প্রগতিশীল মাত্রই এখন সংখ্যালঘু

0
Kanij Aklima

কানিজ আকলিমা সুলতানা

কানিজ আকলিমা সুলতানা: সেই প্রাচীনকাল থেকে গানের সাথে সম্পর্ক এই দেশের মানুষের। ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়া, জারি-সারি, ফকির-বৈষ্ণব-লালন-গোঁসাইদের গান। উৎসবে বিরহে কাজে কোথায় নেই গান! যাত্রাপালায় বিবেক আর বাংলা সিনেমায় বোষ্টম-বোষ্টমীর গানতো সামাজিক প্রতিকূলতায় আলোর উৎস হিসেবেই বিবেচিত হয়ে এসেছে।

১৮৯০ সালের শেষভাগে জমিদারীর দায়িত্ব নিয়ে শিলাইদহে আসার পরে রবীন্দ্রনাথ প্রথম এই দেশের সাধারণ মানুষ ও ফকির-বাউলদের গানের সাথে পরিচিত হলেন। এই পরিচয় পরবর্তীকালে তাঁকে রবীন্দ্র-বাউলে পরিণত করেছে। ওদের গানে যাপিত জীবনের মূল সুর খুঁজে পেতেন বলে বাউল গানকে তিনি বলতেন ‘চিরকেলে আধুনিক’ গান। শিলাইদহ পোস্ট অফিসের পিয়ন গগন হরকরা (গগন  দাস) রচিত ও গাওয়া গান ‘কোথায় পাবো তারে আমার মনের মানুষ যেরে’ গানে মুগ্ধ হয়ে নিজের রচিত ‘আমার সোনার বাংলা আমি  তোমায় ভালবাসি’-এই বাণীর সঙ্গে গগনের গানের সুর যোজনা করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কালের পরিক্রমায় গগনের মনের মানুষ খোঁজার সেই সুর হয়ে উঠলো বাংলার মুক্তিকামী মানুষের প্রাণের সুর।

মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত এই গান কোটি কোটি বাঙালি হৃদয়কে মুক্তি  সংগ্রামের দিকে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ  করেছে। স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু এই গানকেই বেছে নিলেন আমাদের পবিত্র ভূমির জাতীয় সংগীত হিসাবে। কিন্তু পঁচাত্তরের পরে বাংলার চিত্র পালটে যেতে লাগলো। মৌলবাদের কালো থাবার কবলে পড়লো আমাদের সংস্কৃতি।

লালন কবে লিখে গেছেন, ‘একটা বদহাওয়া লেগে,পাখি কখন জানি উড়ে যায়’।  লালনের আশংকার বদ হাওয়া আমাদের দেশে লেগেছে সেই পঁচাত্তরেই। সেই থেকে ঈশান নৈঋত পশ্চিম দক্ষিণ সব জায়গায় এর বিচরণ! নির্মল বাতাসে মিশে এটা শ্বাসরুদ্ধ করে দিচ্ছে বাংলার জনপদকে। আবহমান বাংলায় সুরের সাথে কারো বিরোধ ছিল না। কিন্তু এখন আছে। সাম্প্রদায়িক বিরোধ সুরকে ঠেলে দিচ্ছে অসুরের দিকে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার লালপুর গ্রামের হাই স্কু্লের অতিথি শিক্ষক ও ছাত্রলীগ নেতা দেবাশীষ দাস সোহেলকে লালনের গান ফেসবুকে পোস্ট করে ধর্মীয় উসকানি দেয়ার অপরাধে দায়ী করা হয়েছে। ধর্মীয় উস্কানীর অভিযোগ তুলে দেবাশীষের বাড়ি ভাংচুর করা হয়েছে এবং হিন্দু ধর্মাম্বলীদের লোকনাথ মন্দির, কালীমন্দির, রামঠাকুরের মন্দির, দয়াময় মন্দির, অনুকূল ঠাকুর মন্দিরসহ পাঁচটি মন্দিরে হামলাও করা হয়েছে।

বলাই বাহুল্য লালনের এই গানটি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ নয়। তবে কেন এমন হামলা হলো? তদুপরি ফেসবুকে এই গানটি শেয়ার করার পর ফেসবুকে অনেকে আপত্তি জানালে দেবাশীষ দুঃখপ্রকাশও করেছিলেন।

তিনি লিখেছিলেন, “আমি (ইসলাম ধর্মকে) নিয়ে কোনও খারাপ কথা লিখিনি। আমি একজন নিরাকার উপাসক। আমি লালনের একটি গান শেয়ার করেছি। এতে কোনও ভাই কষ্ট পেলে আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থী”। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি।

কারণ এই শিক্ষককে ফাঁদে ফেলতে এটা একটা মারাত্মক কৌশল। এই কৌশলের ফাঁদে পা দিচ্ছে সাধারণ নারী-পুরুষ। অন্ধকারের ভবিরা ওঁৎ পেতে আছে সমাজকে নড়বড়ে করে দিতে!

রাজশাহীতে লালনের গান  চর্চা করায় গতকাল একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই শিক্ষকের নামে আরও প্রচার করা হচ্ছে যে তিনি তাঁর ক্লাসে মেয়েদের হিজাব পড়তে নিষেধ করেছিলেন। আবহমানকাল ধরে এই বাংলার সকল ধর্মের নারী পুরুষ সমাজের সংজ্ঞা অনুযায়ী শালীন পোষাক পরে। সুদূর অতীত থেকে এই কিছুকাল আগে পর্যন্ত কোনো কট্টর মুসলিম পরিবারের মেয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ে কখনো হিজাব পরে যায়নি। আজ কেন হঠাৎ ধর্ম পালন করতে হলে হিজাব পরতে হয়? কোথা থেকে এই বাণী সমাজে ভর করেছে?

ধর্মের নামে সাধারণ মানুষেরাও উন্মত্ত হয়ে উঠছে আজ। সারা জীবন যারা ফকির বাউলদের গানের বাণী আর সুরের ভক্ত ছিল সেই গ্রাম -বাংলার জনগোষ্ঠীও আজ আর সহজ-সরল রূপে নেই। মৌলবাদের ইন্ধনে নির্বিচারে তারা আঘাত করতে পারে নিত্যদিনের চেনা প্রতিবেশীকে। একবারও তারা ভাবছে না কারা তাদের উসকে দিচ্ছে! বুঝতে চাইছে না এই উসকানি এই কার্যক্রম মৌলবাদীদের দীর্ঘকালের নীল নকশার অংশ। কৌশলে এরা বাঙালির-অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যকে ভেঙ্গে সমাজকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। এই অস্থিতিশীলতা আমাদেরকে পঙ্গু করে দিবে।

এই দেশের প্রগতিশীলরা এখন সংখ্যালঘু। প্রতিটি সাধারণ নাগরিক এখন শারীরিক-মানসিক ঝুঁকির মধ্যে বাস করছে। এই অন্যায় সমাজে অবশ্যই চলতে দেয়া যায় না। আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। প্রত্যেক এলাকায় সজাগ পাহারা বসাতে হবে। সমাজকে অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে হলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ভীষণ জরুরী। আমরা এই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবোই। দলগতভাবে সমাজকে স্থিতিশীল রাখার কাজটা আমাদেরই করতে হবে।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.