একটি কথার দ্বিধা থরো থরো চূড়ে…

0
Urmi ATN

ইশরাত জাহান ঊর্মি

ইশরাত জাহান ঊর্মি: আজকাল এমনই হচ্ছে। অনেকদূর হেঁটে এসে মনে হচ্ছে আরে এখানে তো আসতে চাইনি! বেশ কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছি এরকমটা। কোথায় যে যাই, কি যে করি, কি যে চাই…কিছুই বুঝতে পারি না। কোন ব্যাপারেই মনো:সংযোগ করতে পারি না।  কোন কাজে না, কোন জায়গাতে না, কোন নারী, বন্ধু ইভেন কি কোন পুরুষেও একনিষ্ঠ হতে পারি না।

গন্তব্যে পৌঁছেই মনে হয় এখানে নয়, অন্য কোনখানে যেতে চাই। আবার যাওয়ার জন্য রওয়ানা হই কোথায় যেতে চাই তা পরিষ্কার না জেনেই। বুঝতে পারি, আমার কাছের যে দুয়েকজন তাঁরাও খানিক বিব্রত আমাকে নিয়ে। কথা বলতে বলতেই সন্তর্পণে ফোন রেখে দেন।

আমার এই অস্থিরতার ওষুধ তো তাদের জানা নেই! এত দ্বিধাগ্রস্ত, ভূতগ্রস্ত, অমনোযোগী, বেখেয়ালী মানুষকে তারা কিভাবে হেল্প করবেন?

যে চাকরি করি, সেখানে বেখেয়ালের কোন স্থান নেই। শুধু আমার চাকরি কেন আসলে কোন চাকরিতেই তা নেই। মালিক তো কাউকে বেখেয়াল হওয়ার জন্য পয়সা দেন না। বেখেয়াল তো দূরের কথা, কোন ধরনের অনুপস্থিতিই ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ মানতে পারে না।  আমি এক ভদ্রলোককে চিনি, ব্যস্ত কর্পোরেট, বুকে বেশ কিছুদিন হলো ব্যাথা বোধ করছেন। এনজিওগ্রাম করানো দরকার, তিনি করাচ্ছেন না।

বলেন, এনজিওগ্রাম করালেই অফিসে নানা কথা হবে। মালিক মনে করবেন, উনার হার্টের অসুখ, উনি কি আর এত লোড নিতে পারবেন? যৌনকর্মীদের যেমন রূপ-যৌবন ধরে রাখাটা তাদের পেশার জন্য জরুরি, আমাদেরও তেমন শারীরিকভাবে ফিট থাকাটা কাজের লোড নেয়ার জন্যই জরুরী।

কি জানি, ভদ্রলোক আত্নবিশ্বাসের অভাব থেকে একথা বলেন কি না, কিন্তু আমার মনে হয় কথা মিথ্যা না।

এই কদিন ধরে বড় অশান্তিতে কাটছে সময়। আগামী বইমেলায় প্রকাশের জন্য একটা উপন্যাস সম্পূর্ণ করেছি। ইতিমধ্যে প্রুফও বেরিয়ে গেছে, কাভারের জন্য ধ্রুব এষের কাছে চলে গেছে টাইপ করা লেখা। এখন অনেকটাই ছুঁড়ে দেয়া তীর। তূনে ফেরানোর উপায় আর নেই। কিন্তু যেকোন কারণেই হোক, বইটা নিয়ে প্রথম থেকেই মনের ভেতর খচখচানী। উপন্যাসের বিষয়বস্তু ‌ গণমাধ্যম। আমি খুব তীর্থ মানি এমন এক বন্ধুকে লেখাটা পাঠিয়েছিলাম। তার প্রতিক্রিয়ায় আমি একটু থমকে গেছি।

বলল,

: আপনার এই লেখাটাকে কেউ আপনার সামনে মন্দ বলবে না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এটা অধিকাংশই নিতে পারবে না। আপনি অনেকের শত্রু হয়ে যাবেন। অনেক সত্য কথাও সবসময় বলতে হয় না, তা তো জানেনই। বুঝে-শুনে বই প্রকাশের কথা ভাবেন। কোথায় কোন মিছরির ছুরিতে আপনার প্রাণ যাবে, আপনি ভাবতেও পারবেন না।

ওর কথা শোনার পর থেকেই আরও অস্থির লাগছে। একবার ভাবছি, আমার লেখার জগত, আমার আনন্দ। আমার একান্ত নিজস্ব জায়গা। একেবারেই আমার তীর্থের মতো শান্তির জায়গা। সেই জায়গার শান্তিও নষ্ট করবো অন্যের কথা ভেবে?

আমি যে লেখাটা লিখেছি, সেটা কাউকে ‍‍‍”খুব দেখিয়ে দিলাম, কারো দিকে তাকিয়ে খুব দাঁত বের বিদ্রুপের হাসি হাসলাম” গোছের নয়। লেখালেখিটা চিরকাল আনন্দের জন্যই করেছি, কারো ক্ষতি বা কাউকে হার্ট করার জন্য নয়। লেখালেখির একান্ত জগত ছাড়া সত্যিই আমার আর কোন আশ্রয় নেই। এই আনন্দ, এই আশ্রয় আমি বিসর্জন দেব কিছু উপরচালাক মানুষ ব্যাজার হবে বলে?

খুব বিপ্লবী বা খুব নারীবাদী কথা আমি এমনিতেও লিখতে পারি না। কারণ অন্তর থেকেই আমি বিপ্লবী বা রেডিক্যাল নারীবাদী নই। আমি যা তার জন্য ধিকৃত হলে সমস্যা নেই, বরং যা নই তার জন্য কেউ আমাকে ধন্য ধন্য করলে আমার লজ্জা লাগবে। আমি এরকমই। যারা বোঝার তারা বোঝে, না বুঝলে আর কি করা! আমি যা লিখেছি তা একান্তই গল্প। এর বাইরে কিছু নয়। আর কে না জানে, শিল্পের প্রথম আর প্রধান শর্তই হলো অস্পষ্টতা। এখন এই অস্পষ্টতার সুযোগে যদি কেউ নিজেকে বসিয়ে স্পষ্ট করে নেয়, তাহলে তো মুশকিল। মনের মধ্যে কি যে এক দ্বন্দ্ব! বইটা কি ছাপবো না কি নিষেধ করে দেবো?

কখনও কখনও দড়ি-দড়া এতো কেটে বসে শরীরে!দৃশ্যমান হলে দড়ি কাটার চেষ্টা করা যায়, কিন্তু যদি অদৃশ্য হয় সে বাঁধন?

লেখক: সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৩১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.