সোভিয়েত নারীর দেশে-২৩

0

Holland 1সুপ্রীতি ধর: এর আগে একটা পর্বে লিখেছিলাম লন্ডনে যাওয়ার কথা। সেটা ছিল ১৯৮৯ সালের গ্রীষ্মকাল। কিন্তু লেখা হয়নি সেই ভিসা নিতে গিয়ে কী পরিমাণ ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল।  তখন এরকমই ছিল। যেই গেছে একবার, সেই কানে ধরে মাফ চেয়েছে আর যাবে না বলে। এখনকার আমরা এরকম অভিজ্ঞতার কথা ভাবতেই পারি না।

সোভিয়েত ইউনিয়নে তখন দিন যতই যাচ্ছিল, ততই কঠিন হয়ে উঠছিল টিকে থাকা। বিশেষ করে যে বৃত্তি আমরা পেতাম,  ভাল রেজাল্টের জন্য সেখানে যোগ করতে পেরেছিলাম আর মাত্র ২০টি রুবল।  জিনিসপত্রের দাম বাড়ছিল, তার চেয়েও বেশি দুর্লভ হয়ে উঠছিল নিত্যদিনের খাবার-দাবার। ১১০ রুবলে চলা-খাওয়া-ঘুরে বেড়ানো কষ্টসাধ্য হচ্ছিল। তার চেয়েও বেশি কষ্ট লাগতো চোখের সামনে লোকজনকে পকেট থেকে টাকার বান্ডিল বের করে গরম হাঁড়ি নামাতে দেখে।  ছেলেরা যারা বাইরে যেতেন, তারা বেশ স্বচ্ছন্দেই দিন কাটাচ্ছিল। আর মেয়েরা সামর্থ্য অনুযায়ী বাড়ি থেকে বাড়তি টাকা নিয়ে চলা শুরু করে।

তখনই লন্ডন যাওয়ার দু:সাহসটা করে ফেলি। ফাইনাল পরীক্ষা শেষে মস্কো এসে মোটামুটি পাকাপোক্ত জায়গা করে নিই সাবিনার রুমে। ও দেশে যাওয়ার আগে চাবি দিয়ে যায় আমাকে। কিন্তু থাকা হতো বেশি কুমুর রুমেই, প্যাট্রিস লুবুম্বার  নয় নম্বর হোস্টেলে। খারকভ থেকে সেবারই শুক্তিও এসে যোগ দেয় আমাদের সেই কাফেলায়। ভোরবেলা ওরা যখন ঘুমিয়ে থাকে, আমি উঠে বেশ কটা মেট্রো পাল্টে ঠিক ছয়টায় গিয়ে নিজের হাজিরা নিশ্চিত করি  ব্রিটিশ  দুতাবাসে।  বিশাল লম্বা লাইন। আফ্রিকানদের সংখ্যাই বেশি। প্রতিদিনই গিয়ে নিজের নাম খুঁজে না পেয়ে নতুন করে আবার নাম লেখাই। আর কান্না পায় এই ভেবে যে, শেষপর্যন্ত যাওয়াটা মনে হয় আর হলোই না।

প্রতিদিন নতুন নতুন তালিকা হয়, প্রতিদিনই তা নিয়ে ঝামেলার এক পর্যায়ে সেই তালিকা ছিঁড়ে ফেলা হয়।  আবার নতুন তালিকা হয়। আফ্রিকানরা গায়ের জোরে সেই তালিকায় তাদের নাম ঢুকায়, আমরা বেকুব হয়ে থাকি, চান্স পাই না। একদিন তো এশিয়া-আফ্রিকানদের মধ্যে মারামারিই লেগে গেল। মারামারির এক পর্যায়ে দুজন এসে পড়লো আমার ওপরে। সেই ক্ষতের দাগ এখনও স্মৃতি হয়ে আছে আমার পায়ে। তবে এই মারামারিতে একটা সুফল  কিন্তু পেয়েছিলাম আমরা। সেদিনই রাষ্ট্রদুত বেরিয়ে এসে এই দৃশ্য দেখে নির্দেশ দেন, এশিয়া থেকে একজন, আর আফ্রিকা থেকে একজন টিম লিডার থাকবে, যারা প্রতিদিনের এই তালিকা পরিচালনা করবে। এশিয়া থেকে পেয়ে গেলাম আমরা বাংলাদেশের আজমলকে। সে থাকতো খারকভে। আজমল থাকায় বাংলাদেশি হিসেবে পরের দিনই ভিসা পেয়ে গেলাম আমি।

