পা আমার, ব্যাথা অন্য কারও

0
Laili

সালেহা ইয়াসমীন লাইলী

সালেহা ইয়াসমীন লাইলী: কয়েকদিন নানা সংকটে হাঁটতে বের হতে পারিনি ভোরে! কেউ কেউ ফোন করে খবর নিয়েছে আমার শরীর খারাপ কিনা। কেউ কেউ আবার ফেসবুকের ইনবক্সে লিখেছেন, ‘মিস করছি আপনাকে’।

ঘটনাটি আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছে ছোটবেলায় পাঠ্য পুস্তকে পড়া নবীজীর পথের রাস্তায় কাঁটা বিছানো বুড়ির কথা! একদিন পথে কাঁটা না পেয়ে নবীজী যেমন বুড়ির বাড়ি র্পযন্ত গিয়েছিলেন খোঁজ নিতে। তেমন কেউ আমার খোঁজ নেননি। সেবা শুশ্রুষা করে অসুখ সারিয়ে তুলতেও কেউ আসেননি। আমিও কারো পথে কাঁটা বিছাইনি কোনদিন। যদিও অনেকের চোখের কাঁটা হয়েই আমাকে পথ চলতে হয় র্সবদা।

বহু বছর ধরে আমি এভাবে ভোরে ঘুম থেকে উঠেই হাঁটতে বেড়িয়ে পড়ি। প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে একই গতিতে হেঁটে বাসায় ফিরে আসি। গতি কম বেশী হয় না খুব একটা। কারণ আমার এই পথ চলায় আমি মিনিটে ১২০ পা হিসেব করে ফেলার চেষ্টা করি। আগে সন্ধ্যায়ও এভাবে হাঁটতাম। আজকাল সন্ধ্যায় ঘরমুখো মানুষের চাপে রাস্তায় স্বচ্ছন্দে পা ফেলার সুযোগ থাকে না। তাই সন্ধায় বের হই না খুব একটা। শীতের সকালে সহজে বাদ দেই না এই হাঁটাহাটি।

কিন্তু পথে নামলেই চেনা-আধাচেনা-অচেনা সকলেরই প্রায় একই প্রশ্ন, আপা, একা কেন? ভাইজানকে সাথে নেন নাই কেন? এমন প্রশ্নে আমি বিরক্ত হয়েও হাসার ভান করে এগিয়ে চলি। কিন্তু ‘ভাইজান’ নামের অদৃশ্য কেউ আমার পায়ের গতি শ্লথ করে। পিছনে টেনে ধরে আটকে দিতে চায়। পথের এই মানুষগুলো আমাকে এমন শ্লথ দেখে খুশিই হয়।

আবার কেউ কেউ জানতে চায়, আপা, আপনার কি ডায়াবেটিস? জবাব না শুনলে আরো প্রশ্ন করে। তাই জবাব দেই না। শুধু হাসির ভান করি। কেউ তো আবার চিনুক না চিনুক হাঁটার ধরণ দেখেই বলে দিতে পারে সুগারের মাত্রা। যেন শাসনের সুরে জোরে জোরেই বলে দেয়, ঘরে বসে বসে ডায়াবেটিক বাঁধিয়েছেন, এখন আর কি করবেন? হাঁটতে থাকেন।

জেলা শহরে ভোরের বেলা রাস্তায় হাঁটতে দেখা যায় না কোন নারীকে। একমাত্র আমিই হাঁটি নিয়মিত। আজকাল ডায়াবেটিস নিয়ে কিছু নারী বের হচ্ছে। অবশ্য এতো দিনে আমি নারী থেকে মানুষ হয়ে উঠেছি। এখন কেউ আমাকে ভাইজানকে সাথে নিয়ে হাঁটার কথা বললে আমিও জবাব দেই ‘আপনি ভাবী/আপাকে সাথে নিয়ে বের হননি কেন?’ জবাব শুনে কেউ কেউ একটু লজ্জ্বা পায় বুঝতে পারি। আমার খুশি খুশি লাগে কাউকে এমন লাজো লাজো পায়ে শ্লথ হতে দেখে। কেউ আবার চশমখোরের মতো জবাব দেয় ‘আপনার ভাবী/আপা তো বাসায় অনেক কাজ করে তাই তার হাঁটতে বের হওয়ার সময় কই আপনার মতো?’ এবার আমি বলি, ‘আপনিও তো তাকে সহায়তা করলে আর হাঁটার দরকার পড়ে না।’ চুপ করে ভিন্ন দিকে হাঁটা দেয়।

