আমার সকল গান-২

0
Shams

শারমিন শামস

শারমিন শামস্: জীবনে আমি যে জিনিসটার জন্য সবচেয়ে বেশি কথা শুনেছি, তা হলো পোশাক। আমার পোশাক কী? আমি ভেবে দেখেছি, আমি তা-ই পরেছি, যা এখন সবাই সহজে পরছে। সমস্যাটা হলো, আমি একটু আগে আগে পরে ফেলেছি। আমি একটা প্যান্ট পরেছি, ছোট কুর্তি পরেছি, শার্ট পরেছি। আমার কাজের সুবিধার জন্য যখন যা পরতে ইচ্ছে হয়েছে, আমার কাছে যেটা শালীন বলেই মনে হয়েছে, তা-ই পরেছি। অবশ্য আমার মনে হওয়াটাই সব না। এই সমাজের মনে হতে হবে, আমি যা পরছি, তা তাদের ভালো লাগছে কী না!

পোশাকের কারণে একসময় আমার চিফ রিপোর্টার, যিনি আমাকে ভীষণ স্নেহ করতেন, বলেছেন, ‘যদি সালোয়ার কামিজ পরে আসো তবেই পাবে শেখ হাসিনার অ্যাসাইনমেন্ট।’ তখন আমি সদ্য রিপোর্টার। পত্রিকায় কাজ করি। কিছুদিন কাজ করে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের পর একটু-আধটু কাজ শুরু করেছি রাজনৈতিক বিটে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন বিরোধীদলীয় নেতা। রাজনীতিতে তখন বেশ গরম হাওয়া। তো এ সময় আমাকে একটু সাইজে আনতেই চিফ রিপোর্টার বড় ভাইয়ের এই বক্তব্য। আমার পরনে তখন জিনস আর ফতুয়া। যা এখন হরহামেশাই পরছে সকলে। তো আমি টেম্পু চড়ি, দুই টাকা দিয়ে বাসে উঠি, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ থেকে ফার্মগেট যাই। আমার এ পোশাকেই কাজ করতে আরাম লাগে। আমি সালোয়ার কামিজও পরি। তবে ফতুয়া শার্ট আমার পছন্দের। তো আামার অফিসের বড়ভাইদের অনেকের তা ভালো লাগে না।

যাই হোক, আমার ভালো অ্যাসাইনমেন্ট পাবার শর্ত সেই সালোয়ার-কামিজ। সেই শর্তের বাধা কীভাবে পেরোলাম, সে আরেক কাহিনী। আজ বলতেই হয়, মেয়েদের পোশাক নিয়ে খুঁতখুঁতানি থাকলেও আমার সে সময়ের সহকর্মীরা ছিলেন এক একজন ভালো মানুষ। আমাকে তারা স্নেহ আর ভালোবাসা দিয়েই গ্রহণ করেছিলেন। তাই সে দফা ঝড়ঝঞ্ঝা কমই ছিল।

এই কাহিনী ফেঁদে বসলাম, কারণ যে ঘটনা বললাম, তার পরে বহু জল বয়ে গেছে, বহু বছর পেরিয়ে গেছে এই জীবনে, আমিও সেই তেইশ- চব্বিশের বাচ্চা সাংবাদিক আর নই। সংসারে সমাজে আমি আজ পরিণত একজন মানুষ। কিন্তু আজও পোশাকের সেই কচকচানি থামেনি। তফাতটা এই, এইসব আমাকে আর বিব্রত করে না। আমাকে আর দুঃখিত ভাবিত করেনা। আমার যা ভালো লাগে, আমি তাই পরি।

আমার সবচেয়ে প্রিয় পোশাক আমার আত্মমর্যাদা, আমার আত্মবিশ্বাস, আমার সপ্রতিভতা, আমার সাহস আমার শিক্ষা। তো একসময় আমার এ সবই ছিল, কিন্তু সঙ্গে আরো একটা জিনিস ছিল, তা হলো আবেগ। স্পর্শকাতরতা। ফলে, আমার পোশাক দেখে যখন কারো মুখ গোমরা হত, হতে পারে সে প্রিয়জনও, আমার খারাপ লাগতো। আজ আর লাগে না। পোশাক দিয়ে যারা আমাকে আজো বিচার করছে, তাদের আমি আজ করুণা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারিনা। বাঙালি পোশাক শাড়ি আমার ভীষণ প্রিয়। সেই শাড়ি অঙ্গে জড়াই ইচ্ছে হলে। সালোয়ার কামিজ পরি। যখন এইসব পোশাকে থাকি আমি, তখন আমার রুচি, ব্যক্তিত্ব নিয়ে যারা প্রথাগত, সমাজসিদ্ধ মুগ্ধতা মিশিয়ে কোন উপসংহারে পৌঁছাতে চায়, তাদের ভড়কে দিতে পরদিন তাদের সামনে একটা শার্ট আর প্যান্ট পরে যেতে বড্ড ভালো লাগে আমার। আমি তাদের বলতে চাই, দ্যাখো, কাল যাকে তোমরা দেখেছো, সেই আমিই আজ। পোশাক বদলে আমি বদলে যাইনি।

