শরীরটা এতো পোড়ায় কেন?

0

সুপ্রীতি ধর:

ফেসবুক বন্ধু এক বড় আপার স্ট্যাটাসে দেখলাম তিনি লিখেছেন এমন একটি সত্যি ঘটনা, যা আমাদের অজানা-অচেনা কোন গল্প নয়, আমরা জানি, আমরা বাস করি এসব গল্পে, কিন্তু প্রতিকারের উপায় খুঁজি না। মনটা ভারাক্রান্ত ঠেকলে বড়জোর ভলিউম বাড়িয়ে গান শুনি অথবা চ্যানেল পাল্টাই, কোথাও যদি একফোঁটা শান্তি মেলে, সেই আশায়।

স্ট্যাটাসটি ছিল এরকম—–

“ডাক্তার মেয়েটি বলছিল , সপ্তাহ খানিক আগে এক মা এসেছিল তার তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে। বাচ্চা মেয়েটির চোখ ছিল নির্বিকার। যেনো জন্মাবধি সে জেনে আসছে যে নিজের জনক তাকে উদোম করে তার পেশাব করবার রাস্তায়, তার বাবার পেশাব করবার জায়গা নিয়ে সাইকেলের পাম্প করবার খেলাটা খেলতে পারে। বাবা আবার বাবার বন্ধুদেরও এই খেলায় অংশ নিতে বলতো। এই সুযোগ তারাও ছাড়েনি। **** বাচ্চাটি এই ভাবেই ডাক্তারের কাছে বলেছে।

বাচ্চাটির যৌনাঙ্গ ছিঁড়ে গেছে। ঠোঁট মুখ ক্ষত-বিক্ষত। বাবা পলাতক। মা লুকিয়ে এসেছে ডাক্তারের কাছে। ওই বাবা যদি জানে এটা প্রকাশ হয়েছে তাহলে ওরা বাঁচতে পারবে না। আর ডাক্তারও ভীত। সে চিকিৎসা দিচ্ছে কিন্তু বিচার ? সেখানে আছে ঝুঁকি ।

আইন? আইনের প্রয়োগ? তারা অন্ধ। আর আমরা? আমরা ইতর।”

সেই বড় আপার স্ট্যাটাস পড়ে এক সমমনা বন্ধু লিখেছে, “কিছু মানুষের যৌনবিকৃতি আছে, মানুষ বলতে আমি পুরুষকেই বুঝাচ্ছি। কারণ, নারীর যৌন তাড়নাকে নিয়ন্ত্রণ করার একটা সহজাত ক্ষমতা নারীর আছে, থাকে। কিন্তু অধিকাংশ পুরুষেরই সেটা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থাকেনা ব’লেই কখনো কখনো তা যৌনবিকৃতির পর্যায়ে চলে যায়।

বিকৃতিটা এমনই ভয়ংকর, সেটা পরিচিত-অপরিচিতের বলয় পেরিয়ে নিজের স্ত্রী, এমন কী সন্তান পর্যন্ত তার বিকৃত থাবা থেকে রেহাই পায়না। আরে বাবা, আপনাদের যখন এতোই খায়েস, আপনারা সমবয়সী অথবা পরিণত বয়সী কাউকে সঙ্গী হিসেবে খুঁজে নিন না। কেন এই ছোট ছোট শিশু-কিশোর বয়সীদের উপর আপনাদের নজর? একটু মানুষ হোন, এবারের মত রেহাই দিন আমাদের শিশু সন্তানদের।”

মনে পড়ে গেল অনেক বছর আগে একজন সহকর্মী আমাদেরই আরেক সহকর্মী সম্পর্কে বলেছিল, “উনার সামনে তো যাওয়াই যায় না, উনি চোখ দিয়ে রেপ করে ফেলেন, মনে হয় জামার ভিতরের ব্রা খুলে তিনি সবকিছু দেখে নিচ্ছেন”। আমি সেদিন ওর কথা শুনে থ মেরে গিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করে আমারও তাই মনে হয়েছিল। আমরা প্রায় প্রত্যেকে আসলে প্রতি নিয়ত ধর্ষণের শিকার হই হয় চোখ দিয়ে, নয়তো হাতের স্পর্শে।