আর আমাকে পায় কে? পরের দিনই দুই জার্মানি, পোল্যান্ড, হল্যান্ডের ট্রানজিট ভিসা হয়ে যায় আমার। লেনিনগ্রাদ ফিরে এসে একদিন পরই রওনা দিই তিনদিনের ট্রেনভ্রমণের উদ্দেশে। সাথে নিয়ে নেই  শুকনো ,টিনজাত খাবার আর কিছু মুরগির রোস্ট। মাত্র ২০ ডলারে সেই সময় লেনিনগ্রাদ-লন্ডনের টু-ওয়ে ট্রেন ভাড়া। চিন্তা করা যায়!

পোল্যান্ড পর্যন্ত বেশ আরামেই গিয়েছিলাম ট্রেনে। কিন্তু ওয়ারশোতে ট্রেনে এতো লোক উঠলো যে, কেবিনের দরজা খোলাই দায় হয়ে গেল।

পরে জেনেছিলাম, পূর্ব ইউরোপে তখন ভাঙন এমনই শুরু হয়েছে যে, দলে দলে মানুষ ভাগ্য ফেরাতে পশ্চিমে যাচ্ছে।  ট্রেনে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কোথায় যাচ্ছেন তারা? উত্তর শুনে হতবাক আমরা, তারা নিজেরাও জানে না, কোথায় যাচ্ছে? কেন যাচ্ছে? শুধু জানে, পশ্চিমে গেলে উপার্জনের পথ পাবেন তারা।  একটা কথাই তখন মনে  হয়েছিল, মানুষ আসলে স্বাধীন, তাকে পরাধীন করে রাখা যায় না, আবদ্ধ তো নয়ই।  পাখিকে খাঁচায় আটকে রাখা গেলেও, মানুষকে কখনও যায় না। নইলে সমাজতন্ত্রের এতো সুযোগ-সুবিধার পরও মানুষে কেন বেছে নেবে সেই অনিশ্চিত যাত্রাকে? সত্তর বছরের সিস্টেম তখন ভাঙছে, ভেঙে যাচ্ছে মানুষ।

পোল্যান্ড থেকে পূর্ব জার্মানি পর্যন্ত ট্রেনটা মানুষজনে গিজগিজ করছিল। পূর্ব জার্মানিতে গিয়ে টানা তিন ঘন্টা ধরে ট্রেনের চাকা চেঞ্জ হলো। ব্রড গেজ-মিটার গেজের ব্যাপার। পশ্চিম জার্মানিতে পৌঁছানোর পরই টের পাওয়া গেল পশ্চিমের হাওয়া। আমরা যারা ততদিনে বামদিকের সভ্যতায় অভ্যস্ত হয়েছি, ডানদিক তখনও আমাদের অজানা। রেল স্টেশনে পশ্চিম জার্মানির পুলিশদের হুমকি-ধামকির (ভাষা বুঝিনি, তাই তাদের সব কথাকেই ওরকম মনে হয়েছে আমাদের) মুখে ট্রেন পাল্টে হল্যান্ডের ট্রেনে উঠি। ভাষা না জানাটা যে কী বিপত্তির, তা হাড়ে হাড়ে টের পাই। জার্মানির লোকজন মনে হয় ইংরেজি বলবেই না আমাদের সাথে। কী আর করা! অপার মৌনতা অর্জন করতে হয় আমাদের।

