নারী-নিরাপত্তা ও বোরখার অর্গল

0

Afhan Rape 2রওশন আরা বেগম: আমার পরিবারের কয়েকটি নিজস্ব ঘটনা দিয়েই শুরু করতে চাই নারী নিরাপত্তা বিষয়ে কিছু কথা।

আমরা চার বোন। বড় বোন আমাদের অনেক বড়। তাকে নিয়ে যে কাহিনী হয়েছিল তা আজ আর নয়। পর পর আমরা তিন বোন। বোনগুলো ছিল খুব রূপসী। সেই রূপসীর যন্ত্রণাময় কিছু অভিজ্ঞতার কথা শোনাতে চাই। রূপসী হবার কারণে কারও সামনে যাওয়াও মানা ছিল।

এর পিছনে কোন ধর্মীয় কারণ ছিল না। যে কারণটি এখানে কাজ করতো তাহলো এই রূপ যেন কোন পুরুষের নজরে যেন না পড়ে। নজরে পড়লেই এর খেসারত গুনতে হতো অভিভাবককেই, এমন কি কিছু কিছু আত্মীয় স্বজনের সামনেও যাওয়া মানা ছিল। আমার মা এই কাজটি বেশ ভালভাবেই পালন করেছিলেন।

তবে আমার ব্যাপারে ছিল ভিন্ন নিয়ম। রূপসীদের ধারে কাছে না থাকায় আমি কিছুটা স্বাধীনতা পেয়েছিলাম। সবার ছোট বোন সম্ভবত সেভেনে তখন পড়তো। মাঝে মাঝে যাওয়ার মধ্যে একটু ছাদে বের হতো। পাশের কোন এক পুরুষ তাকে দেখে ফেলে। এই দেখে শুধু চোখের দেখা নয়। বাইনোকুলার লাগিয়ে দেখা হয়েছে। দূর থেকে কিছু ছবিও তোলা হয়েছে। কয়েক দিন পরেই ছবিসহ ছেলের মা বাসায় এসে হাজির। ছবি দেখিয়ে আমার মাকে জানায় এই মেয়ের জন্য তার ছেলে পাগল হয়েছে। এই মেয়ে তার চাই। এই কথা শুনে আমার মা সেই দিন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

আমাদের ছাদে যাওয়াও একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল। রূপ দেখে যে ছেলের মাথায় রক্ত উঠে যায়, কামনার রক্ত, সেই রক্ত পানি করার জন্য মা পাগল হয়ে ছুটে আসেন এক বাচ্চা মেয়েকে ধরার  জন্য। এরপর থেকে আমাদের চলাফেরা আরো গোপনীয়তার মধ্যে সারতে হতো। বড় ভাইদের নজরদারীও আরো বাড়ানো হলো। আমার বাবা অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ ভাল ছিল বলেই তিনি আমাদের জন্য একটা নিরাপত্তা বেষ্টনী বানাতে পেরেছিলেন। বড় ভাইদেরও ভাল চাকুরীর বদৌলতে একটা ভাল সামাজিক প্রভাব ছিল বলেই সুন্দরীদের গায়ে আঁচড় কেউ দিতে পারেনি।

এর পরের ঘটনা আরো ভয়াবহ। এক সঙ্গে দুই বোন এক আত্মীয়ের চোখে পড়ে। সেই আত্মীয়টি ছিলেন সমাজে প্রভাবশালীর একজন। তিনি কৌশলে নামকরা এক শিল্পীকে দিয়ে পিছনে কাজ করা শুরু করেন। উনাকে বাংলাদেশের কম বেশী সবাই চেনেন। আমার ছোট বোনটি সবে মাত্র ভিকারুননেছা থেকে পাশ করে ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। খুব ভাল রেজাল্ট করেও ভর্তি পরীক্ষায় তেমন ভাল করতে পারেনি। এর পিছনে কিছু কারণও ছিল,  ঐ একই কারণ। ভার্সিটিতে ভর্তি হবার আগেই শুরু হয়েছে কিছু স্বনাম ধন্য শিল্পীর সাথে যোগাযোগ। প্রায় ফোনে কথাবার্তা হতো। আমাকে সব জানাতো।

