আমরা যারা একলা থাকি-৩৮

0

imp 1উইমেন চ্যাপ্টার: আমার এক বন্ধু সেদিন হাউ মাউ করে কাঁদছিল ফোন করেই। কিছুক্ষণ কান্নার পর একটু থামতে জিজ্ঞাসা করলাম, কী হয়েছে এবার বলো।

বললো, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে রে……..। বলি, কেন, কী হয়েছে, খুলে বলো।

‘আর পারছি না………..একা একা জীবনটা বয়ে বেড়াতে আর পারছি না’।

আমরা তো অনেকেই একা। কিন্তু থাকছি তো! বন্ধুটি বলে, আমার এখন মেনোপজের সময়। থেকে থেকে শরীরটা খারাপ লাগে, রাতে হাঁস-ফাঁস করি, হট ফ্ল্যাশ হয়, গলা শুকিয়ে আসে, খুব একা লাগে রে…..মনে হয়, কেউ একজন থাকতো এসময়।

উল্টা জিজ্ঞাসা করি, কেউ একজন থাকলেই যে তোমার কষ্ট লাঘব হতো, তা কি নিশ্চিত তুমি? জীবনে কম তো দেখনি।

‘তা নয়, কিন্তু হতেও তো পারতো। হয়তো এই মানুষটিই আমার হাত ধরে থাকতো এই দু:সময়ে’!

এমন একটি কথা শোনার জন্য কেন জানি প্রস্তুত ছিলাম না। এর কোন উত্তর আমার জানাও নেই। প্রকৃতির নিয়মেই এই সময়টা পাড়ি দিতে হয় প্রতিটি মেয়েকে। হয়তো কারও আগে হয়, কারও বা পরে। এ থেকে তো মুক্তি নেই।  তবে আমরা এ বিষয় নিয়ে কথা বলি না কেন? কেন আজ একটা একাকি মেয়ে নীরবে-নিভৃতে কষ্ট পাচ্ছে জীবনের এই পর্যায়ে এসে? কেন আমরা কেউ তার হাতে হাত রেখে বলি না যে, ‘বন্ধু, আমরা তো আছি’। কেন বলি না? কেন আমরা একটা সাপোর্ট সেন্টার খুলতে পারি না সবাই মিলে?’

বন্ধুর এই কষ্টটা আমাকে নতুন ভাবনায় ফেলে দিল। মনে পড়ে গেল, আমারই আরেক বন্ধু একবার বেশ দু:খ করেই বলেছিল, কেউ তাকে কোন একদিন কথা দিয়েছিল, ‘আমার যখন এই সময়টা আসবে, আমার পাশেই থাকবে সে। এমনকি ছেলের টিএন এজের সময়ও পাশে থাকবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল’। কিন্তু থাকলো কই? সব প্রতিশ্রুতি ভুলে সে চলে গেছে অন্যের হাত ধরে। হয়তো সেখানেও সে একই কথা দিয়ে রেখেছে, কে জানে! মেয়েরা যে কত বোকা হয়, নিজেকে দিয়েই তা চিনি।

কয়েকজন ছেলে বন্ধুর সাথে এ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বুঝেছিলাম কী অসাড়তা ওদের জানাশোনায়। ওরা এ ব্যাপারে তেমন কোনো ধারণাই রাখে না। যতটুকু জানে, তাও সবটুকু নয়। কেমন যেন একটা লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে কথা বললো এ বিষয়ে। মনে হচ্ছিল, আমি মেয়ে হয়ে তাদের সাথে এ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মহা অন্যায় করে ফেলেছি।  বরং বালখিল্যতার সাথে প্রশ্ন করেছিল, ‘আচ্ছা, মেনোপজের সময় নাকি শারীরিক চাহিদা থাকে না  মেয়েদের?  ওসময় মিলনে নাকি শান্তিও মেলে না, কেমন ধার ধার লাগে?’ ওদের কথা শুনে হাসবো নাকি কাঁদবো বুঝতে পারছিলাম না। শুধু বলেছিলাম, নিজের সময়টা আসুক, তখন তোদের বলবো কেমন লাগে।

সেই ১২-১৩ বছরে মাসিক ঋতুস্রাব শুরুর পর থেকে মেনোপজের মধ্যকার এই দীর্ঘ সময়টুকুই নারীর প্রজননকাল।  মা হওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু মেনোপজ মানেই যে নারীর শারীরিক চাহিদা কমে যাবে, এমন ধারণা সত্যিই ভুল।  আমার জানামতে এমন অনেক নারী আছেন, যারা মেনোপজের দীর্ঘ বছর পেরিয়েও  দিব্যি সুখে সংসার যাপন করে যাচ্ছেন। তবে এক্ষেত্রে দুজনের বোঝাপড়াটা খুব জরুরি। পার্টনার যদি বিবেকবান, সুরুচিবান না হন, তবে অশান্তি অনিবার্য। মেনোপজের সময়টুকুতে তাই মানসিক শক্তি জোগানো প্রতিটি পার্টনারের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

এক বন্ধু বলছিল, তার পার্টনার তাকে বলেছিল, ‘বাচ্চা হওয়া ঠেকাতে যা করণীয়, তুমিই কর, আমি কিছু করতে পারবো না’। আমার সেই বন্ধুটি মনে প্রচণ্ড কষ্ট বয়ে বেড়াতো। শুধুমাত্র এই কথায় না, দায়িত্ব না  নিতে চাওয়ার কষ্ট।  আনন্দ যাতে ম্লান না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে বন্ধুটিকেই, এটা ও মেনে নিতে পারছিল না। অবশেষে একদিন তাদের ছাড়াছাড়িই হয়ে যায়। আসলে আমরা বিয়ে বিচ্ছেদের খবর পাই, জানতে পারি যে, বনিবনা হচ্ছিল না, তাই আলাদা হয়ে গেছে। কিন্তু জানতে কি পারি যে, কজনার বিয়ে বিচ্ছেদ হয়েছে বিছানা-জটিলতার কারণে? কয়জন পুরুষ যৌন সঙ্গমে পারদর্শি, সেই কথাই বা আমরা কজনা জানি!

