যে কথা যায় না বলা-১

women in foreign life 1ফারহানা আনন্দময়ী: প্রতিদিন খবরের কাগজের পাতায়, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায়, ফেসবুকের হোমপেজে কত শত খবর চোখে পড়ছে… বেশিরভাগই নেতিবাচক। যতই আলো হাতড়ে বেড়াই না কেন, জীবনের অন্ধকারটুকুই যেন খামচে ধরতে চায়। কখনো কোনো খবর এড়িয়ে যাই, কখনো বিষণ্ন হই, কখনো বা লজ্জিত হই নিজের কাছেই। গতকাল রাতে হোমপেজে এক বন্ধুর স্ট্যাটাসে চোখ আটকে গেল। পড়লাম, একবার, দু’বার… কয়েকবার।

বুঝতে পারলাম শুধু চোখই নয়, আমার বোধটাও অসার হতে শুরু করেছে। ক্রোধ, নাকি ঘৃণা, না ক্ষোভ ? নাকি বাচ্চাটার জন্য কষ্ট ? হয়তো বা নিজের প্রতি গ্লানি ? কোনটা ? কী এক তুমুল ভাঙচুর আমার ভেতর শুরু হলো। রাতের ঘুমটাও কাল ঠিকঠাক হলো না, অসুস্থবোধ করতে শুরু করেছিলাম। একটু পরপরই স্ট্যাটাসের সেই বাচ্চা মেয়েটা এসে আমার চেতনায় অবিরত আঘাত করতে শুরু করলো।

মেয়েটা কে? আমি ? আমার শৈশব ? নাকি আমার মেয়ের ছোটবেলার মুখ ?

নিজের স্মৃতি হাতড়াতে শুরু ক’রে দিয়েছি তখন আমি। না তো, ওই বাচ্চা মেয়েটার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে, এমন কোনো ভয়ংকর কিছু মনে পড়ছে না। হ্যা, তবে এইটুকু মনে পড়ছে, ছোটবেলায়,  ফ্রক পড়া বয়সে, আমাদের ঘরে এমন কিছু আত্মীয়স্বজন আসতেন, মধ্যবয়সী, সম্পর্কে হয়তো চাচা-মামা, দূরসম্পর্কেরই হবে… পাশে বসিয়ে হয়তো শুধু আমার কাঁধে বা বাহুতেই হাত রাখতেন। কিন্তু তাদের স্নেহস্পর্শকে আমার মনে হতোনা, এটা স্নেহের হাত। কোথায় যেন জানা হয়ে যেত, এদের থেকে দূরে থাকতে হবে।

কী আশ্চর্যের বিষয়, ঠিক একই ঘটনা আমি আমার কিশোরী মেয়ের বেলাতেও দেখেছি। এমন কোনো আত্মীয় আমার ঘরে বেড়াতে এসেছে, বসার ঘরে ব’সেই কথা বলছি, আমার মেয়েকে ডেকে পাশে বসিয়ে আদর করে কথা বলছে… সেই আমারই ছোটবেলার মত অধরার ঘাড়ে হাত রাখছে… সেই মুহূর্তে আমার মনে কোনো কু উঁকি দিচ্ছেনা। কিন্তু কয়েকবারের আসা যাওয়ার পরে ও’ই আমাকে বলেছে, মা, এরপর থেকে উনি আসলে আমাকে আর ডাকবেনা। আমি জিজ্ঞেস করি, কেন কী হয়েছে? মেয়ের স্পষ্ট জবাব, আমার ভাল লাগেনা উনাকে। আমি বুঝে যাই তখন, ওর খারাপ লাগাটা কোথায়।  মিলিয়ে নিই নিজের ছোটবেলার সেই খারাপ লাগা বোধটার সঙ্গে।