কেউ কেউ আমার হাঁটার তালে তাল রেখে পাশে হাঁটতে আসে। কিছুদূর সাথে হাঁটতে হাঁটতে জানতে চায় আমার বাসায় রান্নার কাজ কে করে? ঘরদোর ধোয়া-মোছা? ‘আমার বাসায় কোন কাজের মানুষ নাই। ঘরের সব কাজ আমিই করি।’ কতটুকু বিশ্বাস করে তারা বুঝতে পারি না। আবার কেউ ফ্রি পরামশ দেয় ‘এতো হাঁটাহাটি না করে ঘরে ট্রেডমিল বা রানিং মেশিন কিনে ফেলতে পারেন তো।’ পরামর্শটা নিজের কাজে কেন লাগাচ্ছেন না শুনলে অন্য দিকে পা ঘুরায়।

সেদিন ভোরে আমি বাসা থেকে বেরিয়ে রাস্তার মোড় পার হচ্ছি। ফজরের নামাজ শেষ করে সদ্য হজ থেকে ফেরা প্রতিবেশী দুই হাজি ও অন্য কয়েকজন মিলে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। আমাকে পাশ দিয়ে পার হতে দেখে এক হাজি আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন, ‘সুন্দর শরীর কোন কাজে লাগবে না। প্রাণটা বেড়িয়ে গেলে মাটিতে পচে যাবে সৌন্দর্য।’ কথাটা শেষ হতেই আমি দাঁড়িয়ে গেলাম।

আমাকে দাঁড়াতে দেখে আর একজন হাজি বলতে লাগলেন ‘পুরুষরা হাঁটে সুস্থতার জন্য, মহিলারা হাঁটে সুন্দর শরীরের জন্য।’ আমার পায়ের রক্ত মাথায় চড়ে গেছে ততক্ষণে। কোন ভান করতে পারলাম না। বললাম, ‘দু’টাতেই তো আপনাদেরই লাভ। সুস্থ থাকতেও পারছেন, সুন্দর শরীর দেখে আত্মায় শান্তিও পাচ্ছেন!’

‘নাউজুবিল্লাহ’ বলে উঠলেন সবাই। ‘বিসমিল্লাহ’ বলে মদ খাওয়ার মতো ‘নাউজুবিল্লাহ’ বলেও নীল ছবি দেখে একালের বকধার্মিকরা! বললাম, ‘আপনাদের কেন মনে হয় না নারীদের সুস্থতার জন্য হাঁটা উচিত। একজন জবাবে বললেন, ‘হাঁটতে চাইলে ঘরের ভিতরেই তো হাঁটা যায়, রাস্তায় কেন?’

আমার সময় নাই এসব কথার জবাব দিতে গিয়ে নষ্ট করার! আমি হাঁটতে লাগলাম। আমার হিসেবের গতিতে। হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম ধর্ম যখন বকদের দখলে তখন আর কি বলার? তবে হজে যাওয়ার জন্যও উপযুক্ততার পরীক্ষা থাকা উচিত। এমন কত উচিতকে অনুচিত করা যায় এদেশে সেটাও ভাবনায় এলো। তখন বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের মতো হজের যোগ্যতা পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হবে সবচেয়ে বেশী।

 

সাংবাদিক ও লেখক

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৩৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.