রোজ নামচা- ২৭

0

Mirror 2লীনা হাসিনা হক: আমি এই প্রথম টার্কিশ এয়ারলাইন্সে উড়লাম। তিন ঘন্টার ফ্লাইটে কোপেনহেগেন থেকে ইস্তাম্বুল, দুই ঘণ্টার বিরতি তারপরে আবার সাড়ে ৮ ঘণ্টা লাগে ইস্তাম্বুল থেকে ঢাকা। একটু সাশ্রয়ী এয়ারলাইন্স, সিটগুলি নিচু আর চাপা, একটু ভারী মানুষের জন্য বেশ কষ্টই। যাওয়ার সময় অবশ্য ঈদের কারণে ঢাকা থেকে বিশাল এয়ারলাইন্স প্রায় খালি ছিল, আমি একটা চার সিটের খালি জায়গা খুঁজে নিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়েছিলাম, ঘুম কতটা হয়েছিল তা আর নাই-ই বললাম, তবে শুতে পেরে পিঠটা আরাম পেয়েছিল।

ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্ট প্রায় বাজার একটা। গিজ গিজ করছে মানুষ, সারা এয়ারপোর্ট জুড়ে ফুড কোর্ট কিন্তু তার বাইরে পরবর্তী ফ্লাইটের যাত্রীদের বসবার জায়গা নাই বললেই চলে। মানে হলো, চেয়ারে বসতে হলে খাবার দোকানের গলাকাটা খাবার কিনতে হবে!

গত ১০ বছরে টার্কিশ এয়ারলাইন্স ভাল বাজার তৈরি করেছে। তুরস্কের কৌশলগত অবস্থানের কারণে ইউরোপের দেশগুলো এবং নর্থ আমেরিকাসহ এশিয়ার সাথে আকাশপথের এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে তারা। ভাড়াও অন্যদের তুলনায় বেশ কম আর ফ্রি লাগেজের পরিমাণও বেশী।

ঢাকা থেকে কোপেনহেগেন ৪০ কেজি ফ্রি চেক ইন লাগেজ- অফিসের এক গাট্টি বইপত্র ( দুই দফাতেই) নিয়ে আসার পরও ৩৫ কেজির বেশী হলো না আমার। কেবিনে সাত কেজি দেয়, আমার টিংটিঙে ল্যাপটপ ব্যাগ মাত্র সাড়ে তিন কেজি হলো।

কিন্তু বিমান সেবা বা এয়ারপোর্টের ফ্যাসিলিটি অন্যদের তুলনায় মধ্যম মানের বা আরেকটু কম। যাওয়ার দিন ঢাকা থেকে ভোর ৬টায় রওনা করার পরে ব্রেকফাস্ট হিসাবে যা খেতে দিলো তা না ইউরোপিয়ান, না পুরোপুরি টার্কিশ, না কন্টিনেন্টাল। যাই হোক, অফিস থেকে যে এয়ারলাইন্সের টিকিট দেয় তাতেই আমার মতন কেরানীকুলকে চড়তে হয়। নিজের পছন্দের স্কোপ নাই বিশেষ। তবে ফিরে আসার সময় খাবার বেশ ভালই ছিল। তুরস্কের ৯১তম রিপাবলিক ডে উপলক্ষে যাত্রীদের একটা করে টয়লেট্রিজ বক্স উপহার দিল।

আমার পাশের সিটে মধ্য তিরিশের এক যুবক। আমিই যেচে আলাপ শুরু করলাম। ইতালি থেকে আসছেন ছুটিতে পাঁচ বছর পরে। ভেনিস শহরে থাকেন। বাড়ী কিশোরগঞ্জের ভৈরবে। বাড়ীতে স্ত্রী আছেন আর আছে বছর পাঁচেকের ছেলে। মানে যখন এই যুবক বিদেশে যান, ছেলেটির বয়স দুই বছরের মতন। হেসে জানতে চাইলাম ছেলের জন্য কি কি কিনেছেন। যুবকের সারা মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো আনন্দে, লিস্ট ধরে খেলনার নাম বলে গেলেন তিনি,  ব্যাটারি চালিত গাড়ী, প্লেন থেকে শুরু করে ফুটবল সবই আছে। ব্যাগভর্তি চকলেট। পারকা (কান ঢাকা শীতের পোশাক) কিনেছেন ছেলের জন্য।