ছোটবেলায় আমাদের বাসায় প্রচুর আত্মীয়স্বজন আসতো বিভিন্ন অজ:পাড়াগাঁ থেকে, কেউ কেউ আসতো পরীক্ষা দিতে। তখনই আমরা তাদের চিনতাম অমুক দাদা, অমুক কাকা সম্বোধনে। সম্পর্ক ওই পরীক্ষা পর্যন্তই। কিন্তু আমার বিপ্লবী মায়ের মনে ঘূণাক্ষরেও দু:শ্চিন্তা জাগতো না যে, ঘরে একটি মেয়ে সবে শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে, বয়ো:সন্ধিতে পড়েছে। তার শরীর বাড়ছে, পরিবর্তন আসছে। যে কেউ হাত বাড়াতে পারে সেদিকে। কিন্তু নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে শিখেছিলাম কিছু ঘটনার পর, আগে শিখিনি। ফলে ওই পরীক্ষার্থীদের হাত থেকে বেঁচে গেলেও বাঁচতে পারিনি খুব কাছের আত্মীয়দের কাছ থেকে। সেখানে মামাতো ভাই যেমন ছিল, তেমনি ছিল এক দূর সম্পর্কের কাকাও। তারা খেলার ছলে কতভাবেই না গায়ে হাত দিয়েছে, তাদের যৌনাঙ্গ চেপে ধরেছে শরীরের সাথে। যদিও বড় ধরনের কোনো ঘটনা ঘটানোর আগেই সরে আসতে পেরেছিলাম। কিন্তু সেই থেকেই মনে হয়েছিল, এটা পাপ, এটা মহা অন্যায়। নিজেকে পাপী-তাপী বলেই মনে হতো। মনে হতো, স্রষ্টা আমাকে কেন মেয়ে করে পাঠিয়েছে পৃথিবীতে? পুরুষের ভোগ হতে? সেই ছোট্ট মনেই আমার এই প্রশ্ন উদয় হয়েছিল, যা কিনা আজও একইভাবে জ্বলজ্বলে।

জীবনের পরিক্রমায় কেবলই খারাপ মানুষের দেখা পেয়েছি আমি, যে কিনা আমাকে চেয়েইছে শরীর দিয়ে, মন দিয়ে নয়। তাদের ফেরত দিতে পেরেছি কি পারিনি, সে অন্য হিসাব। কিন্তু ক্ষমা আমি কাউকে করিনি। কেন, তোমরা আমার শরীর দেখেছা, মনটা দেখোনি? যে মনে রবীন্দ্রনাথ, লালন, নজরুল, সুকান্ত, জীবনান্দ, শক্তি, সুনীল বাস করে, সেই মনটা বাদ দিয়ে নশ্বর দেহ নিয়ে কেন খেলা খেলতে চাও? বিনিময়ে পাওনি তো কিছুই।

সুপ্রীতি ধর, সম্পাদক, উইমেন চ্যাপ্টার

ভেবেছিলাম, নিজেকে হয়তো অনেক ছোঁয়া, অনেক স্পর্শ থেকে বাঁচাতে পারিনি, কিন্তু পারবো নিজের রক্তজাতকে তা থেকে রক্ষা করতে। করেও ছিলাম। এ নিয়ে বেশ গর্বও ছিল আমার। অথচ সেদিন আমার আত্মজার একটা কথায় সব গর্ব আমার কোথায় কোন ফুৎকারে উবে গেল! সে জানালো, আমার একাকি জীবনে যে মানুষটার সাময়িক আবির্ভাব হয়েছিল, তার আদরের স্পর্শ ছিল অন্যরকম, যা তার ভালো লাগেনি। একথা সে এতোদিন গোপন করেছিল আমি মোহগ্রস্ত ছিলাম বলে, বিশ্বাস করবো না ভেবে। একই কথা শুনিয়েছে বাসার গৃহকর্মীও। তার সাথেও একই আচরণ ঘটিয়েছিল সেই আমার পরম মোহনীয় পুরুষ মানুষটি।

আমি নির্বাক, নিশ্চুপ হয়ে গেছি একথার পর থেকে। কাকে বিশ্বাস করবো, কাকে করবো না! নিজেকে ধিক্কার দিতে চাইছে মন। যার ঔরসে জন্ম আমার আত্মজার, তার মানসিক বিকৃতিও তো আমাকে একদিনের জন্যও শান্তি দেয়নি। এক পর্যায়ে তার এই বিকৃতি আমাকে এতোটাই তার প্রতি অবিশ্বাসী করে তুললো যে, ক্লাস থেকে ফিরেই আমি আমার মেয়ের সবকিছু উল্টে-পাল্টে দেখতাম, কোথাও কোনো ‘অঘটন’ ঘটেছে কিনা! বাবার কাছে রেখেও মনে শান্তি পাইনি এতোটুকু, প্রতিটি মুহূর্ত কাটতো অসম্ভব অনিশ্চয়তায়। নিজের অনিচ্ছায় নিজেকে জোর করে ঠেলে দিতাম সেই মানুষটার কাছে, যাতে করে মেয়েটার আমার জীবন বাঁচে। তাহলে? মেয়েদের জীবন কি এতোটাই নড়বড়ে?

একাকি জীবন মানুষ কি এমনি এমনি বেছে নেয়? নাকি বাধ্য হয়েই বেছে নিতে হয়? মানসিক বিকৃতিসম্পন্ন মানুষ নামের তথাকথিত জানোয়ারে ভরা এই সমাজে আমরা সত্যিকার মানুষটাকে তো খুঁজে পাই না। পাই কি?

 

 

শেয়ার করুন:
  • 128
  •  
  •  
  •  
  •  
    128
    Shares

লেখাটি ১,৪২৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.