আমার এক আত্মীয়ের ছোট বোনের বেশ ঘটা করে বিয়ে হয়েছিল এক নামী ক্রিকেটারের সঙ্গে।  পরিবারের সবাই খুশি। সেই বিয়েতে থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। বর-কনে দুটিতে মানিয়েওছিল বেশ। মাঝে আর যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু বছর না ঘুরতেই শুনি ওদের ছাড়াছাড়ির খবর। কেন, কী হয়েছিল? শুনে আকাশ থেকে পড়ি। মেয়েটির বোন আমাকে জানায়, বিয়ের পর থেকেই মেয়েটি শুকনো মুখ করে থাকতো সবসময়। কিছু জিজ্ঞাসা করলে উত্তরও দিত না।  একবার ওর মন ভাল করতেই বোনেরা মিলে কক্সবাজার যায়, সেখানে বিশাল সমুদ্রের কাছে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে বোনটি। সবকিছু খুলে বলে বড় বোনদের, স্বামীর অক্ষমতার কথা বলতে গিয়ে ও যেন মাটিতে মিশে যেতে থাকে। কিন্তু বোনেরা তার পাশে দাঁড়ায় বন্ধুর মতোন। ঢাকায় ফিরেই ডিভোর্স ফাইল করায় বোনকে দিয়ে।

তারও অনেক বছর শুনি সেই বোনটি এখন লন্ডনে আছে, দ্বিতীয় স্বামী, দুই সন্তান নিয়ে সুখের জীবন তার।  আরেকজনের কথা জানি, যার তিন-তিনটি বিয়ে টেকেনি। কিন্তু টিকে গেছে চতুর্থ বিয়েটি। দিব্যি সংসার করছে দুই সন্তানসহ। এসব ঘটনা থেকে একটা কথাই মনে হয়, আসলে জীবনে ‘এটাই শেষ’ বলে কিছু নেই আসলে।  কার  যে কোথায় জোড়া ঠিক হয়ে আছে, সেকথা আমাদের অন্তরাত্মাও জানে না বোধকরি।

মেনোপজের গল্প বলতে গিয়ে যৌনতায় অক্ষম পুরুষদের বিষয়টা টেনে আনার পিছনে গূঢ় কোনো কারণ নেই। শুধু একারণেই বলা যে, অনেক কারণেই মেয়েরা একা হয়ে যায় সংসারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সন্তানের দায়িত্ব মেয়েটির ওপরেই বর্তায়। সব দায়িত্ব পালন শেষে যখন মেয়েটার একটু স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলার সময় আসে, তখন শুরু হয় এই মেনোপজকাল। মেয়েটার মনে তখন ঝড় উঠে, ভীষণ ঝড়। হঠাৎই মনে পড়ে তার, সবই তো ছিল, শরীর ছিল, চাওয়া ছিল, ভালবাসাও ছিল। আজ সব হারিয়ে যাচ্ছে কোনো এক ধাক্কায়। সময়টা দ্রুত চলে গেল বলে মেয়েটা যতটা না শারীরিক কষ্ট পায়, তার চেয়েও বেশি ভেঙে পড়ে মানসিকভাবে। ভাবে, সে কী শেষ হয়ে গেল? আর কোনো ভরসাই নেই জীবনে?

কিন্তু আমাদের সমাজে মেয়েদের বিয়ে ভেঙে যাওয়া, তারপর আবার বিয়ে হওয়া, এই বিষয়গুলোকে সহজভাবে নেয়া হয় না। কিন্তু বাবা, জীবনটা তো একটাই। এখানে উত্থান আছে, পতন আছে, ভাঙা-গড়া সবই আছে। মেয়েদের ঋতুস্রাব শুরুর যেমন সময় আছে, তেমনি শেষ হওয়ার সময়ও আছে। ছেলেদেরই তেমনি বয়ো:সন্ধিকাল আছে। সবই ঘটে প্রাকৃতিক নিয়মে। এগুলোকে অস্বীকার করে জীবন চলে না। তাই যতবেশি কথা বলা যাবে এই বিষয়গুলো নিয়ে, ততবেশি সমাধানের পথ সুগম হবে, ততবেশি নির্ভরতার জায়গা পাওয়া যাবে। যেন একাকি একটা মেয়ে তার মেনোপজের সময় একাকিত্ব বোধ না করে, তারও ব্যবস্থা করা সম্ভব আমরা সবাই তৎপর হলে।  (চলবে)

 

 

শেয়ার করুন:
  • 59
  •  
  •  
  •  
  •  
    59
    Shares

লেখাটি ৪৬৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.