নারী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য পৃথক টয়লেট চাই

0
Sujon

আমিনুল ইসলাম সুজন

আমিনুল ইসলাম সুজন: আজ ১৯ নভেম্বর ২০১৪, বিশ্ব শৌচাগার (টয়লেট) দিবস। এ বছর প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘সমতা ও মর্যাদা’। মূলত কন্যাশিশু ও নারীর জন্য আলাদা, নিরাপদ ও পরিস্কার স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। জাতিসংঘ প্রত্যাশা করে, রাষ্ট্রসমূহ নারী ও কন্যাশিশু এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা স্যানিটেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলবে-যা হবে নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত, পরিবেশবান্ধব ও ব্যবহার উপযোগী।

পৃথিবীতে প্রতি তিন জন নারীর মধ্যে ১ জন নারী তার দীর্ঘ জীবনের কোন না কোন সময়ে বিভিন্ন রকম যৌন হয়রানির শিকার হন। পুরুষের মানসিক বিকৃতিসহ নারী নির্যাতনের নানা ধরনের কারণ রয়েছে। প্রাথমিকভাবে নারী নির্যাতনের সঙ্গে টয়লেটের সম্পর্ক অনুধাবন করা সম্ভবপর নাও হতে পারে। তবে বিশ্বব্যাপী নারী নির্যাতনের অন্যতম একটি কারণ হিসাবে দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থাকে দায়ী করা হয়।

বিশেষ করে, গ্রামীণ ও পাহাড়ি সমাজে অনেক স্থানে আবদ্ধ টয়লেট না থাকায় অনেক নারী ও কন্যাশিশুকে উন্মুক্ত স্থানে টয়লেট-এর কাজ সারতে হয়। এটা নারীর জন্য অবমাননাকর। আর উন্মুক্ত স্থানে টয়লেট করতে হয় বলে নারী রাত গভীর অব্দি অপেক্ষা করে। এটা নারীকে হয়রানির একটা অন্যতম কারণ।

বর্তমান বিশ্বে এখনও একশত কোটি মানুষ স্যানিটেশন ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে, যারা উন্মুক্ত স্থানে টয়লেট ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে এবং এদের অর্ধেক, অর্থাৎ পঞ্চাশ কোটি নারী উন্মুক্ত স্থানে টয়লেট ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। তার মানে এই পঞ্চাশ কোটি নারীকে রাষ্ট্রসমূহ নির্যাতনের ঝুঁকির মধ্যে রেখেছে। এদের অধিকার ও মর্যাদা ভুলুন্ঠিত হচ্ছে।যে কারণে এসব নারী দিনের বেলায় টয়লেট ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকেন।

কারণ, বিশ্বব্যাপী গ্রামীণ পর্যায়ে নারীকে টয়লেট ব্যবহার করার জন্য রাতে বাসার বাইরে যেতে হয়। এ সময়কালে অনেক নারীই নির্যাতনের শিকার হয়েছে-যা বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে এসেছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজেও নারীদের টয়লেটের যাবার সময় ধর্ষণ, খুন, এডিস সন্ত্রাসের শিকারের ঘটনা ঘটেছে।দরিদ্র পরিবারের নারীরা এক্ষেত্রে বেশি হুমকির মুখে রয়েছে। তাই গ্রামীণ, বিশেষত গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের রক্ষা করা রাষ্ট্রসমূহের দায়িত্ব বলে মনে করে জাতিসংঘ। এবং এজন্যই মনে করা হয়, স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মিলেনিয়fম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) অর্জনের পথে আমরা অনেক এগিয়েছি সত্য। কিন্তু নারীর জন্য নিরাপদ ও আলাদা টয়লেট নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশসহ দরিদ্র দেশসমূহে অনেক পিছিয়ে আছে। খোদ ঢাকা নগরীতেই নারীদের জন্য পর্যাপ্ত টয়লেট নেই। সেখানে গ্রামের অবস্থা কিরূপ, সেটা সহজেই অনুমেয়।

স্যানিটেশন ব্যবস্থা শুধু নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তার জন্যই জরুরি। স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্যও জরুরি। কারণ, স্যানিটেশন ব্যবস্থা স্বাস্থ্যসম্মত না হলে মানুষ খুব সহজে অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস, পোলিও, কলেরা, পেটের পীড়া ও চর্মরোগে আক্রান্ত হয়। এতে কর্মক্ষম মানুষের একদিকে উৎপাদনশীলতা কমে যায়, অন্যদিকে অসুখের জন্য অর্থ ব্যয় করতে হয়। এছাড়া প্রতিবছর স্যানিটেশনজনিত ডায়রিয়ায় ৩ লাখ ৪০ হাজার শিশু মারা যায়-যা গড়ে প্রতিদিন এক হাজার। তাই স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নকে অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ বিষয় বলে অভিহিত করা হয়।

আরেকটি মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেট না থাকায় বয়সন্ধিকালে তাদের স্কুলে উপস্থিতির হার কমে যায়। কারণ, এ সময়ে তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুন্ন হয়।

বাংলাদেশে প্রায় ৫০ভাগ মানুষ নারী। এছাড়া ১০ভাগ মানুষ শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। কিন্তু ৫০ভাগ নারীর জন্যই কোন টয়লেট ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি, সেখানে ১০ভাগ প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য দূরের কথা! ঢাকায় পাবলিক টয়লেট অল্প কয়টি রয়েছে। যেগুলো আবার লিজ দেয়ার কারণে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু এসব টয়লেটেও নারী ও প্রতিবন্ধীর জন্য আলাদা ব্যবস্থা লক্ষ্য করা যায় না। যে কারণে ঢাকার কন্যাশিশু ও নারীরা পানি কম খান।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার ৮৫ শতাংশ নারী (যারা শিক্ষা, চিকিৎসা ও পেশা- বিভিন্ন প্রয়োজনে নিয়মিত বাইরে যান)পানি কম খান। পানি কম খেলে মাথা ধরা, কিডনি জটিলতাসহ নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যা হয়। এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নিয়ে সর্বত্র নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা টয়লেট নিশ্চিত করা দরকার।

সম্প্রতি পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) ও ডাব্লউবিবি ট্রাস্ট আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় জানতে পারি, পাবলিট টয়লেট নিশ্চিত করা সিটি করপোরেশন এর আইনী দায়িত্ব। কিন্তু নাগরিক সেবা প্রদানে সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে না।

শুধু সিটি করপোরেশন নয়, অন্যান্য সব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নারীর জন্য আলাদা টয়লেট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এগিয়ে আসতে হবে। বিদ্যমান সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিপণী বিতান, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান-সর্বত্র, যেখানে পুরুষ ও নারী যাতায়াত করে, সেসব স্থানে নারীর জন্য নিরাপদ ও ব্যবহারউপযোগী আলাদা টয়লেট গড়ে তোলা হোক। আজ বিশ্ব টয়লেট দিবসের প্রাক্কালে এই প্রত্যাশা।

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, সদস্য, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)

[email protected]

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৪১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.