বাসরোধী পেষণের বিরুদ্ধে কম সুবিধাভোগী মানুষের অধিকারের পক্ষে বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় থেকেছেন। তাঁর বয়স বিচার করলে একটু অবাকই হতে হয়, কারণ বয়স অনুপাতে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং অর্জনের পাল্লাটা একটু বেশিই ভারী।

ওয়াসফিয়া নাজরীন নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যবান এদিক থেকে যে, তাঁর বেড়ে ওঠা এবং বড় হয়ে ওঠাটা আমাদের সমাজের গড়পড়তা সাধারণ নারীর বেড়ে ওঠার চেয়ে একটু আলাদা। তার পরিবার তাকে সেই পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে গেছেন যাতে ওয়াসফিয়া তার ইচ্ছের কুঁড়িটাকে নিজ হাতে পাঁপড়ি মেলাতে পারেন। তিনি শুধু তাই হিমালয় চূড়া ছুঁয়ে আসেননি, এর আগেও তিনি আরো দুটো মহাদেশের সর্বোচ্চ চূড়ায় তার পায়ের ছাপ রেখে এসেছেন। এখন তাঁর অর্জনের থলেতে পাঁচটি সর্বোচ্চ চূড়া জয়ের দু:সাহসিক অভিজ্ঞতা। রয়েছে পৃথিবীর সাতটি চূঁড়া জয়ের অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকার শুধু নিজের প্রতি নয়, আমাদের প্রতি, সমাজের প্রতি। বিশেষ করে নারীর অধিকার আদায়ের প্রতি। ওয়াসফিয়াদের মতো ঠিক-ঠিক মানুষেরাই একদিন সমাজকে একটি সঠিক রূপ দিতে পারবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। তার দুঃসাহসিক অভিযাত্রার একটি টুকরো গল্প আমায় দারূণভাবে ছুঁয়েছিল। হিমালয় চূড়ায় দাঁড়িয়ে তার সূর্যোদয় দেখা… আলোর ঢেউয়ে পাল তোলা সেই ক্ষণটি নি:সন্দেহে অবিস্মরণীয়… সে এক অন্য রূপ। মাথার ওপরে নয়, পায়ের নীচে সূর্যোদয়…আমরা মাথা উঁচু করে, চোখ তুলে সূর্যদেবকে দেখি। আর সেদিন সূর্যদেব মুখ উঁচিয়ে আমাদের ওয়াসফিয়াকে দেখেছিল… যেন, শুধু তুমিই তাকে চেয়ে দ্যাখো না, সেও তোমায় চেয়ে দ্যাখে।

ইচ্ছেটাকে জীবনের মুঠোয় নয়, বরং জীবনটাকেই ইচ্ছের মুঠোবন্দী করা যায়… সেই বিশ্বাসটুকু এই সমাজের পিছিয়ে থাকা নারীদের কাছে পৌঁছে দেয়ার এক উদাত্ত আহবান রইল ওয়াসফিয়ার কাছে। শুধু হিমালয় বা কিলিমাঞ্জারো চূড়া নয়, আমাদের নারীরা যেন যে যার কাজের ক্ষেত্রে সফলতার শিখর স্পর্শ করতে পারে, যে যার যোগ্যতার মাপে। মেধা, সততা আর সাহস নিয়ে আপন কর্মক্ষেত্রটি আপন আলোয় আলোকিত করুক… তা সে একজন জীবন কামড়ে ধরা গার্মেন্টস কর্মীই হোক অথবা রাষ্ট্র পরিচালনার শীর্ষপদে আসীন একজন নারীই হোক।

বিশদ বাংলার সেই ছোট্ট পরিসরে সেদিন সন্ধ্যায় আমরা যে ক’জন নারী ছিলাম, আমি নিশ্চিত…আমরা সকলেই সেই সময়টুকুর জন্য অসীম চেজে তেজস্বিনী হয়ে টগবগ করে ফুটছিলাম। ওয়াসফিয়ার সাহসী অর্জনে আমরাও অনেকটা দূর এগিয়ে যাওয়ার সাহস পেয়েছিলাম। ওয়াসফিয়ার সাহস আর অনুপ্ররণায় আমি নিজেই শুধু আত্মবিশ্বাসে নতুন করে জন্ম নিইনি, সাফল্যের এক অমিত আলোয় উজ্জ্বল তাঁর মুখের অবয়বে নিজের আত্মজার মুখটিও খুঁজে ফিরছিলাম। স্বপ্ন আঁকছিলাম সেও একদিন ওয়াসফিয়াকে ছোঁবে, হয়তো অতিক্রমও করে যাবে।

অজস্র ধন্যবাদ ওয়াসফিয়া নাজরীন, আমাদের স্বপ্ন জাগানোর জন্য, সাহস হয়ে সামনে থাকার জন্য… তোমারই হোক জয়।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.