নারী কবে নিরাপদ হবে?

0

talakআনন্দ কুটুম: No one killed Jessica সিনেমাটা যত বার দেখি ততোবার ভেতরের জমে থাকা কষ্টগুলো মুখের সামনে দাঁড়িয়ে উপহাস করে। গলা ফেটে কান্না উঠে আসে।
২০১২ সাল। HSC পরীক্ষা শেষ করলাম গতকাল। স্বভাবতই বিশ্রামে আছি। দুপুর পর্যন্ত ফোনটা বন্ধ করে রেখেছিলাম। দুপুরে ফোনটা খোলার সাথে সাথে এক নাগাড়ে ফোন আসতে থাকে বিভিন্ন জাগা থেকে। একটু বিরক্তি নিয়েই ফোন ধরেছিলাম।

ওপাশ থেকে আপু কাঁদতে কাঁদতে জানাল “মুক্তা আর নেই”। আমি যেন আমার কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
মুক্তা আমার ছোট খালা মনির নাম। আমার থেকে বছর পাঁচেকের বড় হবে। এক সাথে আমাদের সাঁতার শেখা, পিকনিক করা, খুনসুঠি, পেয়ারা গাছে ওঠা, টাকা চুরি করা কত সৃতি। ২০১২ সালের কোন এক দুপুর বেলা তাকে এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়।

মানুষ কতোটা পশু হতে পারে ওর মৃত্যু না দেখলে হয়তো বুঝতেই পারতাম না। শুধু যৌতুকের লোভে ওর শ্বশুর বাড়ির লোকেরা ওকে মেরে ফেললো। মৃত্যুর সময় ওর গর্ভে ৫ মাসের একটা বাচ্চা ছিল। যখন ময়নাতদন্তের ঘরে ওকে দেখেছিলাম তখন ওর মুখ দিয়ে অনর্গল রক্ত পড়ছিল। ময়না তদন্ত থেকে জেনেছিলাম ওকে প্রথমে ধর্ষণ করে, শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এর পর ফেলে দেওয়া হয় মধুমতীর জলে।

ওকে যখন কবরে শুইয়ে দিয়েছিলাম সেই দিনটির কথা মনে পড়লে আজো বুক ভেঙ্গে যায়। জীবনের বাস্তবতাগুলো কত কঠিন। ও বছর জুড়ে অপেক্ষায় থাকতো কবে আমি ওকে দেখতে যাব। কবে ওকে আনতে যাব।

ওর মৃত্যুর পরে অনেক ঝক্কি আমাদের পোহাতে হয়েছিল। গ্রাম্য রাজনৈতিক চাপ, থানার হুমকি, হাস্পাতালের চোখ ঘুরানো, NGO র উৎপাত। কারও মানসিক অবস্থাই শক্ত ছিল না যে থানা পুলিশ করবো। শুধু ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম আমরা তিন ভাইবোন। মানবাধিকার কমিশন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, কোর্ট, হাসপাতাল, থানা করে কেটেছিল কিছু দিন। ঘোরের মধ্যে বুঝতেই পারিনি হঠাৎ কখন কবে বড় হয়ে গেছি।

আমি সেই মামলার প্রথম সাক্ষী। প্রতি মাসে নিয়ম করে আমার অন্যান্য খালামনিরা কোর্টে হাজিরা দেয়। কেসটাকে বাঁচিয়ে রাখছে। তারা বিশ্বাস করে আইন একদিন কথা বলবেই। সুবিচার একদিন হবেই। সেই আশায় আমি বুক বেঁধে আছি। জানিনা সুবিচার আমার দেশে হয় কি না! সুবিচার আমরা পাব কি না! তবুও এই সংগ্রামটা চালিয়ে যেতে চাই। আজ যদি মুক্তার জন্য সুবিচার না পাই, আমি জানি কাল হয়তো আমার মেয়ের জন্যও আমাকে এভাবেই কোর্টের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে। বাংলাদেশের কোন নারীই নিরাপদ নয়।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.