তখন সবে মাত্র আমার বিয়ে হয়েছে। যখন আমার বোনটি আমাকে জানালো, এক মহান শিল্পী তাকে মডেল তারকা বানাতে চান। সেই আত্মীয়ের সাথে তার একটা যোগাযোগ জানতে পেরে বাসায় জানাই। তখন সবাই আমার উপর চড়াও হন। আমার স্বামীকে ফোন করে হুমকি দেওয়া হলো। যেন আর এই নিয়ে আর বাড়াবাড়ি না করা হয়। শিল্প সাহিত্যের জগতকে সামনে রেখেও নারীর রূপ নিয়ে কিছু ব্যবসা হয়ে থাকে যা আমি নিজ চক্ষে দেখেছি। আর সেই ফাঁদে নেবার জন্য কিছু পুরুষেরা সুন্দরী নারীর সন্ধানে থাকে। তবে সব শিল্পীরা তো খারাপ না। তেমনি সব পুরুষেরা এই কাতারে নয়। ব্যতিক্রম কিছু আছে।

আজ এত বছর পরে এসে ভাবছি দেশ কি পরিবর্তন হয়েছে? নারীরা কেন নিজেকে বোরখার মধ্যে প্রবেশ করিয়ে নিয়েছে? এই সবই নারীর শরীরের নিরাপত্তা, নারীর যৌন নিরাপত্তা। ঐ সমাজে নারীর নিরাপত্তা নেই। গরীব বাবার ঘরে সুন্দরী মেয়ে জন্ম হলে কি বিপদের মধ্যে ঐ বাবার দিনগুলো কাটে তা ভুক্তভোগি বাবা-মাই ভাল বোঝেন। কয়জন মা বাবার ক্ষমতা থাকে নারীর নিরাপত্তামূলক দুর্গ বানানোর? আর দুর্গ বানালেই সমস্যা সমাধান হবে?

মডেল তারকা বানানোর প্রলোভন দেখিয়ে সুন্দরী মেয়েকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে কি ধরনের ব্যবসায় নামানো হচ্ছে তা অনেকেরই অজানা। মডেলিং কোন খারাপ পেশা না। কিন্তু এটিকে সামনে রেখে আরেকটি অনৈতিক পেশা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এটিকে অনৈতিক বলা হচ্ছে এই কারণে যে সমাজ এটাকে স্বীকৃতি না দিয়ে গোপনে রাখেছে।  সমাজ যদি এই পেশাকে স্বীকৃতি দিত তাহলে সমাজে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হতো। এবং নারীর নিরাপত্তাও কিছুটা বাড়ানো যেত। আজ প্রযুক্তি সবার হাতের মধ্যে চলে এসেছে। সেই প্রযুক্তি কিভাবে ব্যবহৃত হবে তা নির্ভর করে সেই ব্যক্তির মানসিক অবস্থার উপর।

যে পুরুষ নারীর রূপ দেখে কামনায় পাগল হয়ে যায়, যৌন ক্ষুধা মেটানোর জন্য তৎপর হয়, তখন সেই পুরুষের সামনে কিছু সহায়ক প্রতিষ্ঠান রাখা সমাজেরই কর্তব্য ছিল। তাতে সমাজ সুন্দর থাকতো। নারীর নিরাপত্তা বাড়তো। এই কারণেই প্রযুক্তির মাধ্যমে এর তৎপরতা বেড়েছে।

আজ জুকারবার্গকে বাঙ্গালীর কুরুচিপুর্ণ মন্তব্য শুনতে হয় কেন? এর কারণ ঐ সামাজিক কাঠামোর ত্রুটি। অন্যের বউকে দেখতে অনেক ভাল লাগে এবং ভাল লাগার কথাই। এই সত্য কেউ খণ্ডন করতে পারে না। এই সত্যকে সামনে রেখেই সমাজের কিছু প্রতিষ্ঠানের দরকার ছিল। যা সমাজকে সুন্দর রাখতে সহায়তা করতো। কিন্তু সমাজ তা অমান্য করেছে। এই কারণেই সমাজে চাহিদা অনুযায়ী কিছু গোপনীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যা মানুষের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৫৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.