কতদিন এই সমাজ পোশাকের আবরণে নারীকে মাপবে, আমার জানা নেই। খোলামেলা পোশাকে উচ্চবিত্ত ঘরের মেয়েকে মানতে অসুবিধা নেই, স্লিভলেসে নায়িকা অভিনেত্রীকে ভালো লাগে, কিন্তু কর্মজীবী, মধ্যবিত্ত নারী কাজের সুবিধা কিংবা নিজের ভালো লাগার জন্য শার্ট পরলে তাকে বড় বেমানান ঠেকে। আমার এক দূরসম্পর্কিত আত্মীয় আড়ালে আমার পোশাক নিয়ে কথা বলেন। তিনি এক নিতান্ত ছাপোষা মানুষ ছিলেন, যার গণ্ডি অতি সীমিত। তো সেই সীমিত গণ্ডির আত্মীয় আমার পোশাক দেখে সমালোচনায় মুখর। তার মেয়ে, বৌকে বলেছেন আমার সাথে বেশি না মিশতে।

তো এই সীমিত গণ্ডির কুয়োর ব্যাঙটিকে আমার আবেগের গণ্ডির ভিতরে ফেলে আমি আর কষ্ট পেতে যাই কেন? আমি এদের ছেঁটে ফেলেছি। কারণ একটি মেয়ের জীবনযাপনের যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে আমি আবিস্কার করেছি, মেয়েদের ছেঁটে ফেলে দিতে হয় বহু মানুষ, বহু মত, বহু অপবাদ, বহু কাঁটা, কাঁটাঝোপ। এইসব ঝেঁটে কেটে পথ করে এগিয়ে যেতে হয়।

বয়ো:সন্ধিকালে দেখেছি, আজো প্রায়ই এরকম ঘটনা ঘটে, আমারই কোন নারী সহকর্মী বা মেয়ে বন্ধুই হঠাই তৎপর হয়ে উঠে সাবধানে আমার জামার বাইরে বেরিয়ে আসা অন্তর্বাসের ফিতা ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়। আগে আমি লজ্জা পেয়ে সতর্ক হয়ে তাকে সাহায্য করতাম। এখন তাকে জোর গলায় বলে উঠি, ‘কিরে কি হয়েছে? ওহ ব্রা’র ফিতা বেরিয়ে আছে? ওকে, ঠিক করে নিচ্ছি।’ লজ্জায় বিব্রত সেই মেয়ে তখন আশেপাশে ইতিউঁতি চায়। কোন পুরুষ আমার এই বেহায়া উক্তি শুনে ফেললো কিনা চেয়ে দেখে। এই ব্রা নিয়ে মেয়েদের লজ্জার শেষ নেই। ওড়না সরে গেলে লজ্জায় তারা মরো মরো। তারা চায় আমিও মরে যাই। তাদের দুঃখ দিতে হয় আমাকে প্রতিনিয়ত। আমি তাদের স্বভাবসুলভ লজ্জায় জল ঢেলে দিই। আমার অন্তর্বাসের ফিতা অসাবধানে বেরিয়ে গেলে আমার জাত যায় না। এই তো আমি। এভাবেই আমাকে মেনে নিতে হবে।

একটি মেয়ের পোশাক ভাবনাই যদি তাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখে, পোশাক নিয়ে সদা সতর্ক থাকাই যদি তার প্রাথমিক কাজ হয়, তবে বাদবাকি কাজ সে সারবে কখন? শাড়ি হোক, কামিজ হোক, শার্ট হোক, টি-শার্ট হোক, সে যেন তাই পরতে পারে যা তার ভালো লাগে। শালীনতা আর অশালীনতার সংজ্ঞা তো একেবারেই আপেক্ষিক। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে তা সর্বদাই পাল্টায়। পোশাক যদি নারীকে নিরাপত্তাই দিত, তবে কামিজ পরা দরিদ্র কিশোরী ইয়াসমিন, ফ্রক পরা ছোট্ট তৃষা, ডায়াপার পরা দেড় বছরের শিশু কন্যা ধর্ষিতা হতো না।

লেখক: সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৫৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.