মর্ষকামিতা পোড়ায় মর্ম

0

Leeসালেহা ইয়াসমীন লাইলী: জীবনবোধ যার যতবেশী তার যন্ত্রণাও নাকি তত বেশী! কি দরকার তবে এমন বোধের? সামান্যে আক্রান্ত হয়ে কষ্ট পাওয়ার কি কোন মানে হয়? জীবনের হিসেব নিকেশ তো কোনদিন মেলে না। তবুও এই বোধ সময়ে-অসময়ে হিসেবের খাতাটায় হালনাগাদ করতে বসে। কোন সুখ কত দামে সওদা হয়েছে, সে হিসেব অংকের সংখ্যায় কুলায় না। রোজ রোজ কেটেকুটে সমাধানে দেখি অনেক ধার বাকী পড়ে যায় জীবনের কাছে। শুধু শুধু হৃদয়টায় ক্ষত-বিক্ষত করে বোধটা কাতরায়।

কেন এমন বোধ আমার? জ্যোৎস্না রাতে আকাশের দিকে তাকালে তার উথলে ওঠা আলোতেও আমার মন খারাপ হয়। চাঁদ যেমন ধারের আলো ধারে দিয়ে দায়মুক্তি পায়, সেই আলো গায়ে মেখে আমার দায়ের পাল্লা আরো ভারী হয়। আমার মন পোড়ে সেই আলোর উত্তাপে। যেমন কোন বর্ষণ মুখর আষাঢ়ের রাতে আমার অশ্রুর প্লাবনে ভিজে যায় বিছানা-বালিশ। ঈশান কোণে কালো মেঘ জমলে আমার মনও ভারী হয়। যেমন ভারী হয় একাকী দুপুরে আর বিষন্ন বিকেলে। আবার বাঁশির সুরও আমাকে কম পোড়ায় না, যতটা পোড়ায় পূর্ণিমার জ্যোৎস্না। জীবনের স্মৃতিগুলোও সারাক্ষণ তাড়িত করে। সুখের হোক আর কষ্টের। ফেলে আসা জীবনের সকল আনন্দ বেদনা, পথের ধুলার সাথে মিশে যাওয়া স্বপ্ন আজও ভাবায়।

প্রথম যেদিন বাঁশি ভাল লাগল, তখন আমি সদ্য কিশোরী। নিস্তব্ধ রাতে হ্যারিকেনের আলোয় পড়ার টেবিলে বসে জ্যামিতি শিখছি। হঠাৎ কানে এলো বাড়ির পাশের মাঠ থেকে বাঁশির সুর। মান্নাদের গান ‘এই কুলে আমি আর ঐ কুলে তুমি, মাঝখানে নদী ঐ বয়ে চলে যায়’—বুঝতে কষ্ট হল না বাঁশিতে। তার আগেও হয়তো বহু বাঁশি শুনেছি। কিন্তু না, মনে হয়েছিল এই প্রথম কোন ভাললাগা। যেন চিন চিন করে বুকে বাঁধছে বাঁশি! এলোমেলো করে দিচ্ছে আমার সমস্ত অন্তঃকরন। সে সুরে আমার পড়ার বইয়ের ত্রিভুজের রেখাগুলোকে এঁকেবেঁকে চতুর্ভুজ করে দিচ্ছে, রম্বস হচ্ছে, হচ্ছে বৃত্তাকার। সুরে আমার মনেও প্রচণ্ড টান পড়ে। যতক্ষণ বাঁশি বাজে আমি মন দিতে পারি না পড়ায়। একসময় বাঁশি থেমে গেলে আমি সেই সুরের রেশ নিয়ে ঘুমিযে পড়ি। প্রায় প্রতিটি রাতেই আমি বাঁশি শুনতাম। বাঁশির জন্য অপেক্ষাও করতাম। কিন্তু এই সুর ভাল লাগলেও আমাকে সুখ দিতো না কখনও। বরং সুরের চিতায় পুড়তে থাকতো মন। কিন্তু কার এই বাঁশি? দিনের আলোয় আমি বাঁশিওয়ালাকে খুঁজে পাইনি কোনদিন। রাতের অন্ধকার চিড়ে বাঁশিওয়ালাকে আবিস্কারের সাহসও ছিল না তখন।

তারপর যখন আমি অনেক সাহসী হয়ে উঠলাম, কোন এক শরতের পূর্ণিমায়। সন্ধ্যা রাতে অন্য এক মাঠের পাশ দিয়ে যেতে যেতে আমি বাঁশিওয়ালাকে খুঁজে পেলাম। এই আলোয় স্পষ্ট হল লোকটির রুগ্ন জিরজিরে শরীরে বসে যাওয়া চোয়ালে গোঁফ-দাড়ি বাড়াবাড়ি রকম বেড়ে গেছে আগাছার মতো। পরনে নোংরা ময়লা পরিধান। শুধু চোখ দুটোতে দু’দুটো পূর্ণিমার চাঁদ জ্বল জ্বল করছে। মনে হল আমি তাকে চিনি । খুব চিনি। তার কাছে গিয়ে বসতেই তিনি থামিয়ে দিলেন বাঁশি। আমার বায়না ফেলে দিতে না পেরে তিনি আবার বাঁশি শোনালেন। পুরোটা সন্ধ্যা। আমি সে সুরে পুড়ে পুড়ে নিজেকে ছাই থেকে ভস্ম করে আকাশে বাতাসে মিলিয়ে দিলাম।

এই অসুখের সুখ বাঁশিওয়ালাকে আবারও একবার পেয়েওছিলাম জীবনে। সেদিনও পূর্ণিমায় নৌকায় করে আমরা কয়েকজন মিলে মাঝ নদীতে গেলাম বাঁশি শুনতে। সারারাত পূর্ণিমার আলো ও বাঁশির সুরে জ্বলেছি আমরা।

‘বাড়ির কাছে আরশী নগর

(একঘর) সেথা পড়শী বসত করে-

আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।।’ অসাধারণ সুর।

বাঁশিকে পূর্ণতা দিতে যে অন্য কোন বাদ্যের দরকার পড়ে না। বাঁশি মানে বিষাদ। এই বিষাদের সুরে যে এতো ভাললাগা তা শুধু আমার নয়, বাঁশিওয়ালার নয়নও ধুয়েছিল রাতভর। বাকীরাও ছিল মুগ্ধ, স্তম্ভিত। পরদিন ভোরে ক্লান্ত বাঁশিওয়ালাকে বিদায় জানিয়ে ফেরা হল। আর কখনই দেখা হয়নি তার সাথে। তবে বাঁশির সুর শুনলেই আজো আমার মন পোড়ে। মনে পড়ে বাঁশিওয়ালাকে। যিনি আমার খুব পরিচিত একজন মানুষ ছিলেন। তাকে আমি যেমন তখনও চিনিনি। পরেও না। কিন্তু জেনেছি অন্যের কাছ থেকে তার পরিচয়।

বোধহীন বোধি হতে খুব ইচ্ছে করে আমার! ইচ্ছে করে একদম নির্লিপ্ততায় ডুবে থাকতে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পৌরসভার পানি সরবরাহের ট্যাংকিটার মতো। সুস্থির, দণ্ডায়মান। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজেও যেমন থাকে নির্বিকার। ঝড়ের তাণ্ডবও তো একটুও টলাতে পারে না তাকে। আমিও তার মতো বোধিপ্রাপ্ত হতে চাই।

সাংবাদিক ও লেখক

শেয়ার করুন:
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

লেখাটি ৫১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.