ওর নাম ছিল ইসাইপ্রিয়া ভিরাভানাক্কাম

0

Sri Lanka 2নির্ঝর মজুমদার তমাল: লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইসাইপ্রিয়া। ডাক নাম শোবা, পুরো নাম ইসাইপ্রিয়া ভিরাভানাক্কাম।

নামটা এর আগে শুনেছি বলে মনে করতে পারছি না। একটা জনপ্রিয় মেয়ে ছিল নিজের দেশ শ্রীলঙ্কাতে। ভালো গান গাইতো, এবং তামিল একটা টিভির নিউজ প্রেজেন্টার ছিল। ১৯৮২ সালে জন্ম নেয়া এই মেয়েটি স্কুলের শুরুতেই একটা বৃত্তি পেয়েছিল। ১৯৯৫ সালে শ্রীলঙ্কা আর্মির “অপারেশন রিভিরেসা” নামক একটা অভিযান শুরু হওয়ার পরে এই তামিল মেয়েটা পুরো পরিবারসহ বাস্তুচ্যুত হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে তামিল টাইগারদের গ্রুপ এলটিটিই এর একজন সদস্যের সাথে ঘর বাঁধে।

২০০৮ সালে ইসাইপ্রিয়ার একটা সন্তান হয়-মেয়ে।

বলে রাখা ভালো, তামিলদের মধ্যে খুব জনপ্রিয় ছিল এই শিল্পী- ভালো গাইত, নাচতোও ভালো। ২০০৭ সাল থেকে সে তামিল টাইগারদের প্রচারমাধ্যমে কাজ শুরু করে সাংবাদিক হিসেবে এবং সংবাদ পাঠিকা হিসেবে খুব দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে উঠে। তার নামের আগে এই সামরিক পদবীটি কিন্তু তামিলদের দেওয়া নয়।

তামিল টাইগারদের নেতা ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ এর একটা মেয়ে, সেও দেখতে ঠিক এই ইসাইপ্রিয়ার মতই ছিল। একটা শারীরিক সমস্যা ছিল ইসাইপ্রিয়ার। তার হৃদপিণ্ডের ভালবে সমস্যা ছিল। এই কারণেই সে তামিল গেরিলাদের সাথে যুদ্ধে যোগ দিতে পারেনি, যেটা তার দুর্ভাগ্যই বলতে হবে।

কেন? আসছি সে প্রশ্নে।

২০০৯ সালের ১৫ই মার্চ তার নিজের এক বছরের মেয়েটি মারা যায় শ্রীলঙ্কার সামরিক বাহিনীর গোলার আঘাতে। একই বছরের শেষের দিকেই মারা যায় তার স্বামী- তিনি মারা গেছেন যুদ্ধ ক্ষেত্রে।

২০০৯ সালের ১৮ই মে (মতান্তরে ২৩/২৪ মে) তামিলদের বিরুদ্ধে শ্রীলঙ্কার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার তামিল অধ্যুষিত এলাকা থেকে পালানোর সময়ে সে ধরা পড়ে যায় । একটা জল কাদাময় মাঠ থেকে বিবস্ত্র অবস্থায় তাকে ধরে ফেলে শ্রীলঙ্কান সেনারা।

ধরা পড়বার সময়ে তারা ভেবেছিল এই মেয়েটি প্রভাকরণের মেয়ে। কিন্তু সেই সময়েই ইসাইপ্রিয়া বলে যে প্রভাকরণের মেয়ে সে নয়।

এরপরে আরও অনেক তামিল মেয়ের মতই অকথ্য অত্যাচার শেষে খোলা মাঠে তার প্রাণহীন শরীর পাওয়া যায়- নিস্তেজ, নগ্ন।

চ্যনেল ফোর নামের একটি নিউজ চ্যনেল পরবর্তীতে ইসাইপ্রিয়ার জীবিত ধরা পড়বার ঘটনাটি এবং আরও পরে তার লাশের ভিডিও প্রকাশ করে, যার ফলে শ্রীলঙ্কার সরকার একটা মিথ্যা কথা বলতে শুরু করে যে ইসাইপ্রিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গেছে।

এই কারণেই তার নামের আগে এই সামরিক পদবীটি লাগিয়ে দেয় তারা।

ইসাইপ্রিয়ার বাবা-মা আরও অনেক পরে জানতে পারেন যে তাঁদের মেয়েকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছিলো। তাঁর শরীরের সেই সমস্যাটা না থাকলে হয়তো এই মিষ্টি মেয়েটা যুদ্ধক্ষেত্রেই মারা যেতে পারত। কিন্তু সেই সৌভাগ্যও তাঁর হল না। অত্যাচারে অসম্মানের সাথেই তাঁর মৃত্যু হল।

এই ঘটনাটা আমি গত সপ্তাহে জানতে পেরেছিলাম, শ্রীলঙ্কার মিডিয়ার উপরে করা একটা ক্লাস এসাইনমেন্ট শেষ করবার সময়ে। এবং এর আগ পর্যন্তও আমার ধারণা ছিল তামিল গেরিলারা হচ্ছে সন্ত্রাসী। কিন্তু তাঁদের উপরে চলা নির্যাতন, বার বার জতিগতভাবে তাঁদের উপরে করা প্রতারণা এবং সব শেষে এই নতুন শতাব্দীতে এসে তাঁদের উপরে চালানো ভয়াবহ জাতিগত গণহত্যা দেখে আজকে বলতে বাধ্য হচ্ছি, আমি ভুল ছিলাম। এবং প্রচণ্ড একটা পাপবোধ কাজ করছে। কারণ এর আগে নানান জায়গায় তর্ক করার সময়ে আমি সব সময় তাদের বিরুদ্ধেই কথা বলেছি।

ভুলটা শুধরালাম। অস্ত্র হাতে নিলেই সবাই সন্ত্রাসী হয় না।
আর এই ঘটনাটা শুধুমাত্র একটা বিষয়ের সাথেই তুলনীয় হতে পারে, সেটা হলো ১৯৭১ সালে আমাদের দেশের চার লাখ নির্যাতিত মা বোনের সাথে ঘটে যাওয়া বর্বরতা।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৭৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.