তেজস্বিনী দ্রৌপদীর কাছে সীতা ম্রিয়মান

0

Draupodi 3লীনা দিলরুবা: “মহাভারতে দ্রৌপদী” পড়া হলো। দ্রৌপদী, মিথলজিতে যাকে আমার অন্যতম আকর্ষণীয় চরিত্র বলে মনে হয়। মহাভারত পড়ে নয়, একটি বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থের মাধ্যমে দ্রৌপদীপাঠ আবশ্যক ছিল।

একগাদা মহাভারত সংক্রান্ত গ্রন্থের সমাগম ঘটিয়ে অস্থির ছিলাম কখন দ্রৌপদী সম্পর্কে পূর্ণপাঠ নেব, অবশেষে নিদ্রা-আহার এবং কর্মে নিমজ্জিত ছুটির দিনের মাঝেও দ্রৌপদীপাঠ সম্পন্ন হলো, আর দিনটাই আমার বর্ণিল হয়ে গেল।

বইটি লিখেছেন শামিম আহমেদ। যিনি দ্রৌপদীকে মানবী বলেননি, ‘বিশেষ তত্ত্ব’ বলেছেন। দ্রৌপদী মানুষ নন, দেবী নন, তিনি একটা তত্ত্ব , এমন গুণবিচারে লেখক যথার্থ কি না সেটি এ বিষয়ে পন্ডিতরা বলতে পারবেন। আমি এক নাদান পাঠক, দ্রৌপদীর মত ইন্টারেস্টিং একটি চরিত্র যিনি কিনা পাঁচ স্বামীর গৃহ আলো করেছিলেন, তাকে অনেকটা নতুনভাবে আর পূর্ণাঙ্গভাবে দেখার সুযোগ শামিম আহমেদ করে দিয়েছেন এ কথা বলতে পারি।

কুন্তীর পাঁচ পুত্র, যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জন, নকুল এবং সহদেব। পঞ্চপান্ডব। তারা রাজাদের প্রতিহত করে দ্রৌপদীকে কুম্ভকারের ঘরে যখন নিয়ে আসেন তখন রাত গভীর। অর্জুন মা কুন্তীকে বললেন, “মা, ভিক্ষা নিয়ে এসেছি।” কোনো কিছু না দেখেই কুন্তী ঘরের ভেতর থেকে জবাব দিলেন, “সকলে মিলে ভোগ করো।” সেই থেকে দ্রৌপদী হয়ে গেলেন পাঁচভাই এর স্ত্রী। এই বর অবশ্য দ্রৌপদী আগেই লাভ করেছিলেন।

তপস্যায় তিনি মহাদেবকে সন্তুষ্ট করার পর মহাদেব তাকেঁ অভীষ্ট বর প্রার্থনা করতে বললেন, দ্রৌপদী বলেন, “সর্বগুণসম্পন্ন পতি চাই।” এই কথাটা দ্রৌপদী পাঁচবার বলেছিলেন, মহাদেবের বর মতে তাই দ্রৌপদীর পাঁচ স্বামীর বিবাহে জড়াতে হয়। কেমন ছিল তার ঘর-সংসার? পাঁচ স্বামীর এক একজনের সঙ্গে এক বছর করে সংসার যাপন করতে হতো। তার পাঁচ স্বামীর ছিল অন্য আরো স্ত্রী, সবচেয়ে বেশি ছিল অর্জুনের। পাঁচ স্বামীর ঘরে তার ছিল পাঁচ পুত্র, যারা সকলেই মহারণে নিহত হন।

শামিম আহমেদ কেবল দ্রৌপদীর চেনা গল্প বলেই ক্ষান্ত দেননি। তিনি সীতা-দ্রৌপদী মহারণে পাঠককে প্রবেশ করিয়েছেন। একটি তুলনামূলক আলোচনায় তিনি মোটামুটি উপসংহারে পৌছুঁতে চেষ্টা করেছেন কে বেশী গুরুত্বপূর্ণ? দেখা গেল দৌপদীর কাছে সীতা বড় ম্রিয়মান।

দ্রৌপদীর পাঁচ স্বামীর গল্প একটি বিচ্ছিন্ন দ্রৌপদী পাঠ, তার বস্ত্রহরণের মতোই। মূলপাঠ তার বহুগুণের আলোচনা। সীতার মধ্যে যেমন মেনে নেয়ার একটি সহজাত রূপ পরিদৃষ্ট হয়, দ্রৌপদী তেমন নন। তিনি তাঁর সব স্বামীকে শাসন করতেন, আবার তাদের যত্নও করতেন। যুধিষ্ঠিরকে বলেছেন ক্লীব, জুয়াড়ি। ভীমের বল, অর্জুনের গান্ডীবকে ধিক্কার দিয়েছেন। নকুল, সহদেব অবশ্য তেমন গালাগালে পড়েননি, কারণ তাদের তিনি পতি থেকে দেবর বলেই বেশি মূল্য দিতেন।

দ্রৌপদী রসিক ছিলেন, বুদ্ধিমতি ছিলেন। রাম ছিলেন তার বন্ধু। পাঁচ স্বামীর পরও দ্রৌপদী আরেকজন পুরুষের জন্য আগ্রহী ছিলেন, তার পানি গ্রহণ করতেও চেয়েছিলেন, তিনি কি কর্ণ? এটি স্পষ্ট নয়। যদিও কর্ণের কাছে রাম দ্রৌপদীর জন্য সুপারিশ করেন, কিন্তু কর্ণ তা ফিরিয়ে দেন। কর্ণের জন্য তার আগ্রহ ছিল, কিন্তু তিনিই কী দ্রৌপদীর আকাঙ্ক্ষার ষষ্ঠজন? তা বোঝা যায়নি, নারীর মন আসলেই বুঝতে যাওয়া মুশকিল !

কৃষ্ণ ছিল দ্রৌপদীর মনের কথা বলার স্থান। পাঁচ স্বামীর মধ্যে অর্জুন তার প্রিয় হলেও দ্রৌপদীর সাথে মনের সম্পর্ক ছিল কৃষ্ণের। তিনি তার বন্ধু, চিরজনমের সখা। কর্ণও সেখানে ম্লান। অর্জুন তো বটেই।

মহাভারত তো অসীম। এর কোনো সীমা পরিসীমা নেই। কাহিনী, চরিত্র বিচারে নামের মতই এটি মহা…….আজকের নারীর তেজস্বিনী রূপ হররোজ দেখা যায়। পুরাণে সেটি বলিষ্ঠ ছিল না কোনোভাবেই, এর মধ্যে আশ্চর্য ব্যতিক্রম দ্রৌপদী। শেষ কথা হলো, তাকে তীর্যকভাবে নয়, খোলামনে দেখা জরুরী।

শেয়ার করুন:
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

লেখাটি ৯৩৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.