এমনও হয়, সপ্তাহের যেদিন বাচ্চাদের শিক্ষক ঘরে আসেন, আমি আমার বাইরের সকল কাজ স্থগিত রেখে সেই বিকেল সন্ধ্যাটা ঘরে থাকতে বাধ্য হই। শুধু যে আমার মেয়ের জন্য, তা কিন্তু নয়। আমার সদ্য কৈশোরে পা দেয়া ছেলেটার কথাও মাথায় রাখতে হয়। আমি সেই শিক্ষকের প্রতি কোনকিছু ইঙ্গিত করছিনা। কিন্তু চারপাশের ভয়ঙ্গকর ঘটনাবলি আমাকে বাধ্য করে বাড়তি সতর্কতা নিতে।

এবার সোজাসুজি কথাটা বলি। কিছু মানুষের যৌনবিকৃতি আছে, মানুষ বলতে আমি পুরুষকেই বুঝাচ্ছি। কারণ, নারীর যৌন তাড়নাকে নিয়ন্ত্রণ করার একটা সহজাত ক্ষমতা নারীর আছে, থাকে। কিন্তু অধিকাংশ পুরুষেরই সেটা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থাকেনা ব’লেই কখনো কখনো তা যৌনবিকৃতির পর্যায়ে চলে যায়। বিকৃতিটা এমনই ভয়ংকর, সেটা পরিচিত-অপরিচিতের বলয় পেরিয়ে নিজের স্ত্রী, এমন কী সন্তান পর্যন্ত তার বিকৃত থাবা থেকে রেহাই পায়না। আরে বাবা, আপনাদের যখন এতোই খায়েস, আপনারা সমবয়সী অথবা পরিণত বয়সী কাউকে সঙ্গী হিসেবে খুঁজে নিন না। কেন এই ছোট ছোট শিশু-কিশোর বয়সীদের উপর আপনাদের নজর ? একটু মানুষ হোন, এবারের মত রেহাই দিন আমাদের শিশু সন্তানদের।

এই অস্বাভাবিক, অমানবিক ঘটনাই কিন্তু স্বাভাবিকের মূর্তি নিয়ে প্রতিদিনই আমার চারপাশে ঘটে চলেছে। কোনোটা প্রকাশ্য হয়, কোনোটা হয় না। একেবারে নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে শুরু ক’রে উচ্চবিত্ত পরিবারেও এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি চলছে। মনে পড়লো, বেশ কয়েক বছর আগের আমাদের দেশেরই অন্যতম অভিজাত এবং প্রভাবশালী পরিবারের শাজনীনের কথা। হয়তো পরিপ্রেক্ষিত আলাদা, কিন্তু সেই একই যৌন নির্যাতন এবং মৃত্যু।

খেয়াল করলে দেখা যায়, এই ধরনের ঘটনার পাত্ররা কিন্তু সেই পরিবারের বহিরাগত কেউ নয়… আত্মীয়স্বজন, পরিচিত মুখেরাই। যাদেরকে ঘরের শিশুরা আপন বলেই চিনে এসেছে, তারাই সুযোগটা নেয়। আর আমরা অভিভাবকেরা লোকলজ্জার ভয়ে কিংবা সামাজিক সম্পর্কটা রক্ষার তাগিদে এই বিষয়টা গোপন করে যাই, বিকৃত মানসিকতার মানুষটির মুখোশ আমরা নিজেরাই উন্মোচন করতে দ্বিধান্বিত থাকি।

এতোক্ষণ যা লিখলাম তা নতুন কিছু নয়, অজানা নয়, পুরনো গল্প… হয়তো অনেকেরই কমবেশি অভিজ্ঞতা আছে এই বর্বর বিকৃতির সঙ্গে। আমরা সকলেই বিষয়টি নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখি, শুনি, অল্প বিস্তর ভাবিও। কিন্তু কাজের কাজ কিছু করি না। তাতে কিন্তু আমাদের জীবনযাপনের জন্য আত্মিক অসুবিধে খুব একটা হয়না, কিছু সময়ের জন্য শুধু বুকের ভেতরে অনাত্মীয় শিশুটির জন্য হাহাকার জেগে ওঠা ছাড়া।

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.