জিজ্ঞ্যেস করলাম স্ত্রীর জন্য কি কি আছে? একটু লাল হয়ে উঠলো তার চেহারা। লজ্জা মুখে বললেন, ব্যাগ কিনেছেন, কিছু সাজসজ্জার জিনিস, জুতো আর একটা কোটও কিনেছেন ভালবাসার মানুষটির জন্য। ছবি দেখালেন ছেলে আর বউ এর। কাজল চোখে মিষ্টি একটি মেয়ে, বছর পঁচিশ হবে বয়স। মায়ের জন্যও নিয়েছেন ব্যাগ আর নরম তুলোর জুতো। সবার জন্যই কিছু না কিছু কিনেছেন তিনি। ছোট বোনের জন্য একটা গ্যালাক্সি এস ৫ ফোন কিনেছেন। জানতে চাইলাম কত পড়লো এস ৫ এর দাম, আমিও একটা কিনতে চাচ্ছিলাম। বললেন, আপা, আমার সারা মাসের বেতনের টাকা চলে গেছে ফোনটা কিনতে, তবু ছোট বোনের আবদার!

কোথায় যেন কি একটা বেজে উঠলো। বললাম, ভাই কিছু মনে না করলে বলেন, আপনার বিদেশ জীবনের কাহিনী, শুনতে ইচ্ছে করছে।  যুবক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিং এ মাস্টার্স করে যোগ দিয়েছিলেন একটি ওষুধ কোম্পানিতে। ছিলেন মোটামুটি ভালই। এক বন্ধুর পরামর্শে গ্রামের কিছু জমি বিক্রি করে আর সুদে টাকা ধার নিয়ে পুঁজি খাটালেন ডেস্টিনি কোম্পানিতে। ১০ লাখ টাকা। তারপরের কাহিনী নুতন করে বলার কিছু নাই, সবাই জানি। ছোটভাই থাকে ইতালিতে, ঋণে জর্জরিত অবস্থায় ভাগ্য ফেরানোর আশায় পাড়ি জমালেন সেখানে। অবশ্য ইতালি আসার জন্যও খরচ হয়েছে আরও লাখ চারেক।

ইতালিতে পা রেখেই স্বপ্নভঙ্গ। সেই ভাঙ্গা স্বপ্নের কাহিনীও নুতন নয়। আমরা সবাই জানি। গাড়ী মোছার মতন অড জব দিয়ে শুরু, সারাদিনে যা আয় হয় নিজের খোরাকিই চলে না। এদিকে এসেছেন টুরিস্ট ভিসায়, পুলিশের দাবড়ানি, দেশে রেখে আসা সদ্যজাত সন্তান আর প্রিয়তমা স্ত্রীর কথা মনে হলে বুকের ভিতরে আল্পসের হিমেল হাওয়া বয়ে যায়। কতবার ভেবেছেন ফিরে যাবেন, মায়ের কথা মনে হলে সেই চিন্তা বাদ দেন। যে জমি বিক্রি করেছিলেন পুঁজি খাটাতে, তা ছিল মায়ের নামে।

প্রথমে ছিলেন ফ্লোরেন্সে ছোট ভাইয়ের সাথেই। বছরখানেক পরে চলে আসেন ভেনিসে। এর মধ্যে পুলিশ ঠেকানোর কায়দা জেনে গেছেন, বুঝে গেছেন ইতালির অভিবাসী আইনের নিয়ম কানুন আর গলি ঘুঁজি। উকিল ধরেছেন। বেশ টাকা-পয়সা খরচ করে পেয়েছেন বৈধ কাগজ। যত সহজে আমি লিখে ফেললাম, বিষয়টা অত সহজ ছিল না, লেগেছে প্রায় চার বছর আর সীমাহীন কষ্ট। এই চাকরি থেকে সেই চাকরি, এভাবে করতে করতে ভাষাটাও কিছুটা রপ্ত করেছেন আর ইংরেজী কিছুটা জানেন বলে গত মাস ছয়েক ধরে ভেনিসের একটি হোটেলে কাজ পেয়েছেন। কাজের বর্ণনায় যতটুকু বুঝলাম, বেলবয় বা রিসেপশনের অ্যাসিস্টেন্ট জাতীয় কিছু।

জানতে চাইলাম, এত যে বাজার করলেন সবার জন্য, অনেক টাকা খরচ হলো তো!

