বিষণ্ণ মানুষের শেষ ভরসা কোথায়?

0

women in foreign life 2ফারহানা রহমান: নারী পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকেই নিজ জীবনে কখনো না কখনো গভীর ভাবে বিষন্ন হয় বা হতে পারে, আর সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিষণ্ণ মানুষেরা আসলে কেমন হয়? আর মানুষ কেনই বা বিষণ্ণ হয়? আর এর প্রতিকারই বা আসলে কি? প্রতিনিয়ত মনোবিজ্ঞানীরা এ নিয়ে নিরলস গবেষণা করে চলেছেন।

বিষণ্ণ হওয়ার মত বহু ঘটনা প্রত্যি মূহূর্তে আমাদের সামনে ঘটে চলেছে। যার অনেক কিছুর উপরই হয়ত আমাদের কোন হাত নেই। যা চেয়েছিলাম তা না পাওয়া, মনের মত জীবন সঙ্গী না পাওয়া, জীবনে নির্দিষ্ট বা সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ করতে না পারা বা দ্রুত নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারা, এসবই আমাদেরকে হতাশ করে তোলে। আবার বাবা-মায়ের সঠিক জীবন বোধের অভাব বা পরিবারে সুস্থ জীবন চর্চা না থাকলেও সন্তান বা বাবা-মা সকলেই হতাশায় বা বিষণ্ণতায় ডুবে যেতে পারে।

অতি উচ্চাভিলাস আর জাগতিক বস্তুর প্রতি অত্যাধিক আকর্ষণ মানুষকে ভীষণভাবে বিষণ্ণ  করে তুলতে পারে আর তাই জীবনকে একসময় অর্থহীন মনে হতে পারে তখন। জীবনে চলার পথে পদে পদে আমরা বঞ্চিত হই। নানা ভাবে বাধাগ্রস্ত হই। আমাদের চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে পার্থক্য সব সময় রয়ে যায় বলেই আমরা আসলে  বিষণ্ণ হই ।

তবে জীবনে বেশীর ভাগ মানুষই গভীরভাবে বিষণ্ণ হয় কারণ সে নিজেকে তাঁর পছন্দের  পেশার সাথে নিযুক্ত করতে  পারে না। তাই কাজের মাধ্যমে গভীর আনন্দ পাওয়া থেকে সে বঞ্চিত হয়।  আর এই একটি কারণই মানুষকে আজীবন চির দুঃখী করে রাখার জন্য যথেষ্ট।

এছাড়াও স্বার্থপর আর গভীর জীবনবোধ না থাকা মানুষ সহজে বিষণ্ণ হয়। অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধ ও মনোযোগের অভাবও মানুষকে বিষণ্ণ করে তুলতে পারে। একইভাবে কাজের দীর্ঘসূত্রিতা বা সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যবহার করতে না পারলেও আমরা মানসিক যন্ত্রণায় ভুগি, যা আমাদেরকে দুঃখী করে তোলে।

আমাদের সমাজে পুরুষদের তুলনায় নারীরাই বেশী বিষণ্ণতায় ভোগে, তবে সারাবিশ্বেই সম্ভবত একই চিত্র আমরা দেখতে পাই। তাই শপিং মলগুলোর এত রমরমা ব্যবসা ফেঁদে বসতে পেরেছে দুনিয়া জুড়ে।  আর্থিকভাবে সচ্ছল নারীরা বিষণ্ণতা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় শপিং করা বা কেনাকাটার উপর অত্যধিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পরে। একইভাবে মনের সুস্থতা আর সৌন্দর্য রক্ষা করতে না পেরে, বাহ্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধির আসায় ঘন ঘন বিউটি পার্লারমুখী হয়ে পরে বহু দুঃখী নারী। অবসাদগ্রস্থ হয়ে কেউ কেউ আবার অত্যধিক খাদ্য আসক্তিতে  সুখ খুঁজে পায়, একইভাবে অনেকেই খাওয়া-গোসল ছেড়ে দিয়ে শয্যাশায়ী হতে পারে। অত্যধিক টিভি আসক্তি বা ভিডিও গেম আসক্তিও বিষণ্ণতারই বহিঃপ্রকাশ।

আবার অনেকেই বিষণ্ণতা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় নানা অসামাজিক সম্পর্কে বা কার্যকলাপে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। সমাজে অত্যধিক ড্রাগ আসক্তি বা বহুল সংখ্যায় বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের বহি:প্রকাশ থেকেই তা আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি।  সমাজের নানা অনিয়ম আর নীতি বহির্ভূত কার্যকলাপ আমাদেরকে প্রায়শই হতাশ করে তোলে। আর আমাদের সমাজের ধনী-গরীবের বিস্তর ব্যবধান বিবেকবান মানুষের বিবেক দংশন ও অনুশোচনার আরো একটি বিশেষ কারণ বোধহয়।

বিষণ্ণ মানুষেরা মূলত আস্তে আস্তে একসময় নিজেকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে নেয়, যা তাদেরকে কর্মবিমুখ করে আরও অবসাদগ্রস্ত করে তোলে।

সুস্থ সামাজিকতা, সমমনা বন্ধু-বান্ধবের সাথে অবসর সময় কাটানো, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা, ভাল কিছু শখ- যেমন বই পড়া, সিনামা দেখা, ভ্রমণ করা বা প্রকৃতির মাঝে  সময় কাটানো ইত্যাদি মানুষকে বিষণ্ণতার হাত থেকে  মুক্তি দিতে পারে। আবার প্রত্যেকদিন নির্দিষ্ট সময়ে প্রার্থনা করা ও মেডিটেশন করার মাধ্যমে দেহ ও মনকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে শিখি যা দেহমনকে শান্ত রেখে আমাদের বিষন্নতা দূর করে। আবার ইয়োগা বা নানা রকম শারীরিক  পরিশ্রম বা  ব্যায়াম অথবা সপ্তাহে অন্তত চার/ পাঁচ দিন একঘণ্টা করে হাঁটলেও মন প্রফুল্ল হয়।

তবে সুখী হওয়ার জন্য জীবনের নির্দিষ্ট লক্ষ নির্ধারণ করা খুবই জরুরি।  সর্বোপরি সঠিক ও  সুস্থ জীবন চর্চা মানুষকে সুখী করে তাই নিজের ও অন্যের প্রতি মনোযোগী আর সহানুভূতিশীল মানুষ অন্যদের তুলনায় অধিক সুখী জীবন কাটায়।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৩৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.