একা মায়ের লড়াইকে সম্মান করতে শিখুন

0
Nodi Aus

নাদিরা সুলতানা নদী

নাদিরা সুলতানা নদী: সায়রা বেগমের বয়স যখন ১৪, হঠাৎই তার বাবা প্রায় ৩০ বছরের বড় এক বিপত্নীক পাত্র, যার প্রায় সায়রা’র কাছকাছি বয়সের দুজন ছেলে-মেয়ে আছে এমন একজন ভদ্রলোকের সাথে বিয়ে দিয়ে দেন।  স্বাভাবিকভাবেই সায়রা’র  সংসার আর দশটা মেয়ের মত হয়নি।

একসময় সায়রাও মা হয়, নিজের অনেক অনেক না-পাওয়া কে চাপা দিয়ে নিজের ”মা” পরিচয়ের মহিমা তুলে ধরার তাগিদই জীবন আর বেঁচে থাকার অন্য এক নাম হয়ে দাঁড়ায় তার কাছে। একটা সময় সায়রা বাধ্য হয় দু সন্তান নিয়ে ভিন্ন ঠিকানা খুঁজে নিতে। ‘সায়রা ও তার জীবন’ কে পরিবার ও সমাজ নানান ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলে এই সিদ্ধান্তে।

সায়রা ছোট একটা চাকরি নিয়ে দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে শারীরিক, মানসিক, আর্থিক সব কষ্টে দিন যাপন করেও বাচ্চাদের ঠিক সময় খাবার তুলে দেন, ভালো স্কুলে পড়ান। ছেলেমেয়েকে দিনের পর দিন মাছ-মাংস খেতে দিতে পারেন না, জামা-কাপড় দিতে পারেন না, তারপরও  সেই সময়গুলোতেও এমনভাবে রান্না করেন যেন বাচ্চারা সেটা বুঝতে না পারে, ওরা খেতে বসে মাছ খুঁজে খুঁজেই খাওয়া শেষ করে ফেলে। এই সব সংগ্রামের সাথী হয়ে কেউই থাকে না বা সায়রা নিজেও চান না তার আত্মসম্মানকে বিকিয়ে যে কারো সাহায্য নিতে। দুই একজন মানুষ এগিয়ে আসে, হয়ত কিছু স্বার্থ নিয়েই, কিন্তু সায়রার বয়স কম হওয়াতে, পাড়ার লোকজন সায়রার ধারে কাছে কোন পুরুষ মানুষের আওয়াজ পেলে ধরেই নেন এই লোকের সাথে সায়রা’র অনৈতিক (!) ভাব ভালোবাসা না হয়ে যায়ই না! দিন শেষে সায়রা’র অনেক বেশি  ক্লান্ত লাগে, একা লাগে, কাউকে বলতে ইচ্ছে করে, এই পথ চলা বড় কষ্টের!!!

নিলুফার বানু এইচএসসি পড়ার সময়ই তার কঠিন প্রেমে পড়ে যায় তার খালাতো ভাই। নিলুফার দেখতে সুন্দর, প্রেমিক’টিও তাই। দুজনের চোখেই প্রেমের তাজমহল, ছেলেটি স্বপ্ন দেখায় তারাও গড়বে আরেক তাজমহল। নিলুফারের মা-ভাই-বোন বিষয়টা টের পেয়ে অনেক বোঝায় কেন এই সম্পর্ক ওর জন্যে ভালো হবে না। কিন্তু চোখের ঘোর কাটে না, প্রেমিক সেটি কিছুতেই কাটতেও দেয় না, পালিয়ে বিয়েটা সেরে ফেলে একদিন। হঠাতই মুখোমুখি বাস্তবতার, নিলুফার তার সব ভালোবাসা দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যায় একটা ”সংসার” করার। এর মাঝেই সে এক রাজকন্যার মা এবং স্বামীর অন্যদিকে মনোনিবেশ। কোথায় যেন হারিয়ে যায় সেই প্রথম ঘোর।

শুরু হয় সব হারানো নিলুফারের সংগ্রাম, নিজের মা-বাবা তো আগেই ফেলে দিয়েছে বিয়ের মত একটা সিদ্ধান্ত একা নেয়াতে, তারপর এই হেরে যাওয়া নিলুফার কিছুতেই তার পরিবারের মানুষদের দেখাতে চায় না, কিছুতেই না। শুধু বি.কম ডিগ্রী নিয়ে যে চাকরি নিলুফার ঢাকা শহরে পায় সেটা দিয়ে মেয়েসহ টিকে থাকা অনেক বেশী কষ্টের। মেয়ের মুখে তিনবেলা খাবার তুলে দেয়ার সেই সংগ্রামে সে কাকে পাশে ডাকবে, কোথাও ভালো একটা কাজের আশায় ছুটে গেলে কাজ পাওয়ার আগেই তার দিকে তীর বিদ্ধ হয়ে আসে অন্য রকম চোখ, ছুঁয়ে দিতে চায় কালো হাত। এই সব কিছুর সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকাটা শিখে নিতে হয় শুধু মাত্র মেয়েটার দিকে তাকিয়ে, দিন শেষে তারও অনেক বেশি  ক্লান্ত লাগে, একা লাগে, কাউকে বলতে ইচ্ছে করে, এই পথ চলা বড় কষ্টের!!!

একা মা’কে অনুভব করার চোখের অভাব আমাদের খুব বেশী, তাঁকে ঘিরে ন্যুনতম সহমর্মিতা শ্রদ্ধা বা ভালোবাসা না থাকুক, কিন্তু তাকে নিয়ে ”প্রশ্ন” তোলার লোকের কোন অভাব নেই এই সমাজে। এর মাঝেই ঢাকায় থাকা একজন এইরকম একা মায়ের বাচ্চা দুটো আত্মহত্যা করেছে, এই রকম একটি কষ্টের খবর জেনে যখন আমার চেনা-জানা জগতের ‘একা সব মায়েদের’ সংগ্রামগুলো নিয়ে ভাবছিলাম, তার মাঝেই দেখলাম কেউ কেউ বাচ্চাগুলো মরে যাওয়ার আগে তাদেরকে মা কিভাবে দামী বার্গার খেতে দিলো সেটা নিয়েই অনেক বেশি চিন্তিত! বছরের ৩৬৪ দিন, এই রকম একজন মা তার বাচ্চাদের কি খেতে দিত, কিভাবে দিত সেটা নিয়ে কথা বলার সময় আমাদের নেই, আছে মায়ের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার।

আমি আসলে এই লেখা দিয়ে কিছুই বলতে চাইছি না, শুধু জানাতে চাই আমার মনের আকুতি, ”মা” তোমার সন্তান যেন তোমাকে অন্তত শ্রদ্ধা করতে শিখে, তোমার লড়াইকে সে যেন সম্মান দিতে জানে, ভালোবেসে পাশে থাকে আমৃত্যু, সেই শুভ কামনা বাংলাদেশের সব ‘একা হয়ে যাওয়া মা’ কে!!!

এডিলেড থেকে

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১২৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.