10348787_873336302681969_6912763683049726839_o

লীনা হাসিনা হক

হাসলেন, হাসিটা ম্লান দেখাল, ‘আপা, দেশে তো সবাই আশা করে থাকে। আমার কষ্টের কথা তো আর বলা যায় না। এই দেশে আসার জন্যও টাকা ধার করতে হয়েছে’।

তবু দেশে আসার জন্য উতলা হয়েছেন তিনি। নিজের ছেলে বাবাকে চেনে ছবির মাধ্যমে আর আজকাল স্কাইপ থাকাতে তাও একটু দেখা যায়। ‘আমার স্ত্রী অত্যন্ত ভালো মেয়ে আপা, নইলে এত কষ্ট করে একা একা ছেলেকে বড় করে তুলছে! আমার মায়ের সাথে থাকে, অনেক যত্ন করে আমার মাকে। কোন বদনাম নাই। আমার বউয়ের কষ্টের কথা মনে হলেও অস্থির হয়ে যাই আপা! জীবন এত কষ্টের, মানুষকে বলে বোঝানো যায় না।’

যুবকের গলা ভারী হয়ে আসে। আমিও আর কথা বাড়াই না। তাকে সময় দেই সামলে নেয়ার।

কিন্তু একটা কথা নিজের মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে, এই যে যুবক, গত পাঁচটি বছর সে দেশ ছেড়ে পরিবার ছেড়ে একা থাকছে। কার কাছে সে ইমোশনাল সাপোর্ট খুঁজে? আর শরীর? কোন মানুষই তো মনের আবেগ আর শরীরের উত্তাপের বাইরে নয়।

মানুষ তো মানুষ, সে তো দেবদুত নয়। তার মনের আবেগ, শরীরের আবেগ আর উত্তাপ আছে বলেই তো সে দেবদূত নয়। হয়ত এই যুবক কোন না কোনভাবে তার মানসিক আবেগ না হলেও শরীরের আবেগ চাহিদা পূরণ করে। করতেই হয়। এটাই স্বাভাবিক এবং আমি এতে দোষের কিছু দেখি না।

অত্যন্ত নাছোড়বান্দার মতন হেসে জানতে চাই, ভাই, এই পাঁচ বছর একাই কাটালেন? কোন মেমসাহেব, কারো সাথে সম্পর্ক হয় নাই? আমার বেয়াক্কেলে প্রশ্নে যুবক প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও চোখ নিচু করে স্বর নামিয়ে বললেন, ‘আপা, আপনি আমার বড় বোনের মতন। কত দেশ-বিদেশ ঘুরেছেন। জানেনই তো সব। আর আপা, এই ঠাণ্ডার দেশে একদম একা কি থাকা যায়? তবে বিয়ে করি নাই আপা। স্ত্রীর মর্যাদা আমার বউয়েরই থাকবে সব সময়। এই সব সাময়িক সম্পর্ক। সবাই করে। বাঁচার তাগিদে করতে হয়।‘

কিন্তু দেশের বাড়িতে থাকা তার স্ত্রীটি? সেই মেয়েটি কিভাবে এই পাঁচটি বছর কাটিয়েছে, কে তার খোঁজ রাখছে? সবাই দেখছে ভালো লক্ষ্মী বউ, স্বামীর অবর্তমানে সন্তানকে বড় করে তুলছে, শাশুড়ির যত্ন করছে। কিন্তু তার মানসিক আর শারীরিক চাহিদা? কিভাবে মিটছে তা?

তসলিমা নাসরিনের ‘অবদমন’ লেখাটির কথা মনে পড়ল। এই স্ত্রীটি যদি তার প্রয়োজন মেটাতে যা কিনা তার স্বামীর ভাষায় ‘বাঁচার তাগিদ’ সেই তাগিদে অন্য কার সাথে সম্পর্ক করে, কি হবে তার? পরিবার, সমাজ এমনকি এই স্বামীও কি মেনে নিবে ‘ বাঁচার তাগিদ’ বিবেচনা করে? প্রশ্নটি করতে পারলাম না।

বাকী সময়টুকু আর কোন কথা আগালে না। দুজনেই চুপচাপ। আমি মনের ভেতর থেকে কাজল চোখের সেই তরুণী বউটির কথা মুছতে পারছিলাম না। (চলবে)

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৩৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.