ট্রেনটা তখন ডাচল্যান্ডের ভিতর দিয়ে ছুটে চলেছে, ভিউকার্ডের মতোন সুদৃশ্য সব বাড়িঘর ফুলে ফুলে সাজানো। সবুজে ঘেরা বিশাল মাঠের পর মাঠ। চোখ জুড়িয়ে যায়। এতো সবুজের দেশ, আমি ততদিনের জীবনে নিজের দেশেও দেখিনি।

দুদিনের ভ্রমণ শেষে  হক ভ্যান হল্যান্ডে এসে পৌঁছি।  সেখান থেকে জাহাজে করে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে হবে আমাদের। ২১ থেকে ২২ বছর বয়সে পা দেয়া সেই বয়সে প্রথম দুর্ধর্ষ যাত্রা ইউরোপের অলিগলিতে। এখন মনে হলেও গায়ে কাঁটা দেয়, হয়তো পারতামও না সেভাবে। কিন্তু তখন বয়সটাই ছিল বাঁধ ভাঙার বয়স, নিষেধ অমান্যের বয়স। পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে তাইতো বেরিয়ে পড়েছিলাম অনিশ্চিতের উদ্দেশে।

Holland 2জাহাজে উঠলাম, নাকি কোনো রাজপ্রাসাদে পা রাখলাম, বুঝতে পারলাম না। জাহাজটা কত তলা ছিল, চলছে, নাকি থেমে আছে, তাও বোঝা গেল না। দেখলাম অনেকেই বসে আছেন, পন্ডিতি করে নিজেও পাক্কা ছয় পাউন্ড দিয়ে চেয়ার ভাড়া নিলাম। কিন্তু কিসের কী! বসে বসে কী ঘুমানো যায়? মধ্যরাতে সেই ছয় পাউন্ডের জন্যই মনটা খচখচ করতে লাগলো। দেখি দলে দলে সব তরুণ-তরুণী, স্কুল শিক্ষার্থী কার্পেটের ওপর ঘুমিয়ে আছে। কোন ভূতে যে ধরেছিল আমাদের টাকা খরচ করতে। না হলো ঘুম, না হলো আরাম। রাতভর খাড়া হয়ে বসে থেকে পা ধরে গেল।

কাক ডাকা সকালে জাহাজের ডেক খুঁজে বের করে ভোরের আলো দেখলাম। পৌঁছালাম ব্রিটিশ রাজত্বে, হারউইচে। ইমিগ্রেশন পার হতে গিয়ে নানাপ্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে তিন মাসের ভিসা  পেলাম। শুনেছি, আমাদের এক বড় ভাইকে এখান থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি বলে।

লন্ডনে এসেছি কোনো একটা রেস্টুরেন্ট বা দোকানে খণ্ডকালীন কাজ করবো, সেই টাকা নিয়ে বছরভর ভাল থাকবো লেনিনগ্রাদে, বেশি তো চাওয়া নেই। সাথে নতুন একটা দেশ দেখা। মিউজিয়াম দেখা। ব্যস।  লন্ডনে আসার পথে গন্তব্য আগে থেকেই ঠিক করা ছিল বলে নেমে গেলাম কলচেস্টারে। থাকার জায়গা হলো অ্যাসেক্স ইউনিভার্সিটির হোস্টেলে সপ্তাহে ২৫ পাউন্ড ভাড়ায় আর কাজ পেলাম একজন জ্যামাইকান ভদ্রমহিলার রেস্টুরেন্টে, ওয়েটার হিসেবে।  নতুন অভিজ্ঞতা জীবনে।

আজ জীবনের পড়ন্ত বিকেলে এসে মনে হয়, কোনকিছুই ফেলনা নয়। যা পেয়েছি, যা দেখেছি, সবই অতুলনীয়